কুবিতে উপাচার্য–শিক্ষক দ্বন্দ্ব, শিক্ষার্থীদের ক্ষতির দায় কে নেবে

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে চলমান শিক্ষক সমিতির আন্দোলনের সর্বশেষ ঘোষণা অনুযায়ী সকল অ্যাকাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম থেকে নিজেদের বিরত রাখার ঘোষণা দিয়েছেন শিক্ষকেরা। যদিও বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য বলছেন, সমস্যা সমাধানে-আলোচনার জন্য দায়িত্ব নিয়েছে সিন্ডিকেট। কিন্তু শিক্ষকেরা তা মানছেন না। তবে আন্দোলনের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক শ্রেণি কার্যক্রম এবং পরীক্ষার যে ক্ষতি হচ্ছে তার দায় কে নেবে, এ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষার্থী জানান, গত দুই বছরের সেশনজট কমিয়ে আনার চেষ্টার কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণি কার্যক্রমে কিছুটা স্বাভাবিকতা ফিরে এসেছিল, কিন্তু এর মধ্যেই এই আন্দোলন। এর ফলে আবারও সেশনজটে পড়ার আশঙ্কা করছেন তাঁরা। আন্দোলনের সমস্যা সমাধানে সংশ্লিষ্ট সবাইকে আন্তরিক হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা।

বাংলা বিভাগের ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী তাওহীদ হোসেন সানি বলেন, ‘করোনা মহামারির কারণে আমাদের শিক্ষাজীবন অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তার ওপর এখন শিক্ষকদের ক্লাস–পরীক্ষা বয়কটের সিদ্ধান্ত যেন মরার উপর খাঁড়ার ঘা। ঈদের পর আমাদের স্নাতকোত্তর প্রথম সেমিস্টার পরীক্ষা শুরু হওয়ার কথা, কিন্তু ঈদের আগেও ক্লাস বয়কটের কারণে ক্লাস হয়নি, ঈদের পর এসেও ক্লাস হচ্ছে না। তাতে আমাদের কোর্সও শেষ হচ্ছে না, পরীক্ষায় বসতে পারছি না। আমাদের বয়সতো থেমে নেই।’

মার্কেটিং বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী পাভেল রানা বলেন, ‘করোনার কারণে আমরা অ্যাকাডেমিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। এখন আবার শিক্ষকেরা ক্লাস-পরীক্ষা নিচ্ছে না। এভাবে আমরা পিছিয়ে যাচ্ছি। শিক্ষক সমিতি ও উপাচার্যের মধ্যে যে ঝামেলা সেটা তারা আলোচনা করে সমাধান করুক। আমাদের কেন জিম্মি করে হচ্ছে! আমরা স্বাভাবিক ক্লাস কার্যক্রম চাই। দ্রুত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হতে চাই।’

এদিকে শিক্ষার্থীদের জিম্মি করে শিক্ষক সমিতি আন্দোলনে নেমেছেন বলে মন্তব্য করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এএফএম আবদুল মঈন। গতকাল সোমবার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতি উপাচার্যের পদত্যাগের দাবিতে প্রশাসনিক ও অ্যাকাডেমিক সকল কার্যক্রম বর্জনের ঘোষণার পর বিকেলে উপাচার্য এ কথা বলেন।

উপাচার্য বলেন, ‘শিক্ষার্থীবান্ধব শিক্ষক সমিতি হলে এ ধরনের কর্মসূচি থেকে তারা বিরত থাকতেন। আমরা গত দুই বছরের সেশনজট কমানোর চেষ্টা করছি। আমরা বলেছি, যে কোনো সমস্যা সমাধানে আলোচনায় আসেন, কিন্তু তারা যদি সমাধানে না এসে শিক্ষার্থীদের জিম্মি করে এবং শিক্ষার্থীদের ক্ষতি করে, তা কতটা যৌক্তিক এবং মানবিক এই প্রশ্ন রইলো।’

এর আগে সোমবার দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক লাউঞ্জে জরুরি সভা শেষে শিক্ষক সমিতির দাবি না মানা পর্যন্ত প্রশাসনিক ও অ্যাকাডেমিক সকল কার্যক্রম বর্জনের ঘোষণা দেন সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আবু তাহের ও সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান। তবে শিক্ষক সমিতি বলছে, ভর্তি পরীক্ষা তাদের কর্মসূচির বাইরে থাকবে।

অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আবু তাহের সাংবাদিকদের বলেন, ‘যে উপাচার্য নিজেই হামলায় অংশগ্রহণ করে সন্ত্রাসীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হন, আমরা শিক্ষকেরা মনে করি এই উপাচার্য তাঁর পদে থাকার যোগ্যতা আর নেই। উপাচার্যের সকল অনৈতিক কার্যক্রমে সহায়তা করে কোষাধ্যক্ষ। তাই উপাচার্য ও কোষাধ্যক্ষ যদি পদত্যাগ না করে কিংবা সরকার যদি তাকে অপসারণ না করে তাহলে শিক্ষক সমিতির শিক্ষকেরা বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো অ্যাকাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করবেন না।’

এদিকে গত রোববার দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য তার দপ্তরে প্রবেশ করতে যাওয়ার সময় উপাচার্যপন্থীদের সঙ্গে আন্দোলনরত শিক্ষকদের হাতাহাতি হয়। এই ঘটনায় উভয় পক্ষ থেকে আহত হওয়ার দাবি করা হয়েছে।

শিক্ষকদের দাবি, বহিরাগত ও অছাত্রদের আক্রমণের শিকার হয়েছেন তাঁরা। অন্যদিকে উপাচার্যের দাবি, শিক্ষকেরা তাঁকে বেআইনিভাবে আটকাতে চেয়েছেন। এ সময় তিনিসহ তাঁর পক্ষের আরও কয়েকজন আহত হয়েছেন। এই ঘটনায় উভয় পক্ষই সদর দক্ষিণ থানায় লিখিত অভিযোগ করেছেন।

বেশকিছু দাবি তুলে ধরে শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান বলেন, ঘটনায় জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে হবে। উপাচার্যের উপস্থিতিতে শিক্ষকদের ওপর হামলার বিচার, প্রক্টরের অপসারণ, ঢাকার গেস্টহাউস অবমুক্তকরণ, অধ্যাপকদের পদোন্নতি, আইন মোতাবেক বিভাগীয় প্রধান ও ডিন নিয়োগ, শিক্ষক নিয়োগ, পদোন্নতি ও স্থায়ীকরণের ক্ষেত্রে আইন বহির্ভূত অবৈধ শর্ত আরোপ নিষ্পত্তিকরণ, ৯০তম সিন্ডিকেট সভায় বিতর্কিত শিক্ষাছুটি নীতিমালা রহিতকরণ এবং ৮৬তম সিন্ডিকেট সভায় অনুমোদিত স্থায়ীকরণ সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত বাতিল করাসহ ৭ দফা দাবিতে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতি বেশ কিছুদিন ধরেই আন্দোলন করে আসছে। উপাচার্য তাদের দাবি না মানায় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, ট্রেজারার এবং প্রক্টরকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছি এবং তাদের দপ্তরে তালা দেওয়া হয়। এতেও কোনো ফল না আসায় উপাচার্যের পদত্যাগের এক দফা দাবিতে আন্দোলন শুরু করি।

যদিও উপাচার্য বলছেন, সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্ত মেনে আলোচনায় আসছে না শিক্ষক সমিতি। বিভিন্ন দাবিতে গত বছরের জুন মাস থেকে এখন পর্যন্ত ১৫ জন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক তাদের প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে পদত্যাগ করেছেন।