বাগেরহাটের কচুয়ায় একই পরিবারের দুই নারীসহ তিনজন খুনের এক সপ্তাহ পার হলেও খুনের কারণ উদঘাটন করতে পারেনি পুলিশ। ফলে চাঞ্চল্যকর এই তিন খুনের সাথে জড়িতরা ধরা ছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছে। হত্যার রহস্য উদঘাটন করতে পুলিশ অনুসন্ধান চালিয়ে যাচ্ছে বলে দাবি করেছে।
অন্যদিকে নিহতের পরিবারও হত্যাকাণ্ডের সঠিক কোনো কারণ বলতে পারেনি। এদিকে তিনটি তাজা প্রাণ হারিয়ে বেঁচে যাওয়া পরিবারের বড় ছেলে ফয়সাল বাকরুদ্ধ। তিনি প্রশ্ন রেখেছেন পাড়া প্রতিবেশিদের কারও সাথে বিরোধ নেই, তাহলে কেন এমন হলো তাঁর পরিবারের সাথে। মার স্বপ্ন ছিল নতুন বসতঘর হবে, কিন্তু সেই স্বপ্ন অপূর্ণ থেকে গেল। তাই হত্যাকারী যেই হোক তার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি ফয়সালের।
নিহতের ছেলে ফয়সাল হাওলাদার এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘আমি কল্পনা করতে পারিনি, মা ভাই নানি এভাবে হত্যাকাণ্ডের শিকার হতে পারে। আমি বেদনাহতো। আমি সবশেষ গত রোববার রাত ৭টার দিকে মাকে (মনিরা বেগম) ফোন দেই, সেদিন মার সাথে শেষ কথা হয়। মার শরীরের খোঁজ খবর নেই। তিনি বললেন–মোটামুটি ভালোই আছি, তোরা চলে গেছিস, তোর নানি অসুস্থ, নানিকে নিয়ে চলতে কষ্ট হচ্ছে। তোর ভাইতো (নিহত আহাদ হাওলাদার) একদিন বাড়ি আসে তো, একদিন আসে না। সঙ্গে সঙ্গে আমি আমার ভাইকে ফোন দিয়ে বলি তুমি বাড়িতে যাওনা কেন? ভাই বলে–ঠিক আছে, আমি বাড়িতে যাবো। মা ও ছোট ভাইয়ের সাথে এই ছিল আমার শেষ কথা বলা।’
তিনি বলেন, ‘পরদিন সোমবার পাশের বাড়ির এক ভাবি আমাকে ফোনে বলতেছে তোমাদের ঘরের ফ্যান চলতেছে মাকে ডাকলাম কোনো সাড়াশব্দ পাইনি। মা কোথায় আছে একটু ফোন করে দেখো তো। আমি ফোন দিছি ফোন বন্ধ পাচ্ছি। তার সাথে কথা শেষ করেই মা ও ভাইয়ের ফোনে ফোন করে কাউকেই পাইনি। মার ফোনে কিছু সমস্যা আছে আবার অনেক সময় বিদ্যুতের লোডশেডিং থাকে এ কারণে হয়তো ফোন বন্ধ রয়েছে বলে ধারণা করি। মঙ্গলবার আমার এক চাচাতো ভাই ফোন করে বলতেছে আমার নানি মারা গেছেন। এই খবর শুনে আমি রওনা দিই।’
ফয়সাল বলেন, ‘আমাদের এমন কোনো শত্রু নেই যে এভাবে আক্রমণ করবে। এই হত্যা কে বা কারা করছে সুনির্দিষ্টভাবে বলতে পারছি না। আমাদের বসত ঘরের বাইরে থেকে শিকল দেওয়া ছিল, ঘরে মানুষ আছে কি নাই তা বাইরে থেকে বোঝা যায় না। ঘরের শিকল রশি দিয়ে বাঁধা ছিল। সাধারণত মানুষ বুঝবে ঘরে কেউ নেই। হত্যাকারীরা দরজা শিকলে রশি বেঁধে পিছন থেকে পালিয়ে যেয়ে থাকতে পারে বলে ধারনা করছি।’
ফয়সাল আরও বলেন, ‘আমি চাকরি করে যে টাকা-পয়সা আয় করছি, তা আমার মায়ের হাতে দিছি। আর ছোট ভাই ইলেকট্রিশিয়ান। সে কাজ করে যে টাকা পয়সা আয় করছে তাও মাকে দিতো। মার স্বপ্ন ছিল একটি বাড়ি করবে, বাড়ির অর্ধেক কাজ শেষ হয়েছে, ছাদ করার পরিকল্পনা ছিল, হাতে যে টাকা ছিল তা গচ্ছিত থাক এখনতো বর্ষা চলছে ১/২ মাস পরে খরা শুকনো আসলে বাকি কাজ শেষ করব। পৈতৃক সম্পত্তি যা আছে তা এখনো ভাগবাটোয়ারা হয়নি। আমার বাবা চাচারা মোট আট ভাই। একেকজন একেক অংশ ভোগদখল করে। ঘরের আলমারি ভাঙা পেয়েছি, তাতে স্বর্ণালংকার, জিনিসপত্র ছিল তা উধাও। আমি হত্যাকারী শাস্তি চাই। এমন শাস্তি হোক যেন আগামীতে এই ধরনের অপরাধ কেউ না করে।’
গত ৪ আগস্ট পুলিশ বাগেরহাটের কচুয়া উপজেলার রাঢ়িপাড়া ইউনিয়নের চান্দেরখোলা গ্রামের মৃত আবদার আলী হাওলাদারের বাড়ি থেকে এই তিনজনের মরদেহ উদ্ধার করে। ঘটনার পরদিন ৫ আগস্ট নিহতের ছেলে ফয়সাল হাওলাদার বাদী হয়ে কচুয়া থানায় অজ্ঞাতনামা আসামি করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।
নিহতরা হলেন, কচুয়া উপজেলার রাঢ়িপাড়া ইউনিয়নের চান্দেরখোলা গ্রামের মৃত আবদার আলী হাওলাদারের স্ত্রী মনিরা বেগম মনি (৬০), ছেলে আহাদ আলী হাওলাদার (২৫) এবং শাশুড়ি রাশিদা বেগম (৯৩)। এরমধ্যে বৃদ্ধা রাশিদা বেগম কয়েকদিন আগে তার মেয়ে মনিরার বাড়িতে বেড়াতে এসেছিলেন। আহাদ আলী পেশায় ছিলেন ইলেকট্রিক মিস্ত্রি। মৃত আবদার আলী হাওলাদারের তিন ছেলে মেয়ে। দুই ছেলে ও এক মেয়ে। ছেলে জাহাজে চাকরি করে। আর মেয়ের বিয়ে হয়ে যাওয়ায় সে ঢাকাতে বসবাস করে।
কচুয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহামুদ হাসান বুধবার দুপুরে এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘একই পরিবারের তিনজন খুনের ঘটনার এক সপ্তাহ পার হলেও জড়িত কাউকে এখনো গ্রেপ্তার ও হত্যার কারণ নিশ্চিত হতে পারিনি। এই ট্রিপল মার্ডারটি গুরুত্বের সাথে তদন্ত করছে। সম্ভাব্য দুই তিনটি কারণ সামনে রেখে (জমিসংক্রান্ত বিরোধ, পারিবারিক কলহ ও ব্যক্তি বিরোধ) পুলিশের একাধিক দল তদন্ত কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। এই হত্যাকাণ্ডটির কোনো কিনারা করতে পারিনি। সময় লাগছে। খুব শিগগির পুলিশ এই হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ উদঘাটন করতে পারবে।’