১১ কর্মকর্তার দায়িত্ব একজনের হাতে!

নবীনগরে প্রাথমিক শিক্ষা লাটে ওঠার উপক্রম

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার পাশাপাশি ১১ জন সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার পদ রয়েছে। কিন্তু বর্তমানে দায়িত্ব পালন করছেন মাত্র একজন। অফিসের করণিক, উচ্চমান সহকারী, অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক ও অফিস সহায়কের অধিকাংশ পদও দীর্ঘদিন ধরে শূন্য। 

ফলে ২১৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, প্রায় ১ হাজার ৪০০ শিক্ষক ও ৫৫ হাজার শিক্ষার্থীর প্রশাসনিক কার্যক্রম কার্যত একজন সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা ও একজন হিসাব সহকারীর ওপর নির্ভর করছে।

সম্প্রতি নবীনগর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে গিয়ে দেখা যায়, অধিকাংশ কক্ষ তালাবদ্ধ। দুটি কক্ষ ছাড়া অন্য কোথাও তেমন কর্মচাঞ্চল্য নেই। টেবিলজুড়ে জমে আছে ফাইলের স্তূপ। প্রয়োজনীয় কাজের জন্য শিক্ষকরা নিজেরাই ফাইল খুঁজে বের করছেন। 

একাই সামলাচ্ছেন দেড় হাজার জনবলের কাজ
‘আমার ঘাড়ের দুটি রগ ব্লক হয়ে আছে। ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, লিভারের সমস্যা ও শ্বাসকষ্টে ভুগছি। এভাবে আর কিছুদিন চললে মনে হয় অফিস করতে পারব না।’ কথাগুলো বলছিলেন নবীনগর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের হিসাব সহকারী মো. আবু হানিফ। দীর্ঘদিন ধরে চরম জনবলসংকটের কারণে অতিরিক্ত কাজের চাপ তার স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলেছে।

আবু হানিফ বলেন, ২০১২ সালে তিনি যোগ দেওয়ার সময় অফিসে চারজন কর্মচারী ছিলেন। তখন বিদ্যালয় ও শিক্ষকের সংখ্যাও কম ছিল। ধাপে ধাপে অন্যরা অবসরে বা বদলি হলেও নতুন কেউ যোগ দেননি। প্রায় দুই বছর ধরে তিনি একাই দাপ্তরিক ও আর্থিক সব কাজ সামলাচ্ছেন।

হিসাব সহকারী আবু হানিফ আরও বলেন, ‘২১৯টি বিদ্যালয়, প্রায় ১ হাজার ৪০০ শিক্ষক এবং শতাধিক দপ্তরির প্রশাসনিক ও আর্থিক কাজ আমাকে একাই করতে হচ্ছে। অতিরিক্ত চাপের কারণে শারীরিকভাবে ভেঙে পড়েছি। এই অবস্থায় দায়িত্ব পালন করা খুবই কঠিন।’

শিক্ষকদের দুর্ভোগ
আতিয়ারা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবদুল খালেক বলেন, ‘২১টি ইউনিয়নের বিদ্যালয় একজন সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তার পক্ষে তদারকি করা সম্ভব নয়। আগে অফিসে এসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হতো না। এখন অনেক সময় কাজ না করেই ফিরে যেতে হয়। ৩৮ বছরের শিক্ষকতা জীবনে এমন দুর্ভোগ দেখিনি।’

গোসাইপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোছা. তাসলিমা জাহান বলেন, ‘জনবলসংকটের কারণে প্রশাসনিক কাজ সময়মতো সম্পন্ন করা যাচ্ছে না। শিক্ষা কর্মকর্তারা মাঠপর্যায়ে থাকায় অনেক সময় ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়।’

শ্যামগ্রাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ডালিয়া সুলতানা বলেন, ‘সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা ও অফিসকর্মী—দুই ক্ষেত্রেই তীব্র সংকট রয়েছে। এতে বিদ্যালয়ের নিয়মিত কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।’

আশ্রাফপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আরজুদা বেগম বলেন, ‘২১টি ইউনিয়নের জন্য ১১ জন সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা প্রয়োজন। অথচ আছেন মাত্র একজন। এতে একাডেমিক ও প্রশাসনিক—দুই ধরনের কাজই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।’

প্রধান শিক্ষক নেই ১৫০ বিদ্যালয়ে
উপজেলা সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা মো. মানিক ভূঁইয়া বলেন, গত সাত মাস ধরে তিনি একাই দায়িত্ব পালন করছেন। উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা অসুস্থতাজনিত ছুটিতে রয়েছেন। অফিসের বেশির ভাগ পদ শূন্য থাকায় কাজ পরিচালনা করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

তিনি জানান, উপজেলার ২১৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ১৫০টিতে প্রধান শিক্ষক নেই। সহকারী শিক্ষকেরও প্রায় দেড় শতাধিক পদ শূন্য রয়েছে।

এলাকার প্রাথমিক শিক্ষার এই সংকট সম্প্রতি জাতীয় সংসদে তুলে ধরেন স্থানীয় সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট আবদুল মান্নান। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে জনবলসংকটের কারণে নবীনগরের প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।