স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় পরিচালিত চার বছর মেয়াদি ডেন্টাল ডিপ্লোমাধারী প্রায় ২০ হাজার প্রশিক্ষিত জনগোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের (বিএমডিসি) নিবন্ধন থেকে বঞ্চিত বলে অভিযোগ ওঠেছে। বাংলাদেশ ডেন্টাল পরিষদের নেতারা অভিযোগ করেছেন, সরকার অনুমোদিত স্বাস্থ্য শিক্ষা, ক্লিনিক্যাল প্রশিক্ষণ এবং বাংলাদেশ রাষ্ট্রীয় চিকিৎসা অনুষদের সনদ থাকা সত্ত্বেও তারা এখনও পেশাগত স্বীকৃতি পাচ্ছেন না।
রোববার জাতীয় প্রেসক্লাবে মাওলানা আকরাম খাঁ হলরুমে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ ডেন্টাল পরিষদের নেতারা এ অভিযোগ তুলে ধরেন বলে সংগঠনটির মহাসচিব লায়ন মুহাম্মদ কামাল হোসেন স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা বলেন, এটি শুধু একটি পেশাজীবী গোষ্ঠীর অধিকার বঞ্চনার বিষয় নয়; বরং রাষ্ট্রের অর্থায়নে গড়ে ওঠা দক্ষ মানবসম্পদের যথাযথ ব্যবহার, নিরাপদ দন্তসেবা নিশ্চিতকরণ এবং জনস্বার্থের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
নেতারা জানান, স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের অধীন পরিচালিত ২৩টি সরকারি ইনস্টিটিউট অব হেলথ টেকনোলজি (আইএইচটি) এবং পঞ্চাশোর্ধ বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে চার বছর মেয়াদি ডিপ্লোমা ইন মেডিকেল টেকনোলজি (ডেন্টাল) কোর্স সম্পন্নকারীদের সনদ প্রদান করে বাংলাদেশ রাষ্ট্রীয় চিকিৎসা অনুষদ। প্রতি বছর আরও সহস্রাধিক শিক্ষার্থী এই পেশায় যুক্ত হলেও বিএমডিসি থেকে পেশাগত নিবন্ধনের অভাবে তাদের পেশাগত কার্যক্রম পরিচালনায় বিভিন্ন প্রশাসনিক জটিলতা ও হয়রানির স্বীকার হতে হচ্ছে।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল আইন, ২০১০ অনুযায়ী সমপর্যায়ের স্বাস্থ্য পেশাজীবী মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্টরা বিএমডিসি হতে পেশাগত নিবন্ধন ও সীমিত পরিসরে প্র্যাকটিসের সুযোগ ভোগ করছেন। এছাড়া, ১৯৮০ সালের বিএমডিসি আইনের ১৫(৩) ধারার অধীন প্রাতিষ্ঠানিক একাডেমিক যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও শুধুমাত্র জীবিকা নির্বাহের তাগিদে একটি জনগোষ্ঠীকে নিবন্ধন প্রদান করা হয়েছিল, যা এখনো নবায়ন করা হচ্ছে। অথচ সরকার অনুমোদিত চার বছর মেয়াদি স্বাস্থ্য শিক্ষা ও ক্লিনিক্যাল প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ডেন্টাল ডিপ্লোমাধারীরা আজও পেশাগত নিবন্ধন থেকে বঞ্চিত।
সংগঠনের নেতারা আরও বলেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ইতোমধ্যে তাদের Scope of Practice নির্ধারণ করেছে এবং সীমিত প্রাইভেট প্র্যাকটিসের সুপারিশ করেছে। পাশাপাশি আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ও মতামত দিয়েছে যে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে এ সুযোগ প্রদানে কোনো আইনি বাধা নেই। ফলে বিষয়টি এখন আর আইনি নয়; বরং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের বিষয়।
এসময় সংগঠনের মহাসচিব আরও দাবি করেন, ১৯৮৩ সালের ১ জুন বিএমডিসির সর্বোচ্চ নীতি-নির্ধারণী ফোরাম কার্যনির্বাহী কমিটি ডেন্টাল ডিপ্লোমাধারীদের পেশাগত নিবন্ধনের বিষয়ে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেও চার দশকেরও বেশি সময় ধরে সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হয়নি।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, দেশের গ্রামীণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ এখনো নিরাপদ ও মানসম্মত প্রাথমিক দন্তসেবা থেকে বঞ্চিত। এই সুযোগে অনেক ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণ ও ডিগ্রিবিহীন ব্যক্তিরা দন্তসেবা প্রদান করছেন, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। অন্যদিকে, সরকার অনুমোদিত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ৪ বছর মেয়াদী ডেন্টাল ডিপ্লোমাধারীদের আইনি স্বীকৃতির অভাবে জনগণের সেবায় তাদের দক্ষতা পূর্ণাঙ্গভাবে কাজে লাগাতে পারছেন না।
সংগঠনের পক্ষ থেকে দাবি করা হয় —বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল আইন, ২০১০-এর ধারা ১৫ ও পঞ্চম তফসিলে ৪ বছর মেয়াদী ডেন্টাল ডিপ্লোমা ডিগ্রিকে অন্তর্ভুক্ত করে বিএমডিসি আইন-২০১০ এর ৩৫ ধারা মোতাবেক গেজেট বিজ্ঞপ্তি জারি এবং বিএমডিসি হতে পেশাগত নিবন্ধন কার্যকর করা, যাতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কর্তৃক নির্ধারিত কাজের পরিধি অনুযায়ী সীমিত পরিসরে প্রাইভেট প্র্যাকটিসের সুযোগ নিশ্চিত হয়।
সংবাদ সম্মেলন থেকে তিন দফা শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। কর্মসূচিগুলো হলো— আগামী ৭ জুলাই জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর বরাবর স্মারকলিপি প্রদান, ১১ জুলাই জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন ও ১৫ জুলাই কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে জাতীয় মহাসমাবেশ পরবর্তী প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে শান্তিপূর্ণ পদযাত্রা।
সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ ডেন্টাল পরিষদের নেতারা সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, রাষ্ট্রের নিজস্ব অনুমোদিত শিক্ষা ব্যবস্থায় গড়ে ওঠা দক্ষ জনশক্তির ন্যায্য পেশাগত স্বীকৃতি নিশ্চিত করে দীর্ঘদিনের এই প্রশাসনিক জটিলতার দ্রুত, ন্যায়সঙ্গত ও স্থায়ী সমাধান করা হোক।