বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ ধনী ও ভারতের আদানি গ্রুপের চেয়ারপারসন গৌতম আদানি ও তাঁর ভাতিজা সাগর আদানির বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। এর আগে গৌতম আদানির বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রে প্রতারণার অভিযোগে মামলা দায়ের করা হয়।
ঘুষ-কাণ্ডে আদানি ও তাঁর ভাতিজা ছাড়াও অভিযুক্তের মধ্যে আছেন আদানি গ্রিন এনার্জি লিমিটেডের সিইও বিনীত জৈন, রঞ্জিত গুপ্ত, রুপেশ আগরওয়াল, অস্ট্রেলিয়া ও ফ্রান্সের নাগরিক সিরিল ক্যাবানেস, সৌরভ আগরওয়াল ও দীপক মালহোত্রা।
মার্কিন ডেপুটি অ্যাসিস্ট্যান্ট অ্যাটর্নি জেনারেল লিসা এইচ মিলারকে উদ্ধৃত করে নিউইয়র্কের ইস্টার্ন ডিস্ট্রিক্টের অ্যাটর্নি কার্যালয় এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ২৫ কোটি ডলার ঘুষ দেওয়া, কোটি কোটি ডলার সংগ্রহের জন্য বিনিয়োগকারী এবং ব্যাংকগুলোকে মিথ্যা বলা এবং ন্যায়বিচারকে বাধা দেওয়ার পরিকল্পনার অভিযোগ আনা হয়েছে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি বলছে, অত্যন্ত গোপনে ২৫ কোটি ডলার ঘুষ দেওয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রে অর্থ সংগ্রহের জন্য আদানিকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
আদানির বিরুদ্ধে অভিযোগ, ভারতীয় কর্মকর্তাদের ঘুষের প্রস্তাব দিয়ে কয়েক বিলিয়ন ডলারের চুক্তি করেছিলেন তিনি। এরই মাধ্যমে আমেরিকা এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের বিভ্রান্ত করে টাকাও তুলেছিলেন বাজার থেকে। দাবি করা হয়েছে, ২০২১ সালের জুলাই এবং ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে ভারতীয় সরকারি কর্মকর্তাদের ঘুষ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল আদানি গোষ্ঠী। ভারতীয় কর্মকর্তাদের ২৫ কোটির ডলারেরও বেশি ঘুষের প্রস্তাব দিয়ে সৌরশক্তি সরবরাহের লাভজনক চুক্তি পেয়েছিল আদানি। এই চুক্তিগুলো থেকে ২০ বছরে ২০০ কোটি ডলারের বেশি মুনাফা অর্জনের আশা করা হয়েছে।
ভারতের অন্যতম ধনীদের একজন আদানির ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য বন্দর, এয়ারপোর্ট থেকে শুরু করে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিস্তৃত।
২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র-ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান হিনডেনবার্গ রিসার্চ আদানির বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এরপর থেকে এই মেগা ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান যুক্তরাষ্ট্রে অনেকটা গোপনে তাদের ব্যবসা পরিচালনা করছে। এই দাবিগুলো আদানি অস্বীকার করেছেন। তবে বাজারে শিল্পগ্রুপটির পণ্য বিক্রি বন্ধে এটি বড় প্রভাব ফেলেছে।
কয়েক মাস ধরেই এই ঘুষের তদন্ত রিপোর্টগুলোর বিষয়ে জানা যাচ্ছে। প্রসিকিউটররা জানিয়েছেন, ২০২২ সালে যুক্তরাষ্ট্র আদানির এই কোম্পানিতে অনুসন্ধান শুরু করেছিল। কিন্তু তারা এতে বাধাগ্রস্ত হয়। তারা অভিযোগ করেছেন কর্মকর্তারা যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলো থেকে তিন বিলিয়ন ডলারের ঋণ ও বন্ড সংগ্রহ করেছেন। ঘুষের তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠানটির ঘুষবিরোধী অনুশীলন এবং নীতি সম্পর্কে মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর বিবৃতিও দেওয়া হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাটর্নি ব্রায়ান পিস এক বিবৃতিতে অভিযোগ ঘোষণা করে বলেছেন, অভিযুক্ত হিসাবে আসামিরা বিলিয়ন ডলার মূল্যের চুক্তি সুরক্ষিত করতে ভারতীয় সরকারি কর্মকর্তাদের ঘুষ দেওয়ার জন্য একটি বিস্তারিত স্কিম সাজিয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্র এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে মূলধন সংগ্রহ করার জন্য ঘুষের স্কিম নিয়ে মিথ্যা কথা বলেছিল।
বাংলাদেশেও ভারতের আদানির বিদ্যুৎ আমদানি চুক্তিতে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। এরই মধ্যে আদানি গ্রুপের সঙ্গে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে করা সব বিদ্যুৎ চুক্তি পর্যালোচনার নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। আগামী ৩ মাসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে।
জানা গেছে, ২০১৭ সালের নভেম্বরে আদানি পাওয়ার লিমিটেডের ঝাড়খণ্ড পাওয়ার প্ল্যান্টের সঙ্গে ২৫ বছরের জন্য ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেনার চুক্তি করে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। সম্পূর্ণ আমদানি করা কয়লায় পরিচালিত এই পাওয়ার প্ল্যান্টটিকে ২০১৯ সালের মার্চে ভারত সরকার বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল হিসেবে ঘোষণা করে কর ছাড় দেয়। যদিও বাংলাদেশের সঙ্গে চুক্তির সময় কর ছাড়ের বিষয়টি গোপন করে আদানি গ্রুপ। এ ছাড়া পায়রা, রামপাল ও চট্টগ্রামের বাঁশখালীর বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহার করা কয়লার দাম টনপ্রতি ৭৫ ও ৮০ ডলার হলেও আদানি, টনপ্রতি নিয়েছে ৯৬ ডলার দরে। পরে পিডিবি দর নিয়ে আপত্তি জানালে দাম কমাতে রাজিও হয় তারা।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঘনিষ্ঠ সহযোগী আদানি। দেশটির বিরোধী দলের রাজনীতিবিদরা দীর্ঘদিন ধরেই দাবি করে আসছেন, এই রাজনৈতিক সম্পর্কের কারণে উপকৃত হচ্ছেন আদানি। যদিও তিনি তা অস্বীকার করেন।
এদিকে মার্কিন নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অভিনন্দন জানিয়েছেন আদানি। একই সাথে যুক্তরাষ্ট্রে ১০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন।
গত বছর জানুয়ারিতে এক সপ্তাহেই প্রায় ২ হাজার ৫০০ কোটি ডলারের ব্যক্তিগত ধনসম্পদ উধাও হয়ে যায় আদানির। সে সময় নিউইয়র্ক-ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান হিনডেনবার্গ রিসার্চের বিতর্কিত এক রিপোর্ট প্রকাশিত হওয়ার পর গৌতম আদানির মালিকানাধীন বিভিন্ন কোম্পানির শেয়ারের মূল্যে ধস নামে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রতারণার অভিযোগে মামলা দায়েরে বড় বিপদে পড়েছেন বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ এই ধনী ব্যক্তি। বৃহস্পতিবার আদানি গোষ্ঠীর শেয়ারের দাম ২০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। এতে গৌতম আদানির ব্যক্তিগত সম্পদের মূল্যও কমেছে। সেই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে আদানি গ্রিন এনার্জির যে বন্ড ছাড়ার কথা ছিল, তা স্থগিত করা হয়েছে বলে জানিয়েছে ইকোনমিক টাইমস।
ফোর্বস ম্যাগাজিনের তথ্য বলছে, একপর্যায়ে গৌতম আদানির সম্পদমূল্য কমে যায় ১২ দশমিক ৪ বিলিয়ন বা ১ হাজার ২৪০ কোটি ডলার। তবে পরে শেয়ারের দাম কিছুটা বৃদ্ধি পেলে তা ১০ দশমিক ৫ বিলিয়ন বা ১ হাজার ৫০ কোটি ডলারে নেমে আসে।
বিনিয়োগ সংক্রান্ত গবেষণা প্রতিষ্ঠান হিনডেনবার্গ রিসার্চ গতবছর তাদের রিপোর্টে আদানির বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে করপোরেট জগতের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ধোঁকাবাজির অভিযোগ করেছে। আদানি গ্রুপ অত্যন্ত ক্ষোভের সঙ্গে এই রিপোর্টের প্রতিবাদ জানিয়েছে। একই সঙ্গে তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগও তারা অস্বীকার করেছে।
এই ঘটনার পরিস্থিতি কিন্তু অনেকটাই সামলে নিয়েছিলেন আদানি। হিনডেনবার্গের পর এটা আদানির জন্য সবচেয়ে বড় ধাক্কা। এবার তিনি কীভাবে এই পরিস্থিতি সামলান সেটি এখন দেখার বিষয়।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স, বিবিসি, ফোর্বস, ইকোনমিক টাইমস, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস



