অভিমানী মনি কিশোর

রাজধানীর রামপুরার বাসা থেকে উদ্ধার করা হয়েছে নব্বই দশকের জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী মনি কিশোরের মরদেহ। প্রাথমিকভাবে পুলিশের ধারণা, চার থেকে পাঁচ দিন আগে তাঁর মৃত্যু হয়েছে। কয়েক দিন সেই বাসা থেকে কোনো সাড়াশব্দ পাচ্ছিলেন না প্রতিবেশীরা। একসময় গন্ধ পেয়ে পাশের ফ্ল্যাটের লোকজন জরুরি সেবা ৯৯৯-এ কল দেয়। পরে পুলিশ এসে শনিবার (১৯ অক্টোবর) রাতে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করে।

ক্যারিয়ারে ‘কী ছিলে আমার বলো না তুমি’, ‘এই তুমি সেই তুমি নেই তুমি’, ‘কী করে ভাবলে’, ‘আমাকে ভালোবাসা সে তোমার প্রথম ভুল’ প্রভৃতি গানে ব্যাপক জনপ্রিয়তা কুড়িয়েছিলেন মনি কিশোর।

এ শিল্পীর প্রকৃত নাম মনি মণ্ডল। কিশোর কুমারের ভক্ত ছিলেন বলেই নামের পাশে ‘কিশোর’ জুড়ে নিয়েছিলেন। মজা করে এক সাক্ষাৎকারে মনি কিশোর বলেছিলেন, ‘কুমার শানু নিয়েছেন ওস্তাদের নামের একাংশ। আমি নিয়েছি তাঁর নামের আরেক অংশ।’

১৯৬১ সালে ফরিদপুরের বালিয়াকান্দি উপজেলায় জন্মগ্রহণ করেন মনি কিশোর। তবে তাঁর পৈতৃক বাড়ি যশোরের অভয়নগরে। কিন্তু বাবার চাকরি সুবাদে ফরিদপুরেই বেড়ে উঠেন তিনি। 

ছোটবেলা থেকেই গানের প্রতি তীব্র ঝোঁক ছিল তাঁর। উচ্চ মাধ্যমিক পাস করে ডিগ্রিতে ভর্তি হয়েও গানের টানে চলে আসেন রাজধানী ঢাকায়। পকেটে মাত্র ১২০ টাকা নিয়ে সেসময় তিনি তাঁর বোনের বাসায় আশ্রয় নিয়েছিলেন। সেখান থেকেই শুরু হয়েছিল সংগীত জগতে পথচলা। কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে গড়ে তুলেছিলেন ‘চার্মিং’ নামের একটি ব্যান্ড। 

মনি কিশোর। ছবি: সংগৃহীত

এই ব্যান্ড থেকে প্রকাশ পেয়েছিল তাঁদের প্রথম অ্যালবাম ‘চার্মিং বৌ’। যেখানে ছিল ‘কী ছিলে আমার’ শিরোনামের গানটি। এক সাক্ষাৎকারে সেই গল্প করতে গিয়ে মনি কিশোর জানিয়েছিলেন, প্রথমে মাত্র ছয় লাইনের এই গানটি অ্যালবামে রাখতেই চাননি তিনি। কিন্তু বিটিভির পর্দায় এটি প্রচার হলে শ্রোতারা তা লুফে নেয়। জনপ্রিয়তা পেয়ে যান দেশজুড়ে।

সংগীতজীবনে অসংখ্যা শ্রোতানন্দিত গানে পাওয়া গেছে মনি কিশোরকে। তাঁর জনপ্রিয় গানের মধ্যে ‘কী ছিলে আমার’, ‘উৎসব’, ‘সেই দুটি চোখ কোথায় তোমার’, ‘তুমি শুধু আমারই জন্য’, ‘মুখে বলো ভালোবাসি’, ‘আমি মরে গেলে জানি তুমি’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়া তিনি নিজেই ২০টির মতো গান লিখেছেন, সুর করেছেন।

গান কিন্তু কোনো ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে কিংবা বাজারে পাওয়া যায় না। এটা কিন্তু মন বা হৃদয় থেকে আসে। এবং কিছুটা স্বর্গীয় ব্যাপারও আছে। ব্যক্তিগতভাবে আমি তা-ই মনে করি। তো গান খুবই শ্রদ্ধার জিনিস। অনেক সাধনার জিনিস।

—মনি কিশোর, কণ্ঠশিল্পী

নব্বই দশকে তুমুল ব্যস্ত থাকলেও সময়ের পালাবদলে রিয়্যালিটি শো কিংবা অনলাইনে গান প্রকাশের রীতি শুরু হলে সবকিছু থেকে ক্রমশ দূরে সরে যান এই শিল্পী। আর তাতে মিশে ছিল একরাশ অভিমান।

বিরতিতে যাওয়ার প্রসঙ্গে মনি কিশোর বলেছিলেন, ‘কিছুটা অভিমান তো ছিলই। কথাটা সত্য হলেও বলতে হয়। অনেকই মনোক্ষুণ্ন হবেন। যেদিন থেকে দেখেছি যে, ভোট দিয়ে গানের শিল্পী বানানো হচ্ছে, সেদিন থেকে বুঝতে পেরেছি গানবাজনা আর গুরুবিদ্যার মধ্যে নেই। ভোট দিয়ে তো মেম্বার, চেয়ারম্যান, এমপি বানানো যায়। পৃথিবীর কোথাও কি ভোট দিয়ে শিল্পী বানানো যায়? আমি ১৫ বছর খ্যাতিমান গীতিকার সুরাকার প্রণব ঘোষের শিষ্য ছিলাম। চল্লিশ বছর সাধনায় আজকে আমি মনি কিশোর হয়েছি। যখন গানের দুরাবস্থা দেখেছি তখন আমার মনে হলো এ দলে আমি নামও লেখাবো না। গড্ডলিকা প্রবাহে আমি গা ভাসাতে রাজি নই। এ কারণে স্বেচ্ছায় গান থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিলাম। কেউ যেন আমার সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পারে সেজন্য পুরোনো সিমকার্ডগুলোও বন্ধ করে দিয়েছিলাম।’