ধরুন, আপনি হাইওয়েতে গাড়ি চালাচ্ছেন। আশপাশে কোনো ট্রাফিক পুলিশও নেই। ভাবলেন—একটু গতি বাড়াই বা উল্টো পথ দিয়ে শর্টকাটে চলে যাই। এবার কিন্তু আর সেই সুযোগ থাকছে না। কারণ, আপনার ওপর নজর রাখছে ‘অদৃশ্য চোখ’। আপনি গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই ফোনে চলে আসবে জরিমানার বার্তা। ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়কে চালু হওয়া এই নতুন এআই ক্যামেরাগুলো ঠিক কীভাবে ১ সেকেন্ডেরও কম সময়ে অপরাধ ধরে ফেলে? এর পেছনে ডিপ লার্নিং অ্যালগরিদমই-বা কীভাবে কাজ করে? চলুন জেনে নেওয়া যাক।
কীভাবে কাজ করে এআই ক্যামেরা
সাধারণ সিসি ক্যামেরা কেবল ভিডিও রেকর্ড করে। কিন্তু এআই ক্যামেরার মধ্যে থাকে কম্পিউটার ভিশন প্রযুক্তি। ক্যামেরাটি চালু থাকা অবস্থায় রাস্তায় যা কিছু নড়ছে, সবকিছুকে রিয়েল-টাইমে বিশ্লেষণ করে। এআইকে হাজার হাজার গাড়ির ছবি দিয়ে ট্রেনিং দেওয়া থাকে। ফলে ফ্রেমের মধ্যে কোনটি বাস, কোনটি প্রাইভেটকার আর কোনটি নিষিদ্ধ থ্রি-হুইলার, তা মুহূর্তেই আলাদা করে ফেলে এই প্রযুক্তি। এমনকি রাতের আঁধারে বা প্রচণ্ড বৃষ্টিতেও এআই ক্যামেরার নাইট ভিশন এবং ইনফ্রারেড সেন্সর গাড়ির গঠন দেখে এটি শনাক্ত করে ফেলে।
গতি ও দিক শনাক্তকরণ
এবার আসি মূল অপরাধ শনাক্তকরণের জায়গায়। এআই ক্যামেরা কীভাবে বোঝে কে আইন ভাঙছে? প্রথমত, ক্যামেরার সফটওয়্যারে রাস্তার দুটি নির্দিষ্ট পয়েন্টের দূরত্ব সেট করা থাকে। গাড়িটি কত মিলিসেকেন্ডে সেই দূরত্ব পার হলো, এআই তা গাণিতিকভাবে হিসাব করে মুহূর্তেই গাড়ির রিয়েল-টাইম স্পিড বের করে ফেলে। যদি গতিসীমা নির্ধারিত সীমার বেশি হয়—সাথে সাথে ক্যামেরা সিস্টেম হাই-স্পিড ক্যাপচার মোডে চলে যায়।
আর দ্বিতীয়ত, ক্যামেরা জানে যে কোন লেনের ট্রাফিক কোন দিকে যাওয়ার কথা। যখনই কোনো গাড়ি বিপরীত দিক থেকে আসে, এআইয়ের অ্যালগরিদম ভেক্টর ডিরেকশন চেঞ্জ শনাক্ত করে রেড ফ্লাগ জেনারেট করে। একই সাথে মহাসড়কের লেন দখল করে নো-পার্কিং জোনে কোনো গাড়ি থমকে দাঁড়ালে নির্দিষ্ট সময় পর ক্যামেরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে অ্যালার্ট পাঠায়।
এএনপিআর ও নম্বর প্লেট রিডিং
অপরাধ তো শনাক্ত হলো, কিন্তু অপরাধী কে তা জানবে কীভাবে? এখানেই কাজ করে অটোমেটিক নম্বর প্লেট রিকগনিশন প্রযুক্তি। ক্যামেরা যখন অপরাধ শনাক্ত করে, সে পুরো ভিডিও থেকে কেবল গাড়িটির নম্বর প্লেটের অংশটুকু রেজুলেশন বাড়িয়ে কেটে নেয়। এরপর ব্যবহার করা হয় অপটিক্যাল ক্যারেক্টার রিকগনিশন প্রযুক্তি। এটি গাড়ির বাংলা বা ইংরেজি নম্বর প্লেটের ছবিকে সরাসরি ডিজিটাল টেক্সটে রূপান্তর করে। নম্বর প্লেটে কিছুটা ধুলোবালি বা কাদা থাকলেও এআই ডিপ লার্নিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে অক্ষরের প্যাটার্ন মিলিয়ে সঠিক নম্বর বের করে আনতে পারে!
সেন্ট্রাল সার্ভার ও অটো-ফাইন
নম্বর প্লেট টেক্সটে রূপান্তর হওয়ার পর এআই ক্যামেরা সেই ডেটা, অপরাধের স্থান, সময় এবং ভিডিও প্রুফ সরাসরি পাঠিয়ে দেয় হাইওয়ে পুলিশের কেন্দ্রীয় সার্ভারে। সার্ভারটি যুক্ত থাকে বিআরটিএর ডেটাবেজের সাথে। নম্বর প্লেট ম্যাচ হতেই ডেটাবেজ থেকে বেরিয়ে আসে গাড়ির মালিকের নাম, মোবাইল নম্বর ও ঠিকানা।
এরপর কোনো ট্রাফিক সার্জেন্টের হস্তক্ষেপ ছাড়াই স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফাইন জেনারেট হয়। গাড়ির মালিকের মোবাইলে বার্তা চলে যায়: ‘আপনার গাড়ি অমুক স্থানে গতিসীমা অতিক্রম করায় এত টাকা জরিমানা করা হলো।’
সবচেয়ে বড় বিষয়—ভিডিও ও ছবি প্রমাণ হিসেবে সার্ভারে সংরক্ষিত থাকে। তাই ‘আমি তো আইন ভাঙিনি’ বলে পার পাওয়ার কোনো সুযোগ থাকে না, আবার কোনো পুলিশ অফিসার ঘুষ নিয়ে মামলা বাতিল করবেন—সেই সুযোগও বন্ধ হয়ে যায়।
এআই ক্যামেরার চ্যালেঞ্জ
তবে এই হাই-টেক ক্যামেরারও একটি দুর্বল জায়গা আছে। আমাদের দেশে যেসব অটোরিকশা বা থ্রি-হুইলার উল্টো পথে চলে, তার অধিকাংশেরই কোনো বৈধ নম্বর প্লেট বা বিআরটিএ রেজিস্ট্রেশন নেই। এআই ক্যামেরা এগুলোকে অপরাধী হিসেবে শনাক্ত করলেও ডিজিটাল চালান পাঠাবে কার ঠিকানায়? তাই এআই টেকনোলজি শতভাগ সফল করতে হলে আগে এই রেজিস্ট্রেশনহীন গাড়িগুলোকে হাইওয়ে থেকে পুরোপুরি সরাতে হবে।
প্রযুক্তি যত উন্নত হচ্ছে, অপরাধ কমানো ততই সহজ হচ্ছে। এই এআই ক্যামেরা চালু হওয়ায় সড়ক দুর্ঘটনা ও চালকদের বেপরোয়া মনোভাব সত্যি কি কমবে?



