ভুট্টা চাষের ভরা মৌসুমে সার পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ তুলেছেন গাইবান্ধার চরাঞ্চলের কৃষকেরা। তাদের অভিযোগ, দীর্ঘ নদী পথ পাড়ি দিয়ে, ডিলারের কাছে গিয়েও চাহিদা অনুযায়ী মিলছে না সার। এ ছাড়া এসব অঞ্চলে খুচরা সার বিক্রেতা কেন্দ্র চালু করেও মেলেনি কোনো সমাধানও। তাই ভুট্টা চাষ নিয়ে চরম হতাশায় ভুগছেন গাইবান্ধার চরাঞ্চলের কৃষকেরা। অন্যদিকে কৃষি অধিদপ্তর বলছে, গোডাউনে সারের পর্যাপ্ত মজুদ আছে। সেগুলো কৃষকদের মাঝে পর্যায়ক্রমে দেওয়া হবে।
জানা গেছে, চরের এই জমিগুলোতো অন্যান্য ফসলের তুলনায় ভুট্টা চাষে খরচ কম, লাভের পাল্লা বেশি। প্রতি বছর প্রাকৃতিক দূর্যোগ কাটিয়ে কৃষির অর্থনীতে উন্নয়নের যোগান দিতে ভুট্টা চাষ করেন এ জেলার চরাঞ্চলের কৃষকেরা। এ বছরও ভুট্টা চাষে ব্যস্ত সময় পার করছেন তারা। তবে এরই মধ্য ভুট্টা চাষে মৌসুমের শুরুতেই তীব্র সার সংকট দেখা দিয়েছে। ডিলাদের কাছে সার চাইলেও পর্যাপ্ত বরাদ্দ না থাকায় প্রয়োজনীয় সার পাচ্ছেন না কৃষকেরা। চরাঞ্চলের কৃষকদের হাতে দ্রুত সার পৌঁছানোর জন্য প্রতি চরে সাব ডিলার নিয়োগ করেছে কৃষি বিভাগ। তবে ডিলার নিয়োগ দেওয়ার পরও কৃষকদের চাহিদা মতো সার জোগান দিতে পারছেন তারাও।
সরেজমিনে দেখা যায়, গাইবান্ধার চরাঞ্চলের কৃষকেরা ভুট্টার আবাদের জন্য কেউ জমি তৈরি করছে। আবার কেউ আবার ভুট্টা চাষ শুরু করছে। অনেকেই জমি তৈরি করে অপেক্ষা করছেন সারের জন্য। কৃষকেরা অনেক জমিতে বন্যার পানি নেমে যাওয়ার সাথে সাথেই ভুট্টার লাগিয়েছে। সে সব ভুট্টা গাছ মন্দাকে হার মানিয়ে বাতাসে দুলছে। এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন তারা।
কৃষকদের দাবি, ভুট্টার আবাদের ভরা মৌসুমে তারা সার পাচ্ছেন না। যতটুকু পাচ্ছেন তা চাহিদার তুলনায় অনেক কম। এছাড়া সার যোগাতে চরাঞ্চল থেকে ডিলার পয়েন্টে সার সংগ্রহ করতে সময় ও ভাড়া বাবদ তিন থেকে চারশো টাকা বেশি গুনতে হচ্ছে। সময় ও ভাড়া বাঁচাতে বেশি দামে সার কিনতেও প্রস্তুত তারা। তাই সারের চাহিদা মেটাতে ও কৃষকদের বাঁচাতে খোলা বাজারে বিক্রির দাবি তাদের।
গাইবান্ধার চরে ফুলছড়ি উপজেলার ফজলুপুর ইউনিয়নে উজলডাঙা গ্রামের কৃষক আল আমিন বলেন, ভুট্টার আবাদের ভরা মৌসুমে ইউরিয়া সার পাচ্ছি না। ডিলারের কাছে গিয়ে সামান্য পরিমাণ সার দিচ্ছে। সেই সার দিয়ে চাহিদা না মেটাতে পেরে অন্য জায়গায় থেকে বস্তা প্রতি ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা বেশি দিয়ে সার দিয়ে জমিতে দিচ্ছি।
আরেক কৃষক সামাদ মিয়া বলেন, ‘সারের জন্য ডিলারের কাছে গেলে বলে, বিএএস এর কাছে যাও। আবার বিএএস বলে কৃষি অফিসারের কাছে যাও। এভাবে আমরা ভুট্টা চাষিরা সারের জন্য হয়রানির স্বীকার হচ্ছি। ভুট্টার জমিতে পানি দিছি, এখন সার নেই। সঠিক সময়ে সার না দিতে পারলে, ভুট্টার গাছ লাল হয়ে মারা যাবে। এতে আমরা বিশাল ক্ষতির মুখে সম্মুখীন হবো।’
এরেন্ডাবাড়ির কৃষক আব হাসনাত বলেন, ‘আমি ৩৫ বিঘা জমিতে ভুট্টার চাষ করছি। জমিতে পানি দিয়ে নিড়ানীর পর দিতে হবে। সেই সার পাচ্ছি না। ডিলার দুই বস্তা সার দিয়েছে। এই সামান্য সার দিয়ে কিছুই হবে না। আবাদ করছি কষ্ট করে, সারের অভাবে তো নষ্ট করা যাবে না, তাই বেশি দাম দিয়ে হলেও অন্য কোথায় থেকে সংগ্রহের চেষ্টা করছি।’
মোল্লার চরের কৃষক ময়নুল প্রামানিক বলেন, ‘চরের মানুষদের এখন আবাদের ভরা মৌসুম। আমাদের পর্যাপ্ত সারের দরকার। কিন্তু সার তো পাচ্ছি না। হামরা ডিলার-মিলার কৃষি অফিসার বুঝি না। বেশি দাম দিয়ে হলেও হামাক দোকান থেকে সার কেনার ব্যবস্থা করে দেক সরকার। তাছাড়া আবাদ না হলে, হামরা বাঁচমো ক্যামনে।’
সুন্দরগঞ্জে লাল চামার চরের কৃষক আইজার আলী বলেন, ‘ভুট্টা আবাদে পর্যাপ্ত ইউরিয়া সারের প্রয়োজন। প্রয়োজন অনুয়ারী আমরা সার পাচ্ছি না। সার না পেলে আবাদ করবে ক্যামনে? আর আবাদের উপরই আমাদের সংসার চলে। খোলা বাজারে সার ছাড়লেই কৃষকদের এতো হয়রানি স্বীকার হওয়া লাগতো না।’
পুরাতন ফুলছড়ির বিসিআই অনুমোদিত রাসায়নিক সার ডিলার মো. মিজানুর রহমান বলেন, ‘সরকারিভাবে মাসে যে পরিমাণ সার বরাদ্ধ পাই। তা কৃষকদের মাঝে বিক্রি করি। সার শেষ হওয়ার পরে চাইলেও তো দেওয়া সম্ভব হয় না। আর চরের ভুট্টা চাষিদের সবার একই সময়ে সারের চাহিদা থাকার কারণে এ সমস্যা হচ্ছে। আর আমাদের কাজই হলো মাসে যতটুকু বরাদ্দ পাই, সেই টুকুই কৃষকদের কাছে বিক্রি করি।’
চরের বাসিন্দারা জানিয়েছেন, এক সময় চরের জমিগুলো পড়ে থাকতো। এখন এই জমিগুলোতেই রবি মৌসুমেতেই উৎপাদন হয় কমপক্ষে পাঁচ শো কোটি টাকার ভুট্টা। এ ছাড়া এগুলো যোগান দিচ্ছে মানুষ ও গো খাদ্যর কাঁচামাল হিসেবে। এগুলো ভুমিকা রাখছে অর্থনীতিতেও।
কৃষি অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এবার জেলার ছোট-বড় ১৬৫টি চরে ১৮ হাজার হেক্টর জমিতে ভুট্টার আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। কয়েক বছরের তুলনায় প্রায় এক হাজারেও বেশি হেক্টর জমি।
গাইবান্ধা কৃষি সম্পসারণ অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত উপ-পরিচালক মো. আসাদুজ্জামান বলেন, ‘প্রত্যেক বছর নভেম্বর মাসের দিকে চরাঞ্চলে ভুট্টা চাষ শুরু হয়। এবছর আগাম বন্যার কারণে অক্টোবর মাসের শুরুর দিকে কৃষকেরা ভুট্টা চারা রোপণ করা শুরু করছে। এছাড়া কৃষকেরা চাহিদার তুলনায় আগাম কয়েকগুন সার সংগ্রহের জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়ছে। তবে গোডাউনে সারের পর্যাপ্ত মজুদ আছে। সেগুলো কৃষকদের মাঝে পর্যায়ক্রমে দেওয়া হবে। সার নিয়ে কৃষকদের চিন্তার কোনো কারণ নেই।’