পটুয়াখালীর বাউফলে চরের জমি নিয়ে দুই পক্ষের বিরোধের জেরে প্রায় ২০০ একর জমির তরমুজ চাষাবাদ মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এতে বিপাকে পড়েছেন শতাধিক চাষি। ঠিকমতো সার, কীটনাশক ও পরিচর্যা করতে না পারায় প্রায় ৪ কোটি টাকা ক্ষতির আশঙ্কা করছেন তারা। ঘটনাটি ঘটেছে উপজেলার চর কচুয়া চরে।
ভুক্তভোগী চাষিরা অভিযোগ করেছেন, বিরোধ নিষ্পত্তি ও চাষাবাদ চালু রাখার দাবিতে জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েও এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর সমাধান পাওয়া যায়নি।
বন্দোবস্তপ্রাপ্ত জমির মালিকদের ভাষ্যমতে, উপজেলার চর কচুয়া মৌজায় সরকার ১৯৭৩ ও ১৯৯৪ সালে পর্যায়ক্রমে ২০৮ জন কৃষককে প্রায় ৪০৮ একর জমি বন্দোবস্ত দেয়। এর মধ্যে অধিকাংশ জমি তেঁতুলিয়া নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। বর্তমানে প্রায় ২১৩ একর জমি চাষাবাদের উপযোগী রয়েছে, যেখানে বন্দোবস্তপ্রাপ্ত কৃষকরা নিয়মিত খাজনা দিয়ে চাষাবাদ করে আসছেন।
চলতি মৌসুমে এসব জমিতে তরমুজ আবাদ করেন চাষিরা। তবে অভিযোগ রয়েছে, প্রায় তিন মাস আগে সাবেক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও ভারপ্রাপ্ত সহকারী কমিশনার (ভূমি) আমিনুল ইসলাম বন্দোবস্তপ্রাপ্ত জমির মধ্য থেকে ১২০ একর জমি নাম-বেনামে একটি প্রভাবশালী মহলকে এক বছরের জন্য চাষাবাদের (লিজ) অনুমতি দেন। এ নিয়েই দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধের সৃষ্টি হয়।
বন্দোবস্তপ্রাপ্ত কৃষকদের অভিযোগ, এক বছরের অনুমতি পাওয়া পক্ষের লোকজন ওই জমিতে তরমুজ চাষে বাধা দিচ্ছেন। এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হলেও এখনো কোনো সুরাহা হয়নি।
তেঁতুলিয়া নদীর মাঝখানে অবস্থিত চর কচুয়ার চারপাশে অস্থায়ী বেড়িবাঁধ দিয়ে তরমুজের বড় প্রকল্প করা হয়েছে। সেখানে চারা রোপণ করা হলেও নিয়মিত সার, কীটনাশক ও পরিচর্যা করতে পারছেন না কৃষকরা। ফলে খেতেই কোটি টাকার প্রকল্প নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
ভোলার চরফ্যাশনের তরমুজ চাষি মো. ফোরকান বলেন, ‘প্রতিবছর আমরা বাউফলের বিভিন্ন চরে জমি লিজ নিয়ে তরমুজ আবাদ করি। এ বছর চর কচুয়ায় বন্দোবস্তপ্রাপ্ত জমির মালিকদের কাছ থেকে ২০০ একর জমি লিজ নিয়ে চাষ করেছি। এখন একটি পক্ষ জমির মালিক দাবি করে আমাদের কাছে টাকা দাবি করছে। টাকা না দেওয়ায় তারা চাষাবাদ বন্ধ করে দিয়েছে এবং দেশীয় অস্ত্র দেখিয়ে ভয়ভীতি দেখাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে আমাদের ৪ কোটির বেশি ক্ষতি হবে।’
চন্দদ্বীপ ইউনিয়নের বাসিন্দা জামাল মাঝি বলেন, ‘যারা দীর্ঘদিন ধরে জমি ভোগদখল করে আসছে, তাদের কাছ থেকেই আমরা জমি লিজ নিয়েছি। তরমুজ গাছ বড় হওয়ার পর নাজিরপুর ইউনিয়নের নরুল ইসলাম, অলি ও আনসার মেম্বারসহ একটি পক্ষ এসে নিজেদের জমির মালিক দাবি করছে। তারা ইউএনও থেকে নাকি ডিসিআর পেয়েছে বলে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করছে। টাকা না দেওয়ায় চাষাবাদ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এক পক্ষকে টাকা দিয়েছি। আরেক পক্ষকে দেওয়া সম্ভব না। দুই পক্ষ প্রশাসনের মাধ্যমে সমাধান করুক। কিন্তু আমাদের চাষ বন্ধ করে দেওয়ার কোনো অধিকার তাদের নেই। এভাবে চলতে থাকলে আমরা পথে বসব।’
নাজিরপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা মজিবর রহমান মোল্লা বলেন, ‘সরকার আমাদের ২০৮ জন কৃষককে বন্দোবস্ত দলিল দিয়েছে। বর্তমানে প্রায় ২০০ একর জমি চাষযোগ্য রয়েছে, যেখানে আমরা বছরের পর বছর চাষাবাদ করছি। সাবেক ইউএনও অবৈধ সুবিধা নিয়ে সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে একটি প্রভাবশালী মহলকে এক বছরের লিজ দেন। তারা আমাদের হয়রানি করছে, মারধর ও প্রাণনাশের হুমকিও দিচ্ছে। আমরা অবৈধ লিজ বাতিল ও চাষাবাদ চলমান রাখার দাবিতে জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছি।’
এক বছরের জন্য চাষাবাদের অনুমতি পাওয়া পক্ষের প্রতিনিধি নুরুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা কাউকে ভয়ভীতি দেখাইনি। সহকারী কমিশনার (ভূমি) আমাদের ২৪ জনকে ১২০ একর জমি চাষাবাদের অনুমতি দিয়েছেন। সে অনুযায়ী আমরা ভোগদখল বুঝে নিতে চাই। কিন্তু অপর পক্ষ আমাদের জমি বুঝিয়ে দিচ্ছে না।’
এ বিষয়ে সাবেক ইউএনও ও ভারপ্রাপ্ত সহকারী কমিশনার (ভূমি) আমিনুল ইসলামের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের কারণে তাকে বাউফল থেকে বদলি করা হয়েছিল বলে জানা গেছে।
বর্তমান সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. সোহাগ মিলু বলেন, ‘আগের সহকারী কমিশনার জমির লিজ দিয়েছেন। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এ বিষয়ে প্রতিবেদন চেয়েছিলেন। আমি প্রতিবেদন জমা দিয়েছি।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সালেহ আহমেদ বলেন, ‘বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। বিরোধ নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দ্রুত সমাধান করা হবে।’