২০০৯ সালে মারা যান বাবা। চার ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে সংসার চালিয়ে আসছেন মা। জমি বিক্রি করে সন্তানদের পড়ালেখা করাচ্ছেন তিনি। জমজ তিন ভাইয়ের মধ্যে এক ভাই ২০২৩ সালে মেডিকেলে চান্স পেয়েছেন। এ বছর জমজ অপর দুই ভাইয়ের সুযোগ হলো মেডিকেলে পড়াশোনা করার।
বলছি মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া বগুড়ার ধুনট উপজেলার বথুয়াবাড়ী গ্রামের তিন জমজ ভাইয়ের কথা। তিন ভাইয়ের মধ্যে একজন মো. মাফিউল হাসান। গত বছর ঢাকার সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজে চান্স পান তিনি। গত রোববার ব্যাচেলর অব মেডিসিন, ব্যাচেলর অব সার্জারি (এমবিবিএস) ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের ভর্তি পরীক্ষার প্রকাশিত ফলাফলে মাফিউলের অপর দুই ভাই মো. সাফিউল হাসান ও মো. রাফিউল হাসানের নাম এসেছে। ফলাফলে সাফিউল হাসান দিনাজপুর মেডিকেলে এবং মো. রাফিউল হাসান নোয়াখালী মেডিকেল কলেজে চান্স পেয়েছেন।
তিন জনই বগুড়ায় মেসে থেকে সরকারি শাহ সুলতান কলেজ থেকে ২০২২ সালে উচ্চ মাধ্যমিকে ‘এ প্লাস’ পেয়ে পাস করেন। এসএসসিতে তিন জনই পেয়েছেন গোল্ডেন ‘এ প্লাস’।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, তারা তিন ভাই জমজ। ধুনট নবির উদ্দিন পাইলট উচ্চবিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক ও পরে বগুড়া সরকারি কলেজ শাহ সুলতান থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় পাস করেন তাঁরা। মা আর্জিনা বেগমসহ তাঁদের ছয় সদস্যের পরিবার। বাবা গোলাম মোস্তফা স্কুলশিক্ষক ছিলেন। ২০০৯ সালে তিনি মারা যান। তাঁরা চার ভাই ও এক বোন। বড় ভাই তেমন কিছু না করলেও বোন মৌসুমী আক্তার কাহালু কলেজে অনার্স তৃতীয় বর্ষে পড়াশুনা করছেন।
এ বিষয়ে কথা হয় তাদের মা আর্জিনা বেগমের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘২০০৯ সালে ওদের বাবা হার্ট অ্যাটাকে মারা যান। তিন ভাইয়ের বয়স তখন পাঁচ বছর। মা হয়েই চেষ্টা করেছি বাবার স্নেহ মমতা দিয়ে শিক্ষা-দীক্ষা দেওয়ার। তিন সন্তানকে পড়ালেখা করাতে গিয়ে নানা সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছে। নিকট আত্মীয়দের কাছে থেকে তেমন কোনো সাহায্য সহযোগিতা পাইনি।’
আর্জিনা বেগম আরও বলেন, ‘নিজে কষ্ট করে জমি বিক্রি করে সন্তানদের পড়ালেখা করিয়েছি। প্রায় পাঁচ বিঘা জমি বিক্রি করে ওদের মানুষ করার চেষ্টা করেছি। তাদের মানুষ করতে, বাকি যতটুকু জমি আছে, প্রয়োজনে তাও বিক্রি করে ওদের চিকিৎসক বানাব।’
সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজে চান্স পাওয়া মাফিউল হাসান বলেন, ‘মা কষ্ট করে এবং জমি বিক্রি করে পড়ালেখার খরচ জোগান দিয়েছেন। কখনোই আমাদের কষ্ট দেননি। গ্রামের মধ্যে আমরাই প্রথম মেডিকেলে চান্স পেয়েছি। এ জন্য গ্রামের মানুষের ভালোবাসা পাচ্ছি।’
দিনাজপুর মেডিকেলে চান্স পাওয়া শাফিউল হাসান বলেন, ‘বাবার অভাববোধ মা কখনো বুঝতেই দেননি। তবে তিনি বেঁচে থাকলে খুশি হতেন। মানুষের সেবায় নিজেদের নিয়োজিত করার জন্য সবার দোয়া চাই।’
প্রতিবেশীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তিন ভাই ছোট বেলা থেকে সব কিছু এক সঙ্গে করত। এখন তারা মেডিকেলে চান্সও পেয়েছেন একসঙ্গে। গ্রাম থেকে তাঁরাই প্রথম চিকিৎসক হতে যাচ্ছেন, এ জন্য খুশি সবাই।
ধুনট সরকারি নইম উদ্দিন পাইলট মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক তফিজ উদ্দিন বলেন, ‘আমাদের বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা মেডিকেলে চান্স পেয়েছে। এতে আমরা শিক্ষকেরা খুশি। এটা স্কুলের জন্য গৌরবের বিষয়।’