অন্তর্জাল: ‘দর্শকের নজর কেড়ে নেয় পরবর্তী দৃশ্যে কী ঘটতে চলছে, তাতে’

শেষে জানা যায় এটি একটি সিনেমার দৃশ্য, বাস্তবে কোনো ঘটনা নয়। তবে এ নিয়ে সে সময় জল গড়িয়েছিল অনেক দূর! অবশেষে গত শুক্রবার মুক্তি পেল ‘অন্তর্জাল’ নামের সেই সিনেমা। যেখানে অভিনয় করেছেন বিদ্যা সিনহা মিম, এবিএম সুমন, সিয়াম আহমেদ, সুনেরাহ বিনতে কামাল, কিটো ভাই, রওনক হাসান, মোহাম্মদ বারী, অমিত সিনহা প্রমুখ। বাংলাদেশ সরকারের আইসিটি ডিভিশনের উদ্যোগে নির্মিত এই সিনেমা পরিচালনা করেছেন দীপংকর দীপন।
 
মিমকে ফ্রেম বোঝাচ্ছেন পরিচালক দীপন। ছবি: অন্তর্জাল টিম/ফেসবুকথ্রিলারধর্মী এ সিনেমার গল্প এগিয়েছে সাইবার দুনিয়াকে ঘিরে। যেখানে হ্যাকিংয়ের কবলে পড়ে একটি ব্যাংকের অটোমেটিক ট্রান্সফার সিস্টেম। আটকে যায় লাখ লাখ মানুষের আর্থিক লেনদেন। ভাবা যায় কী অবস্থা! সিনেমার শুরুতেই এই ঘটনার ইঙ্গিত দেন নির্মাতা। পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে গলা শুকিয়ে কাঠ ওই ব্যাংক কর্মকর্তাদের। টনক নড়ে ওঠে মন্ত্রণালয় থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের। এগোতে থাকে কাহিনি। একে একে দৃশ্যের ভেতর আসতে থাকেন অভিনয়শিল্পীরা। ফমুর্লা সিনেমায় যেমনটা হয়, তেমনভাবেই নায়কোচিত ভঙ্গিতে পর্দায় আবির্ভূত হন মিম-সুমন-সিয়াম-সুনেরাহরা। তাঁদের এই আগমনী মুহূর্ত নজরকাড়া বটে, তবে ক্লিশেও মনে হতে পারে কোনও কোনও দর্শকের! যাই হোক, সেটা বড় ব্যাপার না। গল্পই দর্শককে টেনে নিয়ে যায় আরও গভীরে।

সবাই জানেন, বিশ্বায়নের এই যুগ অনলাইননির্ভর। যে কারণে ডিজিটাল প্রযুক্তি বা ইন্টারনেট সংক্রান্ত কোনও ঝামেলা হলে তা যে কী মারাত্মক রূপ নিতে পারে সেটা কল্পনাতীত। থমকে যেতে পারে স্বাভাবিক জনজীবন। মুহূর্তে তেমনটাই আঁচ পাওয়া যায় ‘অন্তর্জাল’ সিনেমায়। বিদেশি হ্যাকার গ্রুপের আক্রমণে যখন বিপদগ্রস্ত সাধারণ মানুষ, তখন এই বিপদ থেকে দেশকে উদ্ধারে নিজের জীবন বাজি রাখেন তিন তরুণ প্রোগ্রামার—লুমিন, প্রিয়ম ও সাদাফ। যাঁরা লাইমলাইটে উঠে আসেন একটি হ্যাকাথন প্রতিযোগিতার মাধ্যমে। নিজেদের স্বার্থ উদ্ধারে তাঁদেরকে নিতে চায় ওই হ্যাকিং গ্রুপ। আর নিজের জীবন বিপদসংকুল জেনেও দেশের ব্যাংকিং সেক্টরকে রক্ষা করতে ঝাঁপিয়ে পড়েন তাঁরা, যা দেশবন্দনার অনন্য নজির। এখানে উল্লেখ্য, হ্যাকাথন হলো এমন একটি প্রতিযোগিতা যেখানে কোনও একটি জটিল সমস্যার গভীরে ঢুকে তার মূল কারণ উদঘাটন ও সেটার কার্যকর সমাধানের উপায় খুঁজে বের করেন প্রোগ্রামাররা।

‘অন্তর্জাল’ ছবিতে সেই তরুণ প্রোগ্রামারের ভূমিকায় রয়েছেন সিয়াম (লুমিন), সুনেরাহ (প্রিয়ম) ও কিটো ভাই (সাদাফ)। দেশের জন্য কিংবা চারিত্রিক দিক থেকে তাঁদের ইমোশন যেমনটা হওয়া দরকার তেমনই ফুটে ওঠে পর্দায়। মিম ও সুমন রয়েছেন রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা বাহিনীতে, বিপদে যাঁরা পিছপা না হয়ে বরং হাল ছাড়ে না শেষ পর্যন্ত।

সত্যি কথা বলতে, যে ধরনের গল্পে নির্মিত হয়েছে ‘অন্তর্জাল’ সিনেমাটি—সেখানে অভিনয়ের চেয়ে রহস্য প্রাধান্য পেয়েছে। দর্শকের নজর কেড়ে নেয় পরবর্তী দৃশ্যে কী ঘটতে চলছে, সে বিষয়টি। পুরো সিনেমায় সকল অভিনয়শিল্পীদের উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো। তবে এক-দুটি গানের সংযুক্তি না হলেও চলত। গানগুলো যদিও দর্শকের মনে চরিত্রগুলোর মতোই অন্য এক আবেশে ডুবিয়ে দেয়। তাছাড়া দৃশ্যগুলো দর্শকের মনে গেঁথে দিতে পরোক্ষভাবে ভূমিকা রাখে গানগুলোই। চিরকুট, মাশা ইসলাম কিংবা অ্যাশেজ—তাঁদের কথা নতুন করে বলার নেই। এক কথায় অসাধারণ।

অন্যদিকে, এ সিনেমায় দীপংকর দীপন নির্মাতা হিসেবে ভিএফএক্সে দিয়েছেন মুনশিয়ানার পরিচয়। এমন ডিজিটাল দুনিয়ার চিত্রায়ণ বাংলাদেশি কোনও সিনেমায় এবারই প্রথম চোখে পড়েছে। এ ক্ষেত্রে ফোর্থ ডাইমেনশন ভিজ্যুয়াল ইফেক্টেস কৃতিত্বের দাবিদার। এছাড়া আলাদা করে বলতে হয় সিনেমাটির অন্য এক অভিনেতার কথা। তিনি জোসেফ কিম। ‘কোরিয়ান ভাই’ নামে পরিচিত এই অভিনেতাও ছিলেন সাবলীল। চিত্রগ্রহণে মনিরুল ইসলাম মাসুম দুর্দান্ত।

রহস্য উদঘাটনে মরিয়া সুনেরাহ, মিয়াম, মিম, কিটো ও সাব্বির। ছবি: অন্তর্জাল টিমমোদ্দাকথা, বাণিজ্যিক সিনেমার যেসব মসলাপাতি থাকা দরকার তার ষোল আনাই রয়েছে ‌‘অন্তর্জাল’ ছবিতে। এছাড়া কম্পিউটার সায়েন্স কিংবা প্রোগ্রামিংয়ে তরুণ প্রজন্মের সম্ভাবনাও যে দিন দিন বাড়ছে, সেটারও এক ইঙ্গিত রয়েছে এই সিনেমায়।