সাড়ে তিন কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং ৩০ লাখ টাকা সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগে মানিকগঞ্জের সিংগাইরের এক দম্পতির নামে পৃথক দুটি মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর সেগুনবাগিচায় দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয়ে (ঢাকা ১) মামলা দুটি দায়ের করেন দুদকের সহকারি পরিচালক আল-আমিন।
মামলার আসামিরা হলেন– সিংগাইর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. শহীদুর রহমান ওরফে ভিপি শহীদ ও তাঁর স্ত্রী জেলা আওয়ামী লীগের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক সম্পাদক নার্গিস আক্তার। শহিদুর রহমান ওরফে ভিপি শহীদ সম্পর্কে মানিকগঞ্জ-২ (সিঙ্গাইর-হরিরামপুর) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও কন্ঠশিল্পী মমতাজ বেগমের ভাগ্নে।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা গেছে, অবৈধ সম্পদ অর্জনের প্রাথমিক তথ্য প্রমাণ পাওয়ায় শহিদুর রহমানের বিরুদ্ধে সম্পদ বিবরণী দাখিলের নোটিশ দেওয়া হয়। ২০২১ সালের ১৯ জানুয়ারি তিনি কমিশনে তাঁর সম্পদ বিবরণী দাখিল করেন। সম্পদ বিবরণীতে তাঁর নামে ৩৭ লাখ ৪৩ হাজার ৬৫০ টাকার স্থাবর সম্পদ এবং এক কোটি ৪৭ লাখ ৯১ হাজার ৪০৫ টাকার অস্থাবর সম্পদসহ মোট এক কোটি ৮৫ লাখ ৩৫ হাজার ৫৫ টাকার সম্পদ অর্জনের তথ্যাদি প্রদর্শন করেন।
তবে সম্পদ বিবরণী যাচাই করে দেখা যায়, শহিদুর রহমানের নামে এক কোটি ৮৫ লাখ ৩৫ হাজার ৫৫ টাকার সম্পদ অর্জনের রেকর্ডপত্র পাওয়া যায়। তাঁর আয়কর নথি পর্যালোচনায় ২০১৯-২০২০- ও ২০২০-২০২১ করবর্ষে সম্পদ অর্জনকালীন তাঁর পারিবারিক ও অন্যান্য ব্যয় পাওয়া যায় ১৯ লাখ ৫৪ হাজার ৮১০ টাকা। ফলে তাঁর ব্যয়সহ অর্জিত সম্পদের পরিমাণ দাঁড়ায় দুই কোটি চালাক ৮৯ হাজার ৮৬৫ টাকা। দাখিলকৃত সম্পদ বিবরণীতে তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে যৌথ নামে ব্যাংক ঋণ (মোট ঋণের ৫০% বা অর্ধেক) পাওয়া যায় ১৮ লাখ ৬ হাজার ২২৭ টাকা। এক্ষেত্রে ব্যাঙ্ক ঋণ বাদে সম্পদের পরিমাণ দাঁড়ায় এক কোটি ৮৬ লাখ ৮৩ হাজার ৬৩৮ টাকা। তাঁর অর্জিত সম্পদের বিপরীতে গ্রহণযোগ্য আয় পাওয়া যায় এক কোটি ৩১ লাখ ১১ হাজার ২৬৮ টাকা। এক্ষেত্রে তাঁর আয় অপেক্ষা অতিরিক্ত সম্পদ পাওয়া যায় ৫৫ লাখ ৭২ হাজার ৩৬৯ টাকা। যা তাঁর জ্ঞাত আয়ের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ সম্পদ বলে প্রতীয়মান হয়। দুর্নীতি দমন কমিশন আইন ২০০৪ এর ২৭ (১) ধারায় মামলাটি করা হয়।
অন্যদিকে দ্বিতীয় মামলায় শহিদুর রহমানের স্ত্রী নার্গিস আক্তারের বিরুদ্ধে স্বামীর অবৈধভাবে অর্জিত সম্পদকে বৈধতা দানের অসৎ উদ্দেশ্যে নিজ নামে জ্ঞাত আয় বহির্ভূত দুই কোটি ৯২ লাখ ৫০ হাজার ৯২১ টাকার সম্পদ অর্জন ও দাখিলকৃত সম্পদ বিবরণীতে ৩০ লাখ ৭৮ হাজার ৭৬৪ টাকার সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগ আনা হয়েছে।
ওই মামলার এজাহারে বলা হয়, অবৈধ সম্পদ অর্জনের প্রাথমিক তথ্য প্রমাণ পাওয়ায় নার্গিস আক্তারের বিরুদ্ধে সম্পদ বিবরণী দাখিলের নোটিশ করা হয়। ২০২১ সালের ১৯ জানুয়ারি তিনি সম্পদ বিবরণী কমিশনে দাখিল করেন। সম্পদ বিবরণীতে তাঁর নামে দুই কোটি ৭৮ লাখ ৫৩৮ টাকার স্থাবর সম্পদ এবং ৬১ লাখ ৫৪ হাজার ৮৪০ টাকার অস্থাবর সম্পদসহ মোট তিন কোটি ৩৫ লাখ ৫৫ হাজার ৩৭৮ টাকা সম্পদ অর্জনের তথ্যাদি প্রদর্শন করেন। তবে দাখিলকৃত সম্পদ বিবরণী যাচাইকালীন নার্গিস আক্তারের নামে স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ বাবদ ৩ কোটি ৬৬ লাখ ৩২ হাজার ১৪২ টাকার সম্পদ অর্জনের তথ্যাদি পাওয়া যায়।
মানিকগঞ্জ জেলার সিঙ্গাইর থানাধীন সিঙ্গাইর মৌজা ১২ দশমিক ৫০ শতাংশ জমির ওপর নির্মিত বাড়ি নির্মাণ ব্যায়ের ক্ষেত্রে তিনি ৩০ লাখ ৭৮ হাজার ৭৬৪ টাকার সম্পদের তথ্যাদি গোপন করেছেন। তাঁর স্বামীর সঙ্গে যৌথ নামে ব্যাংক ঋণ বাদে সম্পদের পরিমাণ দাঁড়ায় তিন কোটি আসি লাখ ২৩ হাজার ৯৮৬ টাকা। তাঁর অর্জিত সম্পদের বিপরীতে গ্রহণযোগ্য আয় পাওয়া যায় ৮৭ লাখ ৭৩ হাজার ৬৫ টাকা। এক্ষেত্রে আয় অপেক্ষা অতিরিক্ত সম্পদ পাওয়া যায় দুই কোটি ৯২ লাখ ৫০ হাজার ৯২১ টাকা। যা তাঁর জ্ঞাত আয়ের সহিত অসংগতিপূর্ণ সম্পদ বলে প্রতীয়মান হয়। অভিযুক্ত নার্গিস আক্তার একজন গৃহিণী। তাঁর নিজের আয়ের কোনো উৎস নেই। তিনি স্বামীর আয়ের উপর নির্ভরশীল। আসামি নার্গিস আক্তারের নামে বৈধ উৎসবিহীন ওই টাকার সম্পদ তাঁর স্বামী শহিদুল রহমান অবৈধভাবে অর্জিত বলি অনুসন্ধানকালে প্রাথমিকভাবে প্রতিমান হয়। দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪-এর ২৭ (১) ধারা ২৬ (২) ধারা ও দন্ডবিধির ১০৯ ধারায় মামলাটি করা হয়েছে।
এ বিষয়ে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আব্দুস সালাম বলেন, ‘দুদকে মামলার বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। যেহেতু তাঁরা এখনো দোষী নয়, বিষয়টি আইনিভাবে মোকাবিলা করার সুযোগ রয়েছে। যদি তাঁরা দোষী প্রমাণিত হয় তাহলে তাঁদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
এ বিষয়ে সিংগাইর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. শহীদুর রহমান বলেন, ‘দুর্নীতি দমন কমিশন থেকে আমার সম্পদ নিয়ে যে তদন্ত করা হয়েছে তা সঠিক নয়। আমি বিষয়টি আইনিভাবে মোকাবিলা করব।’
শহীদুর রহমান আরও বলেন, ‘আমি কোনো দুর্নীতি করিনি, রাজনৈতিকভাবে আমাকে হেয় করতে আমার বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে।’
অপরদিকে এ বিষয়ে জানতে জেলা আওয়ামী লীগের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক সম্পাদক নার্গিস আক্তারের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করেও বন্ধ থাকায় তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।