ধসের শঙ্কা বাড়লেও উচ্ছেদ করা যাচ্ছে না পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ বসবাস

বৃষ্টিতে পাহাড়ধসে প্রাণহানির শঙ্কা বাড়লেও চট্টগ্রামের পাহাড়গুলোতে ঝুঁকিপূর্ণ বসতি উচ্ছেদ করা যাচ্ছে না। দখলদারদের বিরুদ্ধে সারা বছর চুপ থাকা প্রশাসন বর্ষায় শুধু মাইকিং ও নির্দেশনা দিয়েই দায়িত্ব সারছে। ফলে দিন দিন বাড়ছে ঝুঁকিপূর্ণ বসতির সংখ্যা। দুই দশকে আড়াই শতাধিক মৃত্যুও যেন থামাতে পারছে না এই ঝুঁকিপূর্ণ বসবাস। 
 
টানা ভারী বৃষ্টি হলেই উদ্বেগে থাকে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন, জেলা প্রশাসন ও ফায়ার সার্ভিস। কখন ধসে পড়বে পাহাড়? আর কখন ঝুঁকিপূর্ণ বসতিতে ঘটে প্রাণহানি? অথচ যাদের নিয়ে এই শঙ্কা, তাদের অনেকেই বৃষ্টি-ঝড় উপেক্ষা করেই রয়ে যান পাহাড়ের ঢালে। প্রশাসনের সতর্কবার্তা, মাইকিং কিংবা সরে যাওয়ার নির্দেশনাও টলাতে পারে না তাদের।

দুই দশকে চট্টগ্রামে পাহাড়ধসে প্রাণ গেছে অন্তত ২৫৯ জনের। চলতি বছরও সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুর, রহমাননগরে নিহত হয়েছেন দুই শিশুসহ তিনজন। পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটি ও ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের তালিকা থাকলেও উচ্ছেদে নেই খুব একটা উদ্যাগে। প্রভাবশালীদের আশ্রয়েই চলে পাহাড়ে দখলবাজি। শুধু বর্ষা এলেই নিরাপত্তা নিয়ে শুরু হয় তোড়জোড়।

নগরপরিকল্পনাবিদ শাহজালাল মিশুক বলেন, ‘কর্মস্থলের কাছাকাছি অবস্থান, কম ভাড়া এবং সহজে জায়গা পাওয়ার কারণে এসব পাহাড়ে অনানুষ্ঠানিক বসতি গড়ে উঠেছে। বাসিন্দাদের বেশির ভাগই রিকশাচালক, পোশাকশ্রমিক, দিনমজুর, গৃহকর্মী ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, যাদের পক্ষে অন্যত্র বাসা ভাড়া নেওয়া কঠিন।’

বিশেষজ্ঞরা বলছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে টানা ভারি বৃষ্টি বেড়েছে। ফলে ন্যাড়া ও বেলে মাটির পাহাড়ে ধসের ঝুঁকিও বাড়ছে।

চুয়েটের সাবেক উপাচার্য মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘বাংলাদেশের পাহাড় প্রতিবেশী অনেক দেশের তুলনায় ভূতাত্ত্বিকভাবে বেশি নাজুক। আমাদের পাহাড় নরম ও আলগা মাটি দিয়ে গঠিত। সামান্য পাহাড় কাটাও ঢালকে অস্থিতিশীল করে তোলে। আর দীর্ঘ সময়ের বৃষ্টিপাতই অনেক ক্ষেত্রে পাহাড়ধসের তাৎক্ষণিক কারণ হয়ে দাঁড়ায়। চট্টগ্রামের অনেক পাহাড় ইতোমধ্যে সমতল করে ফেলা হয়েছে। যেগুলো এখনো টিকে আছে, সেগুলোরও অধিকাংশে গাছপালা নেই। ফলে সেগুলো আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। অবশিষ্ট পাহাড় রক্ষা করতে হলে ঝুঁকিপূর্ণ বসতি স্থানান্তর এবং ব্যাপক বনায়ন কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে। তা না হলে শুধু পাহাড়ই নয়, চট্টগ্রামের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও পরিবেশগত ভারসাম্যও হারিয়ে যাবে।’

এবারও পাহাড়ে বসতি উচ্ছেদে শক্ত অবস্থানের কথা বলছে জেলা প্রশাসন। তবে মানুষের সচেতনতার অভাব ও লোভ বড় বাধা বলে মন্তব্য জেলা প্রশাসকের।

চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, ‘টানা বৃষ্টিতে পাহাড়ধসের ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় প্রশাসন সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিয়েছে।’

পাহাড়ধসে মৃত্যু ঠেকাতে শুধু আইনি পদক্ষেপ নয়, কমাতে হবে প্রভাবশালীদের দৌরাত্ম্যও। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ক্ষেত্রে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে রাজনৈতিক নেতৃত্বের সহযোগিতা জরুরি।