জমি-জমা বিক্রি করে ২০১৯ সালে ভাগ্য বদলের আশায় ছেলে সুজনকে লিবিয়ায় পাঠিয়েছিলেন হাসিনা বেগম। তারপর আর দেশে আসেনি সে। তবে ভালো কাজ না পাওয়ায় দেশে টাকাও পাঠাতে পারতো না। এর মধ্যে গত রমজানে আগুনে বাড়ি-ঘর পুড়ে ছাই হয়ে যায়। টাকার অভাবে ভিটাই ওঠেনি নতুন ঘর। 'এখনও ধার দেনায় ডুবে রয়েছি। আমি আমার ছেলেকে ফিরে পেতে চাই, এভাবেই কথা গুলো বলছিলো লিবিয়ায় ঘূর্ণিঝড়ে নিহত সুজনের বিধবা মা হাসিনা বেগম।
গত রোববার ঘূর্ণিঝড়ে মারা যাওয়া লিবিয়া প্রবাসী সুজন ও শাহিনের বাড়ি রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলার যশাই ও হাবাসপুর ইউনিয়নে। বুধবার লিবিয়ার বাংলাদেশ দূতাবাসের ফেসবুক পেজে দেওয়া এক বিবৃতিতে রাজবাড়ীর দুজনসহ ৬ বাংলাদেশি নিহতের তথ্য জানানো হয়। এ ঘটনায় নিহত দুই পরিবারে চলছে শোকের মাতম।
নিহতরা হলো, পাংশা উপজেলার যশাই ইউনিয়নের ধোপাকেল্লা গ্রামের মৃত দুলাল খাঁনের ছেলে সুজন খান (২৩) ও একই উপজেলার হাবাসপুর ইউনিয়নের আরশেদ মন্ডলের ছেলে শাহিন রেজা (২৮)।
সরেজমিনে যশাই ইউনিয়নের ধোপাকেল্লা গ্রামে নিহত সুজন খানের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, পরিবার আত্মীয়-স্বজনের কান্নার আহজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে এলাকার আকাশ-বাতাশ। বাড়িতে ঢুকতেই দেখা যায় আগুনে পুড়ে যাওয়া টিন দিয়ে তৈরি ছোট একটি ছাপড়া ঘর। পাশেই রয়েছে পাট কাঠি দিয়ে তৈরি আরেকটি ছাপড়া ঘরের বাড়ান্দায় বসে কান্নাকাটি করছে সুজনের মা হাসিনা বেগম। পাশেই বসে মাকে শান্তনা দিচ্ছে সুজনের বড় ভাই জুবায়ের। আদরের সন্তানকে হারিয়ে পরিবার জুড়ে চলছে শোকের মাতম।
নিহত সুজনের বড় ভাই জুবায়ের খান বলেন, '২০১৯ সালে সুজনকে লিবিয়ায় পাঠানোর পর তিন বছর সে ঠিকমত কাজ করতে পারে নাই। এমনকি বাড়িতে টাকা দিতেও পারে নাই। মাঝে মধ্যে কিছু টাকা পাঠাতো সেটা দিয়েই চলতাম আমরা। এক বছর আগে লিবিয়া থেকে ইতালি যাওয়ার জন্য দালালের ক্ষপ্পরে পরে। তখন আমাদের ফোন দিয়ে বলে টাকা না পাঠালে ওরা আমাকে মেরে ফেলবে। পরে আমাদের জায়গা জমি যা ছিলো বিক্রি করে দিয়ে ২০-২৫ লক্ষ টাকা পাঠাই। এখন আমরাতো খুবই অভাবের মধ্যে আছি। এখনো অনেক টাকা দেনা আছি। ঝড়ে তো আমার ভাই চলেই গেলো'।
এদিকে একই উপজেলার হাবাসপুর ইউনিয়নের হাবাসপুর গ্রামে শাহিনের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, বাবা-মা ঘরের বারান্দায় বসে সন্তানের জন্য কাতরাচ্ছেন। স্ত্রী-বোন উঠানে বসে কান্নাকাটি করছে। প্রতিবেশিরা শাহিনের বাবা-মা, স্ত্রী-বোনকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য এলেও তারাও করুণ কাহিনী শুনে কান্নায় ভেঙে পড়ছেন। শাহিনের বাড়ি থেকে পাশেই রয়েছে লিবিয়া প্রাবাসী তরঙ্গ বিশ্বাসের বাড়ি। তরঙ্গ বিশ্বাসের মা রুপালি বেগম ছেলের খোঁজ পেতে কান্নায় মাঝে মধ্যে জ্ঞান হারিয়ে ফেলছে।
শাহিনের মা ফাতেমা বেগম বলেন, '৯ মাস আগে লিবিয়া যায় শাহীন। মাকে কথা দিয়েছিল পাঁচ বছর পর দেশে ফিরবে। তার আগেই ঘুর্ণিঝড়ে মারা গেলো ছেলে আমার। আমার বড় ছেলেও লিবিয়াতে থাকে। সে ফোন দিয়ে জানিয়েছে শাহিনের দাফন ওখানেই হয়েগেছে।
ফাতেমা বেগম আরও বলেন, 'ছেলেকে হারিয়ে আমরা এখন অসহায়। দেনা কোথা থেকে দিবো আমাদের জায়গা জমি নেই কিভাবে নাতি ছেলেদের মানুষ করবো। সরকার যদি একটু সাহায্য করতো এটাই আমার দাবি'।
নিখোঁজ তরঙ্গ বিশ্বাসের মা রুপালি বেগম বলেন, 'ঝড়ের আগের দিনও তরঙ্গেরসাথে কথা বলেছি। ঝড়ের পরদিন থেকে আর যোগাযোগ করতে পারি নাই। এসএসসি পরীক্ষায় ফেল করায় দেড়মাস আগে ওকে লিবিয়া পাঠাই। আমার ছেলের সন্ধান কেউ দেন না'।
পাংশা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ জাফর সাদিক বলেন, 'গণমাধ্যম কর্মীদের মাধ্যমে বিষয়টি শুনেছি। কিন্তু অফিসিয়ালি কোন তথ্য নেই। যে কারণে নিহত পরিবারকে সাহায্য সহযোগিতা করতে পারছি না'।