ওজির জীবন ছিল ঘটনাবহুল, জড়িয়েছেন নানা বিতর্কেও

মঙ্গলবার (২২ জুলাই) পরপারে পাড়ি জমালেন ব্রিটিশ হেভি মেটালের জনক ওজি অসবোর্ন। তিনি ছিলেন রক ব্যান্ড ‘ব্ল্যাক সাবাথ’র ফ্রন্টম্যান, পরবর্তী সময়ে একক সংগীতজীবনেও খ্যাতি কুড়িয়েছেন, যা বিস্ময়করভাবে তাঁর ব্যান্ড ক্যারিয়ারকেও ছাপিয়ে গিয়েছিল। ভক্তদের কাছে তিনি ‘দ্য প্রিন্স অব ডার্কনেস’ ও ‘গডফাদার অব হেভি মেটাল’ হিসেবে পরিচিত। 

১৯৬৯-৭৯ সাল পর্যন্ত ইংল্যান্ডের বার্মিংহামভিত্তিক ব্যান্ড ব্ল্যাক সাবাথ’র প্রধান ভোকাল ছিলেন এই কিংবদন্তি, যাঁরা সেসময় নিজেদের গানে হেভি মেটালের চূড়ান্ত রূপ, লিরিকে মন্থনকারী শব্দ, ব্যক্তিজীবনের অন্তর্নিহিত অস্থিরতা ও বিশৃঙ্খলতার এক প্রতিচ্ছবি ফুটিয়ে তুলেছিলেন, পরবর্তী সময়ে যা কয়েক ডজন মেটাল ব্যান্ডকে প্রভাবিত করেছে।

ওজি অসবোর্নের জীবন ছিল ঘটনাবহুল। নানা কারণে বিতর্কেও জড়িয়েছেন এই শিল্পী। সারাজীবন তাঁকে অ্যালকোহল ও মাদকাসক্তির সঙ্গে লড়াই করতে হয়েছে। ১৯৮০ সালে ব্ল্যাক সাবাথ’র একটি কনসার্ট ঘিরে ভয়াবহ দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়েছিল।

কনসার্টে ওজি অসবোর্ন। ছবি: সংগৃহীত

সবচেয়ে কুখ্যাত ঘটনা ছিল—১৯৮১ সালে তাঁর প্রথম একক অ্যালবাম প্রচারের জন্য অনুষ্ঠিত একটি সভায় মাতাল অবস্থায় তিনি একটি জীবন্ত ঘুঘুর মাথা কামড়ে ধরেছিলেন, যা প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান সিবিএস রেকর্ডের নির্বাহীদের বেশ হতবাক করেছিল। এ ছাড়া ১৯৮২ সালে একটি কনসার্টে জীবন্ত বাদুড়ের সঙ্গেও একই কাণ্ড ঘটিয়েছিলেন, যে কারণে তাঁকে জলাতঙ্কের টিকা দেওয়ারও প্রয়োজন হয়েছিল।

২০১০ সালে প্রকাশিত নিজের আত্মজীবনী ‌‘আই অ্যাম ওজি’-তে সেই ঘটনা প্রসঙ্গে এই তারকা বলেন, ‘কেউ একজন একটা বাদুড় ছুড়ে মারল, আমার মনে হলো এটা রাবারের বাদুড়। আমি সেটা তুলে মুখে ঢুকিয়ে দিলাম। কামড় দিলাম।’

সংগীতের কল্পনার মতোই সহিংসতা ও ভৌতিকতার এক রাজ্যে যেন বাস ছিল ওজির! দ্বিতীয় স্ত্রী শ্যারন আরডেনের সঙ্গে তাঁর পারিবারিক কলহ লেগেই থাকত! মাঝেমধ্যেই তা ট্যাবলয়েডের শিরোনাম হয়ে দাঁড়াত। এমনকি ১৯৮৯ সালে এক ঝগড়ার পর হত্যা চেষ্টার অভিযোগে ওজিকে গ্রেপ্তার করা হয়। তবে দিনশেষে এই দম্পতিকে ফের একই ছাদের নিচে দেখা যেত।

ব্ল্যাক সাবাথ ব্যান্ডে ওজি অসবোর্ন, বিল ওয়ার্ড, টনি ইওমি ও টেরেন্স বাটলার। ছবি: সংগৃহীত

১৯৪৮ সালের ৩ ডিসেম্বর বার্মিংহামের এক শ্রমজীবী পরিবারে জন্ম ওজির। পারিবারিক নাম জন মাইকেল অসবোর্ন। মাধ্যমিক স্কুলে পড়ার সময় তিনি অপেরাতে সংগীত পরিবেশন করতেন। ‌‘বিটলস’র খুব ভক্ত ছিলেন। ১৫ বছর বয়সে স্কুল ছেড়ে দেওয়ার পর ওজি ছিলেন একজন কায়িক শ্রমজীবী। সেসময়ে তিনি ছোটখাটো অপরাধে জড়িয়ে পড়েন। একবার চুরির অভিযোগে ছয় সপ্তাহ জেল খাটেন।

তবে এসব বিতর্ক ছাপিয়ে শ্রোতাদের কাছে পৌঁছে গিয়েছিল ওজির গান। মাত্র ১৯ বছর বয়সে বেজিস্ট টেরেন্স ‘গিজার’ বাটলারের সঙ্গে স্থানীয় একটি ব্যান্ডে ভোকালিস্ট হিসেবে কাজ করেন। রূপকথার মতো কিছুদিনের মধ্যেই তাঁদের সঙ্গে যোগ দেন গিটারিস্ট টনি ইওমি ও ড্রামার বিল ওয়ার্ড। যাঁরা প্রাথমিকভাবে ‘আর্থ’ নামে পরিচিত ছিলেন, পরে ১৯৬৩ সালে ইতালীয় নির্মাতা মারিও বাভার পরিচালিত একটি সিনেমার নাম অনুসারে তাঁরা ‘ব্ল্যাক সাবাথ’ নামটি বেছে নেন। ১৯৭০ সালে নিজেদের ব্যান্ডের নামেই প্রকাশিত হয় তাঁদের প্রথম অ্যালবাম।

ব্যান্ডটির দ্রুত রেকর্ড করা এবং প্রকাশিত দ্বিতীয় অ্যালবাম ছিল ‘প্যারানয়েড’, যা তাঁদেরকে আটলান্টিক মহাসাগরের উভয় পাড়ের মানচিত্রে জায়গা করে দেয়। ব্রিটিশ টপ চার্টের শীর্ষে উঠে আসে ব্ল্যাক সাবাথ’র গান। বাটলারের লিরিকে এই অ্যালবামে বেশ কয়েকটি হেভি-রিফিংয়ের গান ছিল। এর মধ্যে ‘ওয়ার পিগস’, ‘প্যারানয়েড’, ‘হ্যান্ড অব ডুম’ ও ‘আয়রন ম্যান’ শিরোনামের গানগুলো সবচেয়ে বেশি সমাদৃত হয়।  

ওজি অসবোর্ন ও শ্যারন আরডেন। ছবি: সংগৃহীত

সত্তর দশকের মাঝামাঝি সময়ে অসবোর্ন ও তাঁর ব্যান্ড সঙ্গীরা একরকম নির্বিকার জীবনযাপন করেন। ওজির অতিরিক্ত মাদক ও অ্যালকোহল সেবনের ফলে তাঁর প্রথম বিয়ে ভেঙে যায় (যে সময়ে তিনি কন্যা জেসিকা ও পুত্র লুইয়ের জন্ম দেন), এবং ব্যান্ডটির বাকি সদস্যরাও বিভিন্ন অপকর্মে জড়িয়ে পড়তে শুরু করেন।

১৯৭৯ সালে ব্যান্ড থেকে বেরিয়ে যান ওজি। পরবর্তী বছরে প্রকাশ পায় তাঁর প্রথম একক অ্যালবাম ‘ব্লিজার্ড অব ওজ’। অ্যালবামটির বিখ্যাত গান ‘ক্রেজি ট্রেন’ এখনও শ্রোতাদের মুখে মুখে। পরের বছর তিনি প্রকাশ করেন ‘ডায়েরি অব আ ম্যাডম্যান’, যার ৫০ লাখের বেশি কপি বিক্রি হয়েছিল। বলা যায়, একক শিল্পী হিসেবেও আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন তিনি।

২০০০-এর দশকে এমটিভির রিয়্যালিটি শো ‘দ্য অসবোর্ননাস’-এ ভিন্ন রূপে হাজির হন ওজি অসবোর্ন। যেখানে তিনি বলেছিলেন, ‘মঞ্চে আমি যা করি, সেটা শুধু একটা অভিনয়। আমি আসলে একান্তেই পারিবারিক মানুষ।’

সাম্প্রতিক বছরে পারকিনসন রোগে ভুগছিলেন ওজি। গত ৫ জুলাই অনুষ্ঠিত ‘ব্যাক টু দ্য বিগিনিং’ কনসার্টের মাধ্যমে সংগীতজীবন থেকে অবসরে যাওয়ার ঘোষণা দেন তিনি। যেখানে অনেকদিন পর ব্ল্যাক সাবাথ’র সদস্যরা একসঙ্গে মঞ্চে উঠেন। এ ছাড়া কিংবদন্তিকে শ্রদ্ধা জানিয়ে পারফর্ম করে মেটালিকা, গানস এন’ রোজেস, স্লেয়ার, টুল, প্যান্টেরা, অ্যালিস ইন চেইনস’সহ আরও কিছু ব্যান্ড। শেষ কনসার্টের মাত্র দুই সপ্তাহ পরই ঘটনাবহুল এই কিংবদন্তির জীবনাবসান ঘটে।

সূত্র: ভ্যারাইটি