পাহাড়ধস ও বন্যায় ৫ দিনে প্রাণ গেল ৩৫ জনের

টানা ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের কারণে সৃষ্ট পাহাড়ধস এবং বন্যায় চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মৌলভীবাজারসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় গত পাঁচ দিনে অন্তত ৩৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে পাহাড়ধসে প্রাণ হারিয়েছেন ২৯ জন এবং বন্যার পানিতে ডুবে মারা গেছেন ছয়জন। একই সঙ্গে বন্যার কারণে লাখো মানুষ পানিবন্দী হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

সবচেয়ে বেশি প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে কক্সবাজারে। সেখানে পাহাড়ধসে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ১৩ জনসহ মোট ১৭ জন নিহত হয়েছেন। এছাড়া পাহাড়ি ঢল ও প্রবল স্রোতের পানিতে ভেসে গিয়ে আরও তিনজনের মৃত্যু হয়েছে।

চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার বাহারছড়া ইউনিয়নে শুক্রবার সকালে পৃথক দুটি স্থানে বন্যার পানিতে ডুবে আশিক ও মিরাজ নামে দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর আগে ভোরে কক্সবাজারের চকরিয়ায় আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার পথে নৌকাডুবিতে হাসনাতুল জান্নাত নামে এক শিশুর মৃত্যু হয়।

উপজেলা প্রশাসন জানায়, চকরিয়ার বরইতলী ইউনিয়নে প্রবল স্রোতের মধ্যে ৬ থেকে ৮ জন যাত্রী নিয়ে একটি নৌকা উল্টে যায়। অধিকাংশ যাত্রী সাঁতরে তীরে উঠতে সক্ষম হলেও হাসনাতুল জান্নাত নিখোঁজ হয়। পরে ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল প্রায় ছয় ঘণ্টা অভিযান চালিয়ে তার মরদেহ উদ্ধার করে। এ ঘটনায় আহত আরও দুই শিশুকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে।

এদিকে, মৌলভীবাজারের রাজনগরে বন্যার পানিতে ডুবে এক বৃদ্ধসহ আরও দুজনের মৃত্যু হয়েছে।

উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও টানা বৃষ্টিতে দেশের বিভিন্ন স্থানে নদীর বাঁধ ভেঙে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে এখনও কয়েক লাখ মানুষ পানিবন্দী। খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানের বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চল তলিয়ে গেছে। হবিগঞ্জে খোয়াই নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙে অন্তত ১৫টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। অন্যদিকে রংপুর ও লালমনিরহাটে নদীভাঙন শুরু হয়েছে।

চট্টগ্রামে তিন দিন পর বৃষ্টির তীব্রতা কিছুটা কমলেও দক্ষিণ চট্টগ্রামের বিস্তীর্ণ এলাকা এখনও পানির নিচে। বাঁশখালীর পশ্চিম গুনাগরী, বাহারছড়া, সাধনপুর ও বাণীগ্রাম ইউনিয়নের বহু মানুষ পানিবন্দী রয়েছেন। বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় রান্নাসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় কাজ ব্যাহত হচ্ছে। ফলে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

কক্সবাজারের চকরিয়া, পেকুয়া ও রামুর অন্তত ২০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। পানিবন্দী মানুষের দুর্ভোগ বেড়েছে। একই সঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি এলাকায় বসবাসকারীদের নিরাপদ স্থানে সরে যেতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিয়মিত মাইকিং করা হচ্ছে।

খাগড়াছড়ির মেরুং ইউনিয়নের অন্তত ২০টি গ্রামের প্রায় পাঁচ হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন। এছাড়া দীঘিনালা-লংগদু সড়কে সরাসরি যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে।

ফেনীতে বন্যার পানি কিছুটা কমলেও জেলা শহরে জলাবদ্ধতা তীব্র আকার ধারণ করেছে। তবে ভারতের ত্রিপুরায় ভারী বৃষ্টি হলে মুহুরী ও সিলোনীয়া নদীর পানি বেড়ে আবারও বন্যার আশঙ্কা রয়েছে।

অন্যদিকে, সিলেট অঞ্চলেও গত দুই দিন ধরে ভারী বর্ষণ অব্যাহত রয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তর সেখানে অতি ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস দিয়েছে।

হবিগঞ্জের লস্করপুর ইউনিয়নের কালীগঞ্জ এলাকায় খোয়াই নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙে অন্তত ১৫টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এতে হবিগঞ্জ-মিরপুর সড়কে যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। সুনামগঞ্জে সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর পানি বাড়ছে। পাহাড়ি ঢলে তাহিরপুর উপজেলার আনোয়ারপুর ও শক্তিয়ারখলা সড়ক পানির নিচে তলিয়ে গেছে।

সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমান বলেন, ‘জেলায় স্থায়ী ও অস্থায়ী মিলিয়ে ১ হাজার ৩১১টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। পাশাপাশি নৌকা, স্পিডবোট, স্বেচ্ছাসেবকসহ প্রয়োজনীয় সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন রয়েছে।’

এদিকে, রংপুরের গঙ্গাচড়ায় নদীভাঙন শুরু হওয়ায় প্রায় পাঁচ হাজার পরিবার ঝুঁকির মুখে পড়েছে। লালমনিরহাটে তিস্তার পানি কিছুটা কমলেও নদীতীরবর্তী মানুষের শঙ্কা এখনও কাটেনি।