লিবিয়ায় বন্দিশালায় দালালের নির্যাতনে মাদারীপুরের দুই যুবক নিহত হয়েছেন। এক সপ্তাহেরও বেশি সময় আগে তাঁদের মৃত্যু হলেও পরিবারের কাছে তা গোপন রাখা হয়েছিল বলে দাবি পরিবারের। নিহত দুই যুবকের লাশ দ্রুত দেশে আনার দাবি করেছেন তাঁরা।
নিহত দুই যুবক হলেন মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলার দক্ষিণ জনারদন্দি এলাকার কালাম হাওলাদারের ছেলে ইলিয়াস হাওলাদার (২৫) এবং ডাসার উপজেলার গোপালপুর ইউনিয়নের বিনতিলুক এলাকার প্রয়াত সেকেন হাওলাদারের ছেলে ফারুক হাওলাদার (৩৫)। নিহত দুজনের পরিবার রোববার তাঁদের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
নিহত ব্যক্তিদের পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, উন্নত জীবনের আশায় প্রায় তিন বছর আগে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ কাতারে গিয়েছিলেন ইলিয়াস। সেখান থেকে বাংলাদেশি এক দালালের প্রলোভনে পড়ে অবৈধ পথে ইতালি যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। পরে গত বছরের আগস্টের শুরুতে কাতার থেকে দালালের সহযোগিতায় লিবিয়ায় পৌঁছান ইলিয়াস। সেখানকার একটি বন্দিশালায় ইলিয়াসকে বন্দী রেখে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালিয়ে পরিবারের কাছ থেকে কয়েক দফায় ২০ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয় দালাল চক্রের সদস্যরা। ২৩ মার্চ ওই বন্দিশালায় দালালের নির্যাতনে গুরুতর অসুস্থ হয়ে মারা যান ইলিয়াস। মৃত্যুর চার দিন পরে গত বৃহস্পতিবার রাতে স্থানীয় এক দালালের মাধ্যমে ইলিয়াসের মৃত্যুর খবর পায় পরিবার। এরপর থেকে পরিবারের চলছে মাতম।
ইলিয়াসের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, বাড়ির বড় ছেলেকে হারিয়ে অনেকটা বাক্রুদ্ধ হয়ে পড়েছেন ইলিয়াসের বাবা কালাম হাওলাদার ও মা রানু বেগম। ইলিয়াসের দুই বছর বয়সী এক ছেলে আছে। বাবা যে আর কখনো ফিরবে না, সেটা বুঝতে পারছে না অবুঝ শিশুটি। ইলিয়াসের স্ত্রী বীথিও কাঁদছিলেন।
কালাম হাওলাদার বলেন, ‘আমার দুই ছেলে। দুজনই কাতারে থাকত। ওখানেই ভালো ছিল। বড় ছেলে ইলিয়াস আমাদের কাউকে কিছু না জানিয়ে নিজের সিদ্ধান্তে ইতালি যাওয়ার উদ্দেশে লিবিয়া যায়। লিবিয়াতে যাওয়ার পরে আমরা জানতে পারি। ছেলের মুখের দিকে চেয়ে আমি অনেক কষ্ট করে ২০ লাখ টাকা দালাল হাবিব মাস্টারের কাছে দিই। তবুও আমার ছেলেডা মরে গেল।’
তিনি বলেন, ‘ঘটনার পরে শুক্রবার ঢাকায় দালাল আমাদের নিয়ে বসেছে। তিনি আমার ছেলের লাশ দেশে ফিরিয়ে এনে দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন। একই সঙ্গে ক্ষতিপূরণও দেবে বলেছেন। তবে সেটা কবে দেবে, তা সঠিক ভাবে জানায় নাই।’
নিহত ইলিয়াসের স্ত্রী বীথি আক্তার বলেন, ‘আমার স্বামীকে ওরা নির্যাতন করে হত্যা করে ফেলল। এই হত্যার বিচার কী কোনদিনও পাব না? আমার দুই বছর বয়সী দুধের শিশুকে নিয়ে আমি কিভাবে বাঁচব, তার কোন দিশা খুঁজে পাচ্ছি না। সরকার যেন আমার স্বামীর লাশটা দেশে এনে দেয়। এটাই আমার চাওয়া।’
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, হাবিব মাস্টার ওরফে হাবিবুর রহমান খন্দকারের বাড়ি ডাসার উপজেলার দক্ষিণ গোপালপুর এলাকায়। তিনি একটি মাদ্রাসার সাবেক শিক্ষক। বাংলাদেশে থেকে লিবিয়ার মানব পাচার চক্রের অন্যতম সদস্য হিসেবে কাজ করে আসছেন। দীর্ঘদিন ধরে এই পেশায় জড়িত থাকলেও পুলিশের ধরাছোঁয়ার বাইরে আছেন। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, কালকিনি ও ডাসার উপজেলা থেকে অন্তত তিন শতাধিক যুবককে লিবিয়া হয়ে ইতালিতে পাঠিয়েছেন হাবিব। এখনো লিবিয়ার বন্দিশালায় তাঁর খপ্পরে পড়া অন্তত শতাধিক অভিবাসনপ্রত্যাশী আছেন।
এ বিষয়ে বক্তব্যের জন্য অভিযুক্ত হাবিবুর রহমান খন্দকারের বাড়িতে গেলে তাঁকে বাড়িতে পাওয়া যায়নি। তাঁর পরিবারের কোনো সদস্য এই বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি।
অন্যদিকে ডাসার উপজেলার বিনতিলুক এলাকার ফারুক হাওলাদার লিবিয়ার বন্দিশালায় দালালের নির্যাতনে মারা গেছেন ১৮ মার্চ। পরিবার ফারুকের মৃত্যুর খবর পেয়েছে ২৫ মার্চ।
নিহত ফারুকের পরিবার সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশে ফারুক রাজমিস্ত্রির কাজ করতেন। তিনি উন্নত জীবনের আশায় চার মাস আগে স্থানীয় দালাল হাবিবুর রহমানের মাধ্যমে সৌদি আরব হয়ে লিবিয়ায় পৌঁছান। পরে তাঁকে একটি বন্দিশালায় আটক রেখে তাঁর পরিবারের কাছ থেকে ১২ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়। তাঁকে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালিতে নেওয়ার কথা থাকলেও নির্যাতন করে মেরে ফেলা হয়েছে দাবি পরিবারের।
রোবিবার বিকেলে ফারুকের বাড়ি বিনতিলুক এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, একটি ভাঙাচোরা টিনশেড ঘরে ফারুকের পরিবার থাকে। মা মালেকা বেগম, স্ত্রী লাবণী আক্তার ছাড়াও ফারুকের একটি ছেলে ও একটি মেয়ে আছে। ফারুকের এমন মৃত্যুতে তাঁর পরিবারসহ প্রতিবেশিরাও শোকাহত।
ফারুকের মা মালেকা বেগম বলেন, ‘গেম ঘরে (বন্দিশালা) কী থেকে কী হইছে জানি না। আমার ছেলেডা আর বাঁইচা নাই। ওরে ছাড়া ক্যামনে বাঁচমু? ওর ছোট্ট দুই ছেলেমেয়ে, ওরাও অবুঝ। ওগের কী হবে? কে দ্যাখব? আমরা গরীব মানুষ।’
ফারুকের স্ত্রী লাবনী আক্তার বলেন, ‘আমার স্বামীকে নির্যাতন করে লিবিয়ার গেম ঘরে হত্যা করা হয়েছে। আমি আমার স্বামীর লাশটাকে দেখতে চাই। তাকে এই দেশের মাটিতে রাখতে চাই। সরকার আমার স্বামীর লাশটা যেন দেশে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করে। এটাই আমার একমাত্রা দাবি এখন।’
এ বিষয়ে মাদারীপুরের পুলিশ সুপার মো. হাবিবুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, লিবিয়ার বন্দিশালায় দুই যুবকের মৃত্যুর ঘটনায় থানায় এখনো কোনো মামলা হয়নি। তবে নিহত ব্যক্তিদের পরিবার থানায় অভিযোগ দিলে মামলা নেওয়া হবে। এ ছাড়া দালালদের ধরতে পুলিশের অভিযান অব্যাহত আছে বলেও তিনি জানান।