ন্যাপকিনের নাম না জানা গ্রামে বদলে গেছে মেয়েদের জীবন

মানুষদের সচেতন করতে বিশেষ বার্তাসংবলিত ব্যাগ বিতরণ করা হয়। ছবি: সংগৃহীতকিশোরগঞ্জের নিকলি ইউনিয়নের দুর্গম গোড়াদিঘা গ্রাম। চারদিকে হাওর, যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম নৌকা। আধুনিক সুযোগ-সুবিধা থেকে অনেকটাই বিচ্ছিন্ন এই গ্রামের অধিকাংশ নারী কিছুদিন আগেও স্যানিটারি ন্যাপকিনের নামই জানতেন না। মাসিকের সময় পুরোনো কাপড় ও তুলা ব্যবহারের কারণে নানা স্বাস্থ্যঝুঁকিতে ভুগলেও বিষয়টি নিয়ে ছিল না পর্যাপ্ত সচেতনতা।

এই পরিস্থিতি বদলাতে সান কমিউনিকেশনস লিমিটেডের পরিকল্পনায়, ওএনজেড সলিউশনসের সহযোগিতায় এবং স্টেসেইফ স্যানিটারি ন্যাপকিনের উদ্যোগে শুরু হয় ‘নিরাপদ পিরিয়ড, সবার অধিকার’ কর্মসূচি।

গোড়াদিঘার নারীদের একত্রিত করতে আয়োজন করা হয় বিশেষ আনন্দ মেলার। হাওর এলাকার বাস্তবতা বিবেচনায় নৌকাকেই সচেতনতার অন্যতম মাধ্যম হিসেবে বেছে নেওয়া হয়। মেলা সংলগ্ন নদীর ঘাটে রাখা হয় স্টেসেইফের তিনটি বিশেষ নৌকা। সেখানে নারীদের মাসিক স্বাস্থ্য নিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ দেওয়ার পাশাপাশি তিন মাসের বিনামূল্যে স্যানিটারি ন্যাপকিন বিতরণ করা হয়।

শুধু পণ্য বিতরণেই সীমাবদ্ধ থাকেনি উদ্যোগটি। স্থানীয় ফার্মেসির মালিক ও কর্মীদের পিরিয়ড ও স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহারের বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে ফার্মেসিতে আসা মানুষদের সচেতন করতে বিশেষ বার্তাসংবলিত ব্যাগ বিতরণ করা হয়।

নারীদের কাছে স্বাস্থ্যবিধির বার্তা পৌঁছে দিতে ব্যবহার করা হয় স্থানীয় সংস্কৃতি ও বিনোদনের মাধ্যমও। হাওরবাসীর জনপ্রিয় খেলা সাপ-লুডুর মাধ্যমে তুলে ধরা হয় অনিরাপদ মাসিক ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকি। কোথাও লেখা হয় বন্ধ্যাত্ব, কোথাও জরায়ু ক্যান্সার বা সংক্রমণের কথা। এর পাশাপাশি স্কুলে বিশেষ ক্লাস, উঠান বৈঠক ও উন্মুক্ত আলোচনার মাধ্যমে কিশোরীদের মাসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন করা হয়।

উদ্যোগটির স্থায়ী প্রভাব নিশ্চিত করতে গোড়াদিঘায় তৈরি করা হয় ‘স্টেসেইফ গার্ল’। তাদের কাছ থেকে নারীরা বিনামূল্যে স্যানিটারি ন্যাপকিন সংগ্রহ করতে পারেন। তিন মাস পর অর্ধেক দামে ন্যাপকিন পাওয়ার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। স্থানীয় ফার্মেসিগুলোতেও স্বল্পমূল্যে ন্যাপকিন কেনার সুযোগ তৈরি করা হয়েছে।

স্টেসেইফ স্যানিটারি ন্যাপকিনের উদ্যোগে শুরু হয় ‘নিরাপদ পিরিয়ড, সবার অধিকার’ কর্মসূচি। ছবি: সংগৃহীতস্টেসেইফের হেড অব মার্কেটিং নয়ন রায় বলেন, আধুনিক যুগে কোনো গ্রামের মেয়েরা যদি স্যানিটারি ন্যাপকিন সম্পর্কে না জানে, সেটি শুধু স্বাস্থ্যঝুঁকি নয়, সমান সুযোগ পাওয়ার ক্ষেত্রেও বড় বাধা। তাদের লক্ষ্য শুধু পণ্য পৌঁছে দেওয়া নয়, বরং নারীদের অভ্যাসে স্থায়ী পরিবর্তন আনা।

সান কমিউনিকেশনসের গ্রুপ কপি হেড রিয়াজুল আলম শাওন বলেন, গোড়াদিঘার নারীরা বছরের পর বছর বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে জীবনযাপন করছিলেন। বিষয়টি জানার পর তাদের জন্য স্থায়ী পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়।

সান কমিউনিকেশনসের ক্রিয়েটিভ ডিরেক্টর তানভীর সিকদারও বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে মেয়েরা এগিয়ে গেলেও গোড়াদিঘার নারীদের বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। তাই তাদের জীবনমান ও সচেতনতা বৃদ্ধিতে আন্তরিকভাবে কাজ করার চেষ্টা করা হয়েছে।

বদলে গেছে গোড়াদিঘার চিত্র

উদ্যোগটির কয়েক মাস পর বদল এসেছে গোড়াদিঘার নারীদের জীবনযাপনে। আগে যেখানে অনেকেই মাসিকের সময় কাপড় ব্যবহার করতেন, এখন সেখানে স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহারের প্রবণতা বেড়েছে। স্থানীয় ফার্মেসিতেও সহজে ন্যাপকিন পাওয়া যাচ্ছে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, আগে মাসিক নিয়ে কথা বলতেও অনেকে সংকোচ বোধ করতেন। এখন স্কুল, বাড়ির উঠান, নৌকা এমনকি খেলাধুলার মাধ্যমেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে।

স্টেসেইফ স্যানিটারি ন্যাপকিনের উদ্যোগে শুরু হয় ‘নিরাপদ পিরিয়ড, সবার অধিকার’ কর্মসূচি। ছবি: সংগৃহীতএক শিক্ষার্থী জানায়, আগে তারা এসব বিষয়ে তেমন কিছু জানত না। স্টেসেইফের উদ্যোগের মাধ্যমে তারা মাসিক স্বাস্থ্য ও নিরাপদ ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে জানতে পেরেছে।

আরেক শিক্ষার্থী জানায়, আগে কাপড় ব্যবহার করলেও এখন স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন হয়ে তারা মাসিকের সময় স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহার করছে।

স্থানীয় ইউপি সদস্য মো. আবদুল মোতালিব বলেন, আগে এই এলাকার নারীদের মধ্যে সচেতনতার ঘাটতি ছিল। ধারাবাহিক সচেতনতামূলক কার্যক্রম ও ন্যাপকিন সহজলভ্য করার উদ্যোগের ফলে পরিস্থিতি বদলেছে।

পল্লী চিকিৎসক আনোয়ার হোসেন জানান, বছরখানেক আগেও এলাকার নারীরা মাসিক ও স্যানিটারি ন্যাপকিন সম্পর্কে খুব বেশি জানতেন না। বর্তমানে অধিকাংশ নারীই এ বিষয়ে সচেতন এবং ন্যাপকিন ব্যবহার করছেন।

স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে গোড়াদিঘার প্রায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ মেয়ে স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহার করছে। অভিভাবকরাও আগের তুলনায় বেশি সচেতন হয়েছেন এবং অনেক বাবা-মা নিজেরাই মেয়েদের জন্য ন্যাপকিন কিনে দিচ্ছেন।

দুর্গম একটি হাওর গ্রামের নারীদের মধ্যে নিরাপদ মাসিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে যে পরিবর্তন শুরু হয়েছে, সেটিকে স্থানীয়রা দেখছেন স্বাস্থ্য ও মর্যাদার নতুন যাত্রা হিসেবে। সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, গোড়াদিঘার এই সচেতনতার উদ্যোগ দেশের অন্যান্য দুর্গম এলাকাতেও ছড়িয়ে পড়বে।