রাজধানীর আব্দুল্লাহপুর-টঙ্গী সড়কে গভীর রাতে মোটরসাইকেলে এক তরুণীকে নিথর অবস্থায় নিয়ে যাওয়ার ঘটনা নিয়ে তৈরি হওয়া রহস্যের অবসান হয়েছে বলে জানিয়েছে গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ। পুলিশের দাবি, ওই তরুণী জীবিত ও সুস্থ আছেন। পারিবারিক চাপের কারণে বাসা থেকে বের হয়ে একটি বারে মদ পান করে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন তিনি। পরে তার চাচা তাকে সেখান থেকে নিয়ে যান।
শনিবার দুপুরে গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের উপকমিশনার (অপরাধ, দক্ষিণ বিভাগ) এসএম শফিকুল ইসলাম এসব তথ্য জানান।
তিনি বলেন, মোটরসাইকেলে থাকা তরুণীর পরিচয় শনাক্ত করা হয়েছে। তাকে টঙ্গী পশ্চিম থানায় ডাকা হলে শনিবার দুপুরে তিনি থানায় এসে ওই দিনের ঘটনার বিস্তারিত জানান।
পুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, তরুণীসহ মোটরসাইকেলে থাকা দুজন রাজধানীর উত্তরার জসীমউদ্দীন এলাকা থেকে যাত্রা শুরু করেন। তাদের গন্তব্য ছিল টঙ্গী। তবে তারা টঙ্গীতে না গিয়ে মিরপুরে এক বান্ধবীর বাসায় অবস্থান করেন। ঘটনার পর বিভিন্ন স্থানে অনুসন্ধান চালিয়ে পুলিশ তাদের শনাক্ত করতে সক্ষম হয়।
এসএম শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘মেয়েটির সঙ্গে কথা বলতে পেরেছি। তাকে বলা হয়েছে, সে সুস্থ আছে এবং কোনো ধরনের সমস্যার মধ্যে নেই—এ বিষয়টি আমাদের নিশ্চিত করে যেতে। পরে সে থানায় এসে আমাদের নিশ্চিত করেছে যে সে সুস্থ আছে। সেদিনের ঘটনা একান্তই ব্যক্তিগত ও পারিবারিক সমস্যার কারণে ঘটেছিল। আমরা তার বক্তব্য নিয়েছি। টঙ্গী এলাকায় তার বোন থাকেন। পরে তার বোনের জিম্মায় তাকে দেওয়া হয়েছে।’
পুলিশ জানায়, অনুসন্ধানের একপর্যায়ে মোটরসাইকেলটির নম্বর প্লেটের তথ্য পাওয়া যায়। সেই সূত্র ধরে তরুণীর সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়। পুলিশের ভাষ্য, ওই তরুণী একটি বারে গিয়ে মদ পান করে মাতাল হয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। এ ঘটনায় অন্য কোনো বিষয় রয়েছে কি না, তা নিয়ে পুলিশ অনুসন্ধান করেছে।
টঙ্গী পশ্চিম থানায় পুলিশের কাছে ঘটনার ব্যাখ্যা দেন ওই তরুণী। তিনি জানান, পারিবারিক চাপের কারণে বাসা থেকে বের হয়ে জসীমউদ্দীনের একটি বারে যান। সেখানে নিজেই মদ পান করেন। পরে অসুস্থ হয়ে পড়লে চাচাকে ফোন দেন। তার চাচা এসে তাকে সেখান থেকে নিয়ে যান।
তরুণী বলেন, ‘পারিবারিক চাপ নিতে না পেরে আমি বাসা থেকে বের হয়ে যাই। পরে জসীমউদ্দীনের একটি মদের বারে যাই। সেখানে মদ পান করে মাতাল হয়ে যাই। আমাকে কেউ জোর করে মদ খাওয়ায়নি, আমি নিজেই মদ খেয়েছি। পরে আমি অসুস্থ হয়ে যাই। আমার চাচাকে ফোন দিলে তিনি এসে আমাকে নিয়ে যান। গাড়িতে ওঠা পর্যন্ত আমার জ্ঞান ছিল। এরপর আর আমার জ্ঞান ছিল না।’
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার বিষয়ে ওই তরুণী বলেন, ‘আমার সাবেক স্বামী আমার মারা যাওয়ার তথ্য ছড়িয়েছে। এ জন্যই আমি থানায় এসেছি আপনাদের বলতে—আমি মরিনি।’
পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদ শেষে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘ঘটনার জন্য আমি দায়ী। আমি বারে মদপান করতে গিয়েছিলাম।’
এর আগে বুধবার দিবাগত রাত ৩টা ১৫ থেকে ৩টা ২০ মিনিটের দিকে আব্দুল্লাহপুর-টঙ্গী সড়কে মোটরসাইকেলটির তিন আরোহীকে দেখা যায়। ওমরাহ সফর শেষে বিমানবন্দর থেকে বগুড়ায় ফেরার পথে মুফতি মনোয়ার হোসেন নামে এক ব্যক্তি আব্দুল্লাহপুর থেকে টঙ্গী পর্যন্ত মোটরসাইকেলটিকে অনুসরণ করেন।
তার দাবি, মোটরসাইকেলটির চালকের পেছনে বসা এক যুবক এক তরুণীকে জাপটে ধরে রেখেছিলেন। তরুণীর দুই পা খালি ছিল এবং অস্বাভাবিকভাবে ঝুলছিল। দৃশ্যটি দেখে তার সন্দেহ হয়, তরুণীটি মৃত নাকি অচেতন।
সন্দেহজনক ওই দৃশ্য দেখে মুফতি মনোয়ার হোসেন জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ কল করার চেষ্টা করেও সংযোগ পাননি বলে জানান। পরে তিনি মোটরসাইকেলটির নম্বর প্লেটসহ একটি স্থিরচিত্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেন। এরপর ছবিটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং ঘটনাটি নিয়ে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়।
পরে গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে মোটরসাইকেলটির আরোহীদের শনাক্তের চেষ্টা শুরু করে। মোটরসাইকেলের নিবন্ধনসংক্রান্ত অসংগতি ও সংশ্লিষ্ট মোবাইল নম্বর বন্ধ থাকায় শুরুতে তাদের শনাক্ত করতে পুলিশকে বেগ পেতে হয়। পরে বিভিন্ন তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে তাদের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়।