বাড়তি পরিচালন খরচ, সাগরে কাঙ্ক্ষিত মাছ না পাওয়া এবং প্রয়োজনীয় গবেষণার ঘাটতিতে বড় ধরনের চাপের মুখে পড়েছে দেশের সমুদ্রগামী মাছ ধরার জাহাজগুলো। উচ্চ বিনিয়োগের পরও লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী মাছ শিকার করতে না পারায় জাহাজ মালিক ও সংশ্লিষ্টদের মধ্যে উদ্বেগ দিন দিন বাড়ছে। তবে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় পর্যায়ে তথ্যভিত্তিক গবেষণায় আগের চেয়ে বেশি মনোযোগ দেওয়া হচ্ছে বলে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
বর্তমানে দেশে নিবন্ধিত মাছ ধরার জাহাজের সংখ্যা ২৬৪টি হলেও সমুদ্রে সচল রয়েছে অন্তত ২৩২টি। এর মধ্যে ৩০টির মতো জাহাজ সমুদ্রের তলদেশে জাল ফেলে (বটম ট্রলিং) মাছ ধরে এবং বাকি জাহাজগুলো মধ্য স্তরের মাছ শিকার করে থাকে। এসব বাণিজ্যিক জাহাজ বঙ্গোপসাগর থেকে সাধারণত ১১৫ প্রজাতির মাছ সংগ্রহ করে দেশের বাজারে নিয়ে আসে।
তবে সম্ভাবনাময় এই খাতটি এখন বহুমুখী সংকটে জর্জরিত। জলবায়ু পরিবর্তন, জ্বালানি তেলের উচ্চ মূল্য, গভীর সমুদ্রে নিরাপত্তা সংকট এবং সরকারি নিষেধাজ্ঞার সময়ে সম্পূর্ণ আয় বন্ধ থাকার কারণে ক্রমাগত লোকসানের মুখে পড়ছেন বিনিয়োগকারীরা। তার ওপর সাম্প্রতিক সময়ে সমুদ্রে মাছের প্রাপ্যতা আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, সঠিক ও আধুনিক গবেষণার অভাবে তারা অন্ধকারে রয়েছেন। সানম্যান গ্রুপের মহাব্যবস্থাপক আরিফুজ্জামান তুহিন এ প্রসঙ্গে বলেন, 'আমরা কোন অঞ্চলে কী মাছ পাব, তার সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই। যেমন টুনা মাছ নিয়ে আমাদের কোনো গবেষণা নেই। সরকার যদি সঠিক তথ্য না জানায়, তবে আমরা অন্ধকারেই থাকব। ফলে নতুন কোনো প্রজাতির মাছ আহরণ করা সম্ভব হচ্ছে না।'
সংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, একটি বাণিজ্যিকভাবে মাছ ধরার জাহাজ একবার সাগরে গেলে গড়ে ২৫ দিন অবস্থান করে। আর প্রতি যাত্রায় জ্বালানি, শ্রমিক ও অন্যান্য খাত মিলিয়ে খরচ হয় ১ কোটি টাকারও বেশি। ফলে পর্যাপ্ত মাছ না পেয়ে খালি হাতে ফিরলে জাহাজ মালিকদের বিপুল অঙ্কের লোকসান গুনতে হয়।
সামুদ্রিক মৎস্য গবেষকদের মতে, সমুদ্রে মৎস্যসম্পদ আহরণে একটি সঠিক ও আধুনিক ব্যবস্থাপনা তৈরি করা এখন সময়ের দাবি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মেরিন সায়েন্স অ্যান্ড ফিশারিজ বিভাগের অধ্যাপক সাইদুর রহমান চৌধুরী বলেন, 'সারা বিশ্বের দিকে যদি আমরা তাকাই, তবে দেখব যে পরিমাণ সম্পদ সমুদ্র থেকে আহরণ করা হয়, সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে তার দ্বিগুণ পরিমাণ ব্যবহার করা সম্ভব। এই নীল অর্থনীতি বা ব্লু-ইকোনমি আমাদের জন্য একটি অমূল্য সম্পদ।'
উচ্চ বিনিয়োগের এই খাতে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে সমুদ্রের মৎস্যসম্পদ রক্ষা করা এবং একই সাথে জাহাজের লোকসান এড়ানোর মধ্যে একটি ভারসাম্য বজায় রাখা। এ কারণে সরকার এখন জরিপ ও গবেষণার ওপর বাড়তি জোর দিচ্ছে। তবে এর পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও প্রশিক্ষণের ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। নর্থ ইন্ডিয়ান ওশান হাইড্রোগ্রাফিক কমিশনের চেয়ারম্যান রিয়ার এডমিরাল মোহাম্মদ মুসা বলেন, 'আমাদের আধুনিক প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। আমরা নিজেরাই অনেক কিছু করছি। তবে আমাদের যদি পর্যাপ্ত ইকুইপমেন্ট (সরঞ্জাম) ও নিজস্ব বিশেষায়িত জাহাজ থাকে, তাহলে এই উচ্চতর প্রশিক্ষণ আমরা নিজেরাই সম্পন্ন করতে পারব।'
সার্বিক মৎস্য খাতকে বাঁচাতে এবং সাগরে মাছ ধরার প্রক্রিয়াকে লাভজনক করতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তথ্য আদান-প্রদানের পাশাপাশি একটি বাস্তবভিত্তিক ও দীর্ঘমেয়াদি নীতি সহায়তার দাবি জানিয়েছেন জাহাজ মালিকরা।