রংপুরে একই পরিবারের চার খুনে ধর্ষণের আলামত মেলেনি: ডিবি

রংপুরে জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ একই পরিবারের চারজনকে হত্যার ঘটনায় নতুন তথ্য দিয়েছে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। মাদক সেবনে বাধা দেওয়া এবং জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধের জেরে এ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। তবে এ ঘটনায় ধর্ষণের কোনো আলামত মেলেনি বলে জানিয়েছে গোয়েন্দা পুলিশ।

এ ঘটনায় গ্রেপ্তার সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসকে হত্যাকারী হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। তারা আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়ে চার হত্যার দায় স্বীকার করেছে বলেও জানিয়েছে পুলিশ।

বুধবার দুপুরে নগরীর পায়রা চত্বর এলাকায় রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের ডিবি কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য জানান উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিবি) সনাতন চক্রবর্তী। 

ডিবির উপ-পুলিশ কমিশনার সনাতন চক্রবর্তী বলেন, ‘হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ নিশ্চিত করতে তদন্ত চলছে। ফরেনসিকসহ তদন্তের সব প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে মামলার অভিযোগপত্র দেওয়া হবে।’

তিনি বলেন, ‘কী কারণে হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, সেটি তদন্তের বিষয়। তদন্ত ও ফরেনসিক রিপোর্টসহ অন্যান্য আলামত বিশ্লেষণ করে আমরা চার্জশিট দেব।’
 
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ঘটনার দিন সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাস ওই ভবনের ছাদে মাদক সেবন করছিলেন। একপর্যায়ে নিহত পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে তাদের বিরোধ হয়। মাদক সেবনে বাধা দেওয়া এবং জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধের জের ধরে ওই পরিবারের চার সদস্যকে হত্যা করা হয় বলে প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে।

হত্যাকাণ্ডের পর ঘটনাস্থল থেকে বেরিয়ে নতুন টাকা দিয়ে একটি দোকানে কেনাকাটা করতে যান দুই আসামি। ওই সময় তাদের গতিবিধি ও কেনাকাটার সূত্র ধরে পুলিশ তাদের শনাক্ত করে। পরে প্রথমে সিদ্ধার্থ দাসকে তার বাড়ি থেকে আটক করা হয়। এরপর মুগ্ধ দাসকে গ্রেপ্তারে তার বাড়িতে অভিযান চালায় পুলিশ। সেখানে তাকে না পেয়ে শ্মশান এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাকে আটক করা হয়।

সনাতন চক্রবর্তী বলেন, ‘সিদ্ধার্থ দাসকে তার বাড়ি থেকে আটক করা হয়। পরে মুগ্ধ দাসের বাড়িতে গিয়ে তাকে না পেয়ে শ্মশানে পালিয়ে যাওয়ার তথ্য পাই। সেখানে অভিযান চালিয়ে মুগ্ধ দাসকে আটক করা হয়।’

গ্রেপ্তারের পর জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হয়। পরে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়ে দুজনই চার হত্যার দায় স্বীকার করেছে বলে জানিয়েছে ডিবি।

তবে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে ধর্ষণের কোনো ঘটনা ঘটেছে—এমন তথ্য পাওয়া যায়নি বলে স্পষ্ট করেছে পুলিশ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মাধ্যমে এ নিয়ে নানা ধরনের তথ্য ছড়িয়ে পড়লেও ফরেনসিক পরীক্ষায় ধর্ষণের কোনো আলামত পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে ডিবি।

সনাতন চক্রবর্তী আরও বলেন, ‘এ ঘটনায় কোনো ধর্ষণের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। আমরা ফরেনসিক রিপোর্ট পেয়েছি। ওই রিপোর্টে গণপতি চক্রবর্তীর স্ত্রী ও মেয়েকে ধর্ষণের শিকার করা হয়েছে—এমন কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।’

পুলিশ জানায়, হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় প্রত্যক্ষ ও পারিপার্শ্বিক সাক্ষীদের জবানবন্দি নেওয়া হয়েছে। ঘটনাস্থল থেকে বিভিন্ন আলামত সংগ্রহের পাশাপাশি আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদ, তাদের গতিবিধি এবং হত্যার আগে-পরে কর্মকাণ্ডের তথ্যও যাচাই করা হয়েছে। তদন্তে পাওয়া তথ্য-প্রমাণ পরস্পরের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হচ্ছে।

ডিবি বলছে, ঘটনাটির সঙ্গে আর কেউ জড়িত ছিল কি না, হত্যার পেছনে মাদক সেবনে বাধা দেওয়া ও জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধের কোনটি কতটা ভূমিকা রেখেছে এবং হত্যাকাণ্ডের পুরো ঘটনা কীভাবে সংঘটিত হয়েছে—এসব বিষয়ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

উপ-পুলিশ কমিশনার সনাতন চক্রবর্তী আরও বলেন, ‘আমরা সাক্ষীদের জবানবন্দি নিয়েছি, বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করেছি। তদন্ত এখনো চলমান। সব তথ্য-প্রমাণ যাচাই-বাছাই শেষে প্রকৃত ঘটনা স্পষ্ট হবে এবং তদন্ত শেষে আদালতে অভিযোগপত্র দেওয়া হবে।

গত শনিবার রংপুর জেলা শহরের মাছুয়াপাড়া এলাকার বাড়ি থেকে শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী, মেয়ে ও ছেলের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। পরে পুলিশ অভিযান চালিয়ে সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসকে গ্রেপ্তার করে। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ ও আদালতে দেওয়া জবানবন্দির পর হত্যাকাণ্ডের কারণ ও ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে নতুন তথ্য সামনে আসে।