জাহাজে ৭ খুন: আহত জুয়েলকে ঘিরে রহস্য উদঘাটনে নামছে নৌপুলিশ

ডাকাতি, জাহাজ শ্রমিকদের মধ্যে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব নাকি মালিকদের ব্যবসায়ী বিরোধ—এ বিষয়গুলোকে সামনে রেখে চাঁদপুরের মেঘনায় জাহাজে সাতজন হত্যার ঘটনায় তদন্ত করছে নৌপুলিশ। তারা বলছে, ঘুমের ঔষধ কিংবা চেতনানাশক খাইয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে নৌযান শ্রমিকদের। ইতোমধ্যে চারটি মোবাইলসহ হত্যায় ব্যবহৃত একটি চাইনিজ কুড়াল ও ছুরি জাহাজ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে।

চাঁদপুরে মেঘনা নদীতে নোঙর করে রাখা এমভি আল-বাখেরা কার্গো জাহাজ থেকে মাথায় ও মুখে কোপানো পাঁচজনের মরদেহ উদ্ধার করে নৌপুলিশ। এছাড়া গুরুতর আহত তিনজনকে জেলা সদর হাসপাতালে নিয়ে গেলে সেখানে মারা যান আরও দুজন। জাহাজটি ৮০০ টন বিসিআইসি-এর ইউরিয়া সার নিয়ে চট্টগ্রাম থেকে যাচ্ছিল সিরাজগঞ্জের বাঘাবাড়ি বন্দরে।  

নৌপুলিশ বলছে, এমভি আল বাখেরায় থাকা ইউরিয়া সার চুরি, জাহাজ শ্রমিকদের মধ্যে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, মালিকদের ব্যবসায়িক স্বার্থকে গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করছে তারা। পাশাপাশি জীবিত জুয়েল রানার গলায় আহতের পরিমাণ খুব কম, অন্যদের কোপানো হয়েছে নৃশংসভাবে—সে বিষয়েও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

চাঁদপুর নৌপুলিশ সুপার সৈয়দ মোশফিকুর রহমান বলেন, ‘চেতনানাশক কিংবা ঘুমের ওষুধ খাইয়ে একে একে পরিকল্পিতভাবে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে সাতজনকে। জুয়েলকে জিজ্ঞাসাবাদ করলেই হত্যার কারণ জানা যাবে।’

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বরাত দিয়ে সৈয়দ মোশফিকুর রহমান আরও বলেন, ‘সাতজনের শরীরের আঘাতের ধরন আর আহত জুয়েলের আঘাতের ধরন আলাদা। সবার শরীরের মাথায় জখম বেশি। আর জুয়েলের শুধুমাত্র গলায় জখম। বিষয়টিতে গুরুত্ব দিয়ে জুয়েলের চিকিৎসাসেবায় নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। সে ফরিদপুর সদর উপজেলার বাসিন্দা।’

এমভি আল বাখেরার মালিক ছয়জন। তাদের মধ্যে জাহাজের মালিক মাহাবুব মুর্শেদের সঙ্গে কথা হয়। তিনি জানান, তাদের মধ্যে কোনো বিরোধ নেই, এ হত্যাকাণ্ডের সঠিক ঘটনার তদন্ত ও সুষ্ঠু বিচার চান তারাও। জাহাজের মাস্টার গোলাম কিবরিয়ায় বাকি শ্রমিকদের নিয়োগ দিয়েছে। মালিকপক্ষ শুধুমাত্র ইঞ্জিনচালক ও জাহাজের মাস্টারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখে। গেল শনিবার সকাল ৮টায় জাহাজটি চট্টগ্রাম থেকে ছেড়েছে। রোববার সন্ধ্যায় ইঞ্জিনচালক সালাউদ্দিনের সঙ্গে কথা হয় তার। তখন তারা ভোলার সংলগ্ন গজারিয়া নামক স্থানে ছিল। জাহাজের সব মালিকের বাড়ি ঢাকার দোহার উপজেলায়।

এদিকে, জাহাজে খুন হওয়া ৭ জনের মরদেহ মঙ্গলবার বিকালে হস্তান্তর করেছে জেলা প্রশাসক মহসীন উদ্দিন ও নৌপুলিশ সুপার সৈয়দ মোশফিকুর রহমান। ওই সময় জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিহত পরিবারের স্বজনদের ২০ হাজার টাকার চেক ও নৌপুলিশের পক্ষ থেকে নগদ ১০ হাজার টাকা প্রদান করা হয়। 

নিহতদের মধ্যে জাহাজের মাস্টার গোলাম কিবরিয়া (৫৫), তার ভাগিনা শেখ সবুজের (২৮) বাড়ি ফরিদপুর। মাজেদুল (১৬) ও সজিবুল ইসলামের (২৯) বাড়ি মাগুরা জেলায় আর সুকানী আমিনুর মুন্সী ও গ্রিজারম্যান সালাউদ্দিন মিয়া (৪০) নড়াইল জেলার বাসিন্দা।  

এ ঘটনায় হাইমচর মডেল থানায় অজ্ঞাত ১০ থেকে ১২ জনকে আসামি করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছে নিহত মাস্টার গোলাম কিবরিয়ার স্বজনরা। 

নৌপুলিশ সুপার সৈয়দ মোশফিকুর রহমান বলেন, ‘হাইমচর মডেল থানায় মামলাটি দায়ের করা হবে। এ ঘটনায় আহত জুয়েলকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।’

জুয়েল সুস্থ হলেও ঘটনার কারণ জানা যাবে বলে তিনি দাবি করেন। ইতোমধ্যে শিল্প মন্ত্রণালয়, জেলা প্রশাসন ও নৌ-পুলিশের পক্ষ থেকে পৃথক পৃথক তদন্ত টিম গঠন করা হয়েছে।

চাঁদপুরের মেঘনা নদীর হাইমচরের ঈশানবালার মাঝেরচর সংলগ্নে মালবাহী জাহাজে ৭ জনকে কুপিয়ে খুনের ঘটনা ঘটে। সোমবার দুপুরে ৯৯৯ এ এমন নৃশংসভাবে খুনের ঘটনার খবরে ঘটনাস্থলে যায় নৌপুলিশ, কোস্টগার্ডসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। 

এর আগে, ১৯ ডিসেম্বর রাতে মেঘনা নদীর এ এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে কোস্টগার্ড। সেসময় ডাকতরা পালিয়ে গেলে তাদের স্পিড বোড একটি একনলা বন্দুক ও বিপুল পরিমাণ দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করে তারা। নৌযান শ্রমিকরা বলছে, শীতকালে কুয়াশা মধ্যে প্রায়ই ডাকাতির ঘটনা ঘটে এ এলাকায়।