ইতালির রাজধানীতে শিশু কন্যাসহ বাংলাদেশি দম্পতি খুনের ঘটনায় প্রধান সন্দেহভাজন শাহাদাত হোসেনের বাড়িও নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জে। তিনি উপজেলার চরকাঁকড়া ইউনিয়নের আবদুল আহাদের ছেলে। ইতালির প্রসিকিউটর এই হত্যাকাণ্ডের প্রধান অভিযুক্তের ছবি প্রকাশের পর তা শনাক্ত করে নিহতদের ও শাহাদাতের স্বজনেরা।
নিহতদের স্বজন ও স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিবেশী শাহাদাতের সঙ্গে নিহত দম্পতির আগে থেকেই চেনাজানা ছিল। পরে কামালের স্ত্রীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন শাহাদাত। তাদের অভিযোগ, এর জেরে তিনি এই হত্যাকাণ্ড ঘটনিয়ে থাকতে পারেন শাহাদাত। সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে হত্যাকারীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে ইতালি ও বাংলাদেশ সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছেন নিহতদের স্বজন ও এলাকাবাসী।
এর আগে শুক্রবার স্থানীয় সময় রাত ৯টার দিকে রোমের পশ্চিমাঞ্চলের অরেলিও এলাকার ভিয়া মন্টিগ্লিও সড়কের একটি পার্কসংলগ্ন এলাকার একটি ফ্ল্যাট থেকে তিনজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। নিহতরা হলেন- নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার চরকাঁকড়া ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের চরকাঁকড়া বিজয়নগর এলাকার বাসিন্দা কামাল উদ্দিন বাবুল (৩৯), তাঁর স্ত্রী আরজু (৩৮) এবং তাদের পাঁচ বছর বয়সী মেয়ে আরিশা। এ ঘটনায় গুরুতর আহত হয়েছেন তাদের ছেলে অয়ন (১৮); যিনি বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
ইতালির রাজধানীতে শিশু কন্যাসহ বাংলাদেশি দম্পতি খুনের ঘটনায় রোম প্রসিকিউটর কার্যালয় সন্দেহভাজন শাহাতাদ হোসেনের ছবি প্রকাশ করে। এরপর তাঁকে শনাক্ত করেছেন নিহতের পরিবার ও স্বজনেরা।
নিহত কামালের চাচাত ভাই ও একই বাড়ির বাসিন্দা সাজ্জাদ মাহমুদ বলেন, শাহাদাত হোসেন নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার চরকাঁকড়া ইউনিয়নের আবদুল আহাদের ছেলে। প্রতিবেশী কামালের পরিবারে এক সময় শাহাদাতের নিয়মিত যাতায়াত ছিল। এক সময় কামাল একাই ইতালিতে থাকতেন। তার পরিবার বাংলাদেশে কোম্পানিগঞ্জের বাড়িতে থাকতেন। এই সময় শাহাদাতের সঙ্গে কামালের স্ত্রী ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। এটা নিয়ে তখন এলাকায় বিচার-সালিসও বসে। এরপর দুই বছর আগে কামাল তাঁর স্ত্রী ও পরিবারকে ইতালিতে নিয়ে যান।
সাজ্জাদ মাহমুদ জানান, ২০২৫ সালের কোরবানির ঈদের সময় কামাল স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে দুই মাসের ছুটি নিয়ে কোম্পানিগঞ্জে আসেন। তখন তার বাড়িতে একটি উড়ো চিঠি আসে। সেই চিঠিতে স্বর্ণালঙ্কার ও টাকা-পয়সা দাবি করা হয়। আর দাবি পূরণ না হলে গৃহকর্তার প্রবাসী ছেলে ও নাতিকে হত্যা এবং কামালের স্ত্রীকে গণধষর্ণের হুমকি দেওয়া হয়েছিল। হুমকির মুখে তারা ২৬ দিনের মাথায় ইতালিতে ফিরে যান কামাল। এ ঘটনায় শাহাদাতের সম্পৃক্ততা রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও নিহতের পরিবারের স্বজন অ্যাডভোকেট মো. ইউনুস সুমন বলেন, শাহাদাত হোসেন প্রায় চার বছর আগে তার স্ত্রী, এক ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমান। সেখানে তার স্ত্রীর সঙ্গে বিচ্ছেদ হয়। বছরখানেক আগে হয়তো তিনি ইতালিতে যান। শাহাদাতের ইতালি যাওয়ার ক্ষেত্রে কামালের স্ত্রী সহযোগিতা করেন বলে জানান স্থানীয় বাসিন্দারা।
ইতালি যাওয়ার পর শাহাদাতকে নিজের বাড়ির আশপাশে না যেতে বলে জানিয়েছেন কামাল। কিন্তু তিনি কোনো বাধাই শুনেনি বলে জানান এক স্বজন।
ঘটনার পর সন্দেহভাজন শাহাদাত তার ফেইসবুক আইডিতে একটি স্ট্যাটাস দেন। ওই স্ট্যাটাসে তিনি লেখেন, ‘একজন মানুষ শুধু নিজে একা মরে না, নিজেও মরে অন্যকেও মরার মতো করে রেখে যায়। তাই মরার সময় প্রিয়জনদেরও সঙ্গে নিয়ে মরা উচিত। তাতে কারও জন্য কাউকে কষ্ট পেতে হয় না।’
স্ত্রী ও শিশু কন্যাসহ কামালের এমন নির্মম হত্যাকাণ্ড কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না স্বজন ও এলাকাবাসী। তারা সুষ্ঠ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত হত্যাকারীকে চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শান্তি নিশ্চিত করার পাশাপাশি নিহতদের মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে ইতালি ও বাংলাদেশ সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছেন।
রোববার সন্দেহভাজন শাহাদাত হোসেনের চরকাঁকড়া হৃয়নগর এলাকার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে তার মা ও ছোট ভাইয়ের পরিবার রয়েছেন। তবে তাদের দাবি, চার বছর ধরে শাহাদাতের সঙ্গে পরিবারের কোনো যোগাযোগ নেই।
শাহাদাতের বড় ভাই সৌদি প্রবাসী ইসমাইল হোসেন হারুন বলেন, ‘চার বছর আগে শাহাদাত সব সম্পত্তি বিক্রি করে পরিবারসহ যুক্তরাজ্যে চলে যায়। এরপর থেকে পরিবারের সঙ্গে তার তেমন যোগাযোগ ছিল না।’
কোম্পানীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. নুরুল হাকিম বলেন, ‘উড়ো চিঠিতে হুমকির বিষয়টি ভুক্তভোগী পরিবার মৌখিকভাবে বিষয়টি পুলিশকে জানিয়েছিল। এরপর পুলিশ নিয়মিত টহলের মাধ্যমে তাদের নিরাপত্তার বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করেছিল।’