মাইলস্টোনে বিমান বিধ্বস্ত

আহত হয়েও ২০ শিক্ষার্থীকে উদ্ধারে ছুটে যান শিক্ষিকা মেহেরীন

ক্লাস নেওয়া শেষে শিক্ষার্থীদের সাথে করে বের হচ্ছিলেন মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষিকা মেহেরীন চৌধুরী। ঠিক তখনই আছড়ে পড়ে প্রশিক্ষণের কাজে ব্যবহৃত বিমানবাহিনীর যুদ্ধবিমানটি। এ ঘটনায় প্রথমে সামান্য আঘাত পান তিনি। যখন জানতে পারেন ভবনের ভেতরে ২০ থেকে ২৫ শিক্ষার্থী আটকে পড়েছে, নিজের চিকিৎসার কথা না ভেবে দ্রুত ছুটে যান সেখানে। উদ্ধার করে জীবন বাঁচান ২০ শিক্ষার্থীর। বিষয়টি মোবাইলফোনে স্বামীকে জানান এই শিক্ষিকা।

এরপরের ঘটনা অনেকে ইতোমধ্যে জানে। ২০ শিক্ষার্থীকে উদ্ধার করতে গিয়ে মারাত্মকভাবে দগ্ধ হন মেহেরীন চৌধুরী। হাসপাতালে চিকিৎসা চলাকালে মৃত্যু হয় অকুতোভয় এই শিক্ষিকার। মঙ্গলবার বিকেলে গ্রামের বাড়িতে শিক্ষিকা মেহরীনের দাফনের আগে কাঁদতে কাঁদতে এসব তথ্য জানান তাঁর স্বামী মনসুর হেলাল।

বিমান দুর্ঘটনায় ছাত্রদের বাঁচাতে গিয়ে নিহত ঢাকার মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের সহকারী শিক্ষিকা মেহেরিন চৌধুরীর দাফন আজ বিকেল ৪টায় নীলফামারীর জলঢাকার বগুলাগাড়ী গ্রামের কবরস্থানে সম্পন্ন হয়। সকাল থেকেই বগুলাগাড়ী গ্রামের বাড়িতে তাঁর দাফনের প্রস্তুতি চলতে থাকে। দুপুরে মরদেহ নিজ বাড়িতে আসার পর বিকেলে বগুলাগাড়ী কলেজ মাঠে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পারিবারিক কবরস্থানে বাবা-মায়ের কবরের পাশে দাফন করা হয় তাঁকে। জানাজা ও দাফন কার্য শেষে মোনাজাতে অংশ নেয় হাজারো মানুষ।

মেহেরীন চৌধুরী ছিলেন জলঢাকা উপজেলার বগুলাগাড়ী গ্রামের মো. মহিতুর রহমান চৌধুরীর মেয়ে। স্বামী মনসুর হেলাল টাঙ্গাইলের বাসিন্দা। মেহেরীন–মনসুর দম্পতির দুই সন্তান রয়েছে। মেহেরীন চৌধুরী এর আগে বগুলাগাড়ী স্কুল অ্যান্ড কলেজের অ্যাডহক কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করছিলেন।

স্থানীয়রা জানায়, দুই ঈদসহ মাঝেমধ্যে গ্রামের বাড়ি আসতেন মেহেরীন চৌধুরী। তিনি গ্রামের গরিব-দুঃখী মানুষকে আর্থিক সহায়তা করতেন। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কালভার্ট নির্মাণসহ বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজে তাঁর সহযোগিতা ছিল উল্লেখযোগ্য। এজন্য এলাকাবাসী তাঁকে শিক্ষানুরাগী হিসেবে গণ্য করতেন। এজন্য বগুলাগাড়ী স্কুল অ্যান্ড কলেজের অ্যাডহক কমিটির সভাপতি হিসেবে মনোনীত করা হয়।

নিহতের স্বামী মনসুর হেলাল বলেন, ‘ক্লাস শেষে শিক্ষার্থীদের নিয়ে বের হওয়ার সময়ই বিমান দুর্ঘটনা হয়। প্রথমে মেহেরীন সামান্য আঘাত পান। কিন্তু পরবর্তীতে জানতে পারেন ২০ থেকে ২৫ জন শিক্ষার্থী ভবনের ভেতরে আটকে পড়েছে। তিনি মোবাইলে বিষয়টি আমাকে জানান এবং শিক্ষার্থীদের উদ্ধার করতে নিজেই আবার ভবনের ভেতরে প্রবেশ করেন।’

স্বামী আরও বলেন, ‘উদ্ধারকাজ চালানোর সময় মেহেরীন অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং পরে তাঁকে জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে নেওয়া হয়। তাঁর শরীরের পা থেকে মাথা পর্যন্ত ঝলসে গিয়েছিল। চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাত ৯টার পর মৃত্যু হয়। গতকাল সোমবার  রাতে তাঁর মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের আবাসিক সার্জন ডা. শাওন বিন রহমান।’

সোমবার মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিমান দুর্ঘটনায় অকুতোভয় এই শিক্ষিকা প্রায় ২০ শিক্ষার্থীকে বাঁচাতে গিয়ে নিজের প্রাণ উৎসর্গ করেন। তাঁর এমন মৃত্যু কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না পরিবারের সদস্য এবং এলাকার মানুষ। শেষ কথা বলতে গিয়ে তিনি তাঁর স্বামীকে বলেছিলেন– ‘ছাত্ররা আমার সন্তানের মতো। তাদের আগুনে পুড়তে দেখে আমি চুপ থাকতে পারিনি।’

নিহতের ভাই কমেট চৌধুরী বলেন, ‘অনেক সময় দেখা যায় নিজের সন্তানের জন্য মায়েরা জীবন দেয়। কিন্তু অন্যদের সন্তানের জন্যও যে একজন মা হিসেবে আবির্ভূত হয়ে জীবন দিতে পারেন এটা আসলে ভাষায় বলে বোঝানোর মতো নয়। পৃথিবীতে মা জাতির যে সম্মান; একজন শিক্ষকের যে সম্মান আমার বোন আসলে জীবন দিয়ে সেটা প্রমাণ করে গেলেন।’

কান্নাজড়িত কণ্ঠে কমেট চৌধুরী আরও বলেন, ‘আমার বোন চাইলে বের হয়ে বাঁচতে পারতেন। কিন্তু তিনি তাঁর আদরের শিক্ষার্থীদের ফেলে যেতে পারলেন না। আগুনের লেলিহান শিখা, ধোঁয়ার ঘনঘটা সবকিছুকে উপেক্ষা করে ছুটে গিয়েছিলেন ক্লাসরুমে। একজন একজন করে টেনে আনেন। আগুনের মুখ থেকে বাঁচিয়ে ফেরান অন্তত ২০টি নিষ্পাপ প্রাণ। আর ঠিক সেই লড়াইয়ে নিজের শরীরের ৮০ শতাংশ পুড়িয়ে, নিজেই চলে গেলেন চির বিদায়ের পথে।’