বাবার মরদেহ বাড়িতে রেখে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন যশোরের বেনাপোলের আফিয়া মাসুমা। এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় এ গ্রেড অর্থাৎ জিপিএ–৪ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছেন তিনি। তার এ সাফল্যে পরিবার, শিক্ষক ও সহপাঠীদের মধ্যে আনন্দের পাশাপাশি আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে।
শনিবার প্রকাশিত ফলাফলে দেখা যায়, যশোরের শার্শা উপজেলার কলেজের বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে এ গ্রেড পেয়েছেন আফিয়া মাসুমা। তিনি বেনাপোল পোর্ট থানার নামাজ গ্রামের প্রয়াত আব্দুস সামাদের ছোট মেয়ে।
শিক্ষার্থী মাসুমা বলেন, ‘আমি আরও ভালো ফল করতে পারতাম। পরীক্ষার খাতায় লিখতে গিয়ে বারবার মৃত বাবার মুখটা ভেসে উঠছিল। বাবা বেঁচে থাকলে আমার এই ফল দেখে খুব খুশি হতেন।’
মাসুমার বাবা আব্দুস সামাদ বেনাপোলের মেসার্স তাজমহল ট্রান্সপোর্ট ও হাজী মুছা করিম অ্যান্ড সন্সের স্বত্বাধিকারী ছিলেন। তিনি একজন বিশিষ্ট আমদানিকারকও ছিলেন।
পরিবার ও কলেজ সূত্রে জানা যায়, গত ২৮ জুলাই সন্ধ্যায় বাড়িতে অসুস্থ হয়ে পড়েন আব্দুস সামাদ। পরে হাসপাতালে নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়। চিকিৎসকদের ধারণা অনুযায়ী, তিনি স্ট্রোকজনিত কারণে অসুস্থ হয়েছিলেন। মৃত্যুর পর ওই রাতেই তার মরদেহ বাড়িতে নিয়ে আসা হয়।
পরদিন সকালে বাবার মরদেহ বাড়িতে রেখেই এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিতে যান মাসুমা। তার পরীক্ষাকেন্দ্র ছিল বেনাপোল কলেজে। পরীক্ষা শেষে বাড়িতে ফিরে বাবার দাফনে অংশ নেন মাসুমা।
বাবার মৃত্যুর শোকের মধ্যেও পরিবারের সদস্যদের অনুরোধে পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন মাসুমা। তাকে শেষবার দেখার সুযোগ দিতে মরদেহ দাফনের সময়ও পিছিয়ে দেওয়া হয়। এরপর বাবাকে হারানোর শোক নিয়েই বাকি পরীক্ষাগুলো শেষ করেন তিনি।
ফল প্রকাশের পর মাসুমা বলেন, ‘বাবা সব সময় চাইতেন আমি ভালো ফল করি। পরীক্ষার সময় বাবাকে হারানো আমার জীবনের সবচেয়ে কঠিন মুহূর্ত ছিল। কিন্তু বাবার স্বপ্ন পূরণের কথা ভেবেই নিজেকে সামলে পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলাম।’
সবার কাছে মৃত বাবার রুহের মাগফেরাতের জন্য দোয়া চেয়েছেন মাসুমা। পাশাপাশি উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে ভবিষ্যতে আরও ভালো ফলের মাধ্যমে পরিবারের মুখ উজ্জ্বল করতে সবার দোয়া কামনা করেছেন তিনি।
শার্শা উপজেলা কলেজের অধ্যক্ষ মো. হাসানউজ্জামান বলেন, ‘মাসুমা শুরু থেকেই মেধাবী ও পরিশ্রমী শিক্ষার্থী। শিক্ষকরা তার ভালো ফলের প্রত্যাশা করেছিলেন। বাবার মৃত্যুর মতো কঠিন শোকের মধ্যেও পরীক্ষায় অংশ নিয়ে এ গ্রেড অর্জন করায় তার মানসিক দৃঢ়তার পরিচয় পাওয়া গেছে।’
অধ্যক্ষ জানান, মাসুমার এ ফলে তারা খুশি। বাবার মৃত্যু না হলে সে জিপিএ-৫ পেতে পারত বলে শিক্ষকদের প্রত্যাশা ছিল। ভবিষ্যতেও মাসুমা সাফল্যের ধারাবাহিকতা বজায় রাখবে বলে তারা আশা করেন।
শার্শা উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘বাবাকে হারানো যে কারও জন্যই অত্যন্ত কষ্টের। সেই শোকের মধ্যেও মাসুমার পরীক্ষায় অংশ নিয়ে ভালো ফল করা আনন্দের সংবাদ। উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে তার পরিবারের সহযোগিতার প্রয়োজন হলে উপজেলা প্রশাসন সর্বোচ্চ সহায়তা করার চেষ্টা করবে।’