ভাবুন তো—‘ফুললি ফান্ডেড’ বৃত্তিতে বিদেশি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যাওয়ার সব প্রস্তুতি আপনার শেষ, বিমানের টিকিটও হয়তো কেটে ফেলেছেন! কিন্তু হঠাৎ আকাশ থেকে পড়ার মতো অবস্থা! এ কী! এত বড় প্রতারণা! ‘ফুললি ফান্ডেড’ বৃত্তির কথা বলে, অধিকাংশ খরচের ভারই তো চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে আপনার ঘাড়ে!
পাকিস্তানে ‘নলেজ করিডোর’ বৃত্তি নিয়ে ঠিক এমন পরিস্থিতিরই সৃষ্টি হয়েছে। চলুন, সহজে বুঝে আসি, আসলে কী ঘটছে:
ঘটনা আসলে কী?
বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের স্থবির সম্পর্ককে এগিয়ে নিতে ২০২৫ সালের আগস্টে ঢাকায় সফর করেন পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার। প্রায় ১৩ বছর পর কোনো পাকিস্তানি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই সফরে দুই দেশের মধ্যে উচ্চশিক্ষা, গবেষণা এবং জনগণের যোগাযোগ বাড়ানোর জন্য একটি শিক্ষা সহযোগিতা উদ্যোগের ঘোষণা দেওয়া হয়—যেটি পরিচিত হয় ‘নলেজ করিডোর’ নামে।
এই উদ্যোগের আওতায় পাঁচ বছরে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য মোট ৫০০টি পূর্ণাঙ্গ বৃত্তি দেওয়ার কথা বলা হয়। এর মধ্যে ছিল ব্যাচেলরস, মাস্টার্স এবং পিএইচডি পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা। আর ‘পূর্ণাঙ্গ বৃত্তি’ বলতে যে সুবিধাগুলোর কথা প্রচার করা হয়েছিল, তার মধ্যে ছিল—টিউশন ফি, মাসিক মেইনটেন্যান্স অ্যালাউন্স, হোস্টেল খরচ, এককালীন সেটেলমেন্ট অ্যালাউন্স এবং রিটার্ন এয়ার টিকিট। অর্থাৎ, একজন শিক্ষার্থী যেন বিদেশে গিয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেন—সেই ধরনের একটি পূর্ণ আর্থিক সহায়তার প্রতিশ্রুতিই দেওয়া হয়েছিল।
প্রথম ধাপে কী হয়েছে
নলেজ করিডোরের প্রথম ব্যাচে প্রায় ৭৪ জন বাংলাদেশি শিক্ষার্থী ধাপে ধাপে পাকিস্তানে যান। তাঁরা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনাও শুরু করেন। এরপর গত মে মাসে ঢাকায় পাকিস্তান এডুকেশন এক্সপোর দ্বিতীয় ধাপের কার্যক্রম শুরু হয়। নতুন করে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আবেদন নেওয়া হয়। অনেক শিক্ষার্থী তখনও আগের ঘোষণার ভিত্তিতেই ধরে নিয়েছিলেন—এটিও হবে সম্পূর্ণ অর্থায়িত বৃত্তি। কিন্তু সমস্যা দেখা দেয় মাস্টার্স পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের অফার লেটার পাওয়ার পর।
কোথায় সংকট?
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, আবেদন, পরীক্ষা ও বাছাই প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর অফার লেটারে দেখা যায়—তাদের দেওয়া হচ্ছে মূলত ১০০ শতাংশ টিউশন ফি মওকুফ এবং আবাসন সুবিধা। কিন্তু নেই মাসিক জীবনযাত্রার ভাতা। নেই খাবারের খরচ। নেই যাতায়াতের অর্থ। নেই বিমান ভাড়ার সুবিধা। কিছু শিক্ষার্থীর বক্তব্য অনুযায়ী, ভিসা ফি, স্বাস্থ্যবীমা ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচও তাদের নিজেদের বহন করতে হবে।
ফলে প্রশ্ন উঠছে—যে বৃত্তিকে শুরু থেকেই ‘ফুললি ফান্ডেড’ বলা হয়েছিল, শেষ পর্যায়ে এসে সেটি কেন এতটা সীমিত হয়ে গেল?
শিক্ষার্থীরা যা বলছেন
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন শিক্ষার্থী অভিযোগ করেছেন, শুরু থেকেই সরকারি বিজ্ঞপ্তি ও অফিসিয়াল প্রচারে বৃত্তিটিকে সম্পূর্ণ অর্থায়িত হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল। তাঁর বক্তব্য, যদি মাস্টার্স পর্যায়ে পূর্ণ অর্থায়নের সুযোগ না থাকে, তাহলে আবেদন শুরুর সময়ই সেটি স্পষ্ট করা উচিত ছিল।
আরেক শিক্ষার্থী জানিয়েছেন, তিনি যে অফার লেটার পেয়েছেন, সেখানে টিউশন ফি ও আবাসনের সুবিধা থাকলেও জীবনযাত্রার ব্যয়, পরিবহন, ভিসা ফি, চিকিৎসা বীমা ও অন্যান্য খরচ বাদ দেওয়া হয়েছে। তাঁর আশঙ্কা—এটি হয়তো শুধু তাঁর ক্ষেত্রে নয়; মাস্টার্সে আবেদন করা অনেক শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রেই একই ধরনের অফার দেওয়া হয়েছে।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, বৃত্তিতে মাসিক ভাতা, খাবারের খরচ, স্বাস্থ্যবীমা কিংবা বিমান ভাড়ার সুবিধা নেই। পাশাপাশি তাঁরা যে বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রোগ্রাম পছন্দ করে আবেদন করেছিলেন, সেটি না দিয়ে অন্য একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠানো হয়েছে—এবং এ পরিবর্তনের বিষয়ে আগে আলোচনা করা হয়নি।
আসল সমস্যা কোথায়?
সমস্যা শুধু টাকা-পয়সার নয়। বিষয়টা হলো—প্রতিশ্রুতি ও বাস্তব সুবিধার মধ্যে পার্থক্য। একজন শিক্ষার্থী যখন বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য আবেদন করেন, তখন শুধু টিউশন ফি মওকুফ হলেই তাঁর সব খরচ মিটে যায় না। থাকা, খাবার, যাতায়াত, ভিসা, স্বাস্থ্যবীমা এবং দৈনন্দিন জীবনযাপনের খরচ—সবকিছু মিলিয়েই তৈরি হয় প্রকৃত শিক্ষাব্যয়।
তাই কোনো বৃত্তিকে ‘ফুললি ফান্ডেড’ বলা হলে শিক্ষার্থীরা স্বাভাবিকভাবেই ধরে নেন, এসব ব্যয়ের বড় অংশই বৃত্তির আওতায় থাকবে। কিন্তু অফার লেটারে যদি তার প্রতিফলন না থাকে, তাহলে শিক্ষার্থীদের সামনে তৈরি হয় বড় ধরনের অনিশ্চয়তা। বিশেষ করে যারা বাংলাদেশের বাইরে গিয়ে পড়াশোনার পুরো ব্যয় নিজেরা বহন করতে পারবেন না, তাদের জন্য এই পার্থক্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সমাধান কী?
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—পাকিস্তানের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আসলে কী প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল এবং বর্তমান অফার লেটারের সঙ্গে সেই প্রতিশ্রুতির পার্থক্য কেন তৈরি হয়েছে—তার স্পষ্ট ব্যাখ্যা।
শিক্ষার্থীরা আবেদন করেছেন একটি নির্দিষ্ট শর্ত ও সুবিধার ভিত্তিতে। তাই তাঁদের অভিযোগের জবাবও হওয়া প্রয়োজন স্বচ্ছভাবে। বিজ্ঞপ্তিতে কী বলা হয়েছিল? আবেদনকারীদের কী জানানো হয়েছিল? নির্বাচনের পর অফার লেটারে কেন সুবিধা কমে গেল? এবং প্রথম ধাপের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে দ্বিতীয় ধাপের শিক্ষার্থীদের সুবিধায় কোনো পার্থক্য থাকলে তার কারণ কী?
এটি শুধু বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের একটি বৃত্তির বিষয় নয়। বাংলাদেশ-পাকিস্তানের মধ্যে নতুন করে শিক্ষা ও জনগণের যোগাযোগ বাড়ানোর যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, তার বিশ্বাসযোগ্যতার সঙ্গেও বিষয়টি জড়িয়ে আছে। সেই জায়গাতেই এখন প্রশ্ন তুলছেন পাকিস্তানের বৃত্তির জন্য নির্বাচিত বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা।