দেশের জনপ্রিয় সাঁওতালী ব্যান্ড ‘সেঙ্গেল’। সম্প্রতি তাঁরা ‘বুরু চেতান’ শিরোনামের একটি নতুন গান প্রকাশ করেছে। ব্যান্ডটি মনে করে, ঝুমুর তালের শ্রুতিমধুর এই দেশাত্মবোধক গান নতুন প্রজন্মের কাছে বেশ সমাদৃত হবে।
বুরু চেতান গানটি লিখেছেন সাঁওতালদের জাতীয় সংগীতখ্যাত ‘বাংলাদিশাম মজ দিশাম’ গানের সুরকার ও গীতিকার রেভা. যোনা মূর্মূ। কথাগুলো এমন—‘বুরু চেতান চেতানতে হইতে লাড়াঃকান/ হইতে লাড়াঃকান হিপিড়ে হিপিড়/ আনজমপে হো তিরয়ো সাডেকান/ হইতে লাড়াঃকান হিপিড়ে হিপিড়’, যার বাংলা আভিধানিক অর্থ হচ্ছে—‘পাহাড়ের ওপর বাতাসে দোলে ঝিলিকে ঝিলিক, শোনো গো বাতাস বাাঁশির নিঠুর সুর তোলে।’
গীতিকার রেভা. বলেন, ‘একবার অফিসের কাজে বান্দরবান জেলার ফারুকপাড়া এলাকায় গিয়েছিলাম। গাড়ি থেকে নেমে দেখি চারদিকে অনেক পাহাড় এবং সেই পাহাড়ের চূড়ায় গাছ ও লতা-পাতা বাতাসে দুলছে। বাতাসের শঁ-শঁ শব্দ বাঁশির সেই মধুর আওয়াজের কথা মনে করিয়ে দেয়। ওই চিন্তা থেকেই আমি গানটি রচনা করি। বাংলাদেশ বেতারসহ বিভিন্ন সময় বিভিন্ন অনুষ্ঠানে পরিবেশিত হলেও গানটি নতুনভাবে রেকর্ডিং করেছে ব্যান্ড সেঙ্গেল। নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার এই প্রচেষ্টাকে সাধুবাদ জানাই। আমার রচিত গানকে তাঁরা নতুনভাবে তুলে ধরায় সম্মানিত বোধ করছি।’
সিলেট অঞ্চলের সাঁওতাল পল্লীতে চিত্রায়িত হয়েছে গানটির মিউজিক ভিডিও। সেঙ্গেল’র সদস্যদের ভাষ্য, ‘বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে প্রায় ৩৩টির অধিক জাতিগোষ্ঠীর বসবাস করে। তার মধ্যে সাঁওতাল, ওঁরাও, মুন্ডা, কোল, মাহলে তথা খেরোয়ালের মতো বৈচিত্র্যময় জাতিসত্তার বসবাস রয়েছে। তাঁদের রয়েছে নিজস্ব বৈচিত্র্যময় ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি, যা বাংলাদেশকে সাংস্কৃতিকভাবে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। এ ছাড়া সিলেট বিভাগে চা শ্রমিক হিসেবে এই বৈচিত্র্যময় জাতিসত্তার উপস্থিতি যুগ যুগ ধরেই লক্ষ্য করা যায়। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ৫৪-এর সাধারণ নির্বাচনে এমএলএ নির্বাচিত হয়েছিলেন সাঁওতাল জীবন মূর্মূ, যা হয়তো অনেকেই জানি না।’
যৌথভাবে তাঁরা আরও বলেন, ‘এসব জাতিগোষ্ঠীর জীবনযাপন এবং সংস্কৃতিগত বৈচিত্র্য আমাদের সমাজসহ বৃহত্তর পরিসরে উপস্থাপনের যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। সেই বিবেচনা থেকেই আমরা গানটির ভিডিওচিত্র ধারণের ক্ষেত্রে সিলেট অঞ্চলকে বেছে নিয়েছি। আমরা চেষ্টা করেছি সিলেটে বসবাসরত আদিবাসীদের জীবন-চরিত্র ও জীবিকা তুলে ধরার। একইসঙ্গে পাহাড়-পর্বত, নদী-নালা, চা বাগানসহ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সঙ্গে এসব বৈচিত্র্যময় জাতিসত্তার মানুষদের শতবছরের যে নিবিড় সম্পর্ক, তা ভিডিওচিত্রে তুলে ধরার।’
গানটির ভিডিওতে প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেন আগস্টিন মূর্মূ ও শিখা ক্লারা টুডু। এ ছাড়া নৃত্যশিল্পী হিসেবে রয়েছেন সিলেটের স্থানীয় আদিবাসী শিল্পীরা। সম্প্রতি ব্যান্ডটির অফিশিয়াল ইউটিউব চ্যানেলে বুরু চেতান গানটি প্রকাশ পেয়েছে।
আগস্টিন মূর্মূ তাঁর অনুভূতি ব্যক্ত করে বলেন, ‘মিউজিক ভিডিওতে দেশপ্রেমের আবহে ভালোবাসার এক চমৎকার গল্প ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। আমরা শিল্পীরা সর্বোচ্চটা দেওয়ার চেষ্টা করেছি। বিশেষ করে সিলেট অঞ্চলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং স্থানীয় আদিবাসীদের জীবনযাত্রা ও সংস্কৃতির সংমিশ্রণ এই গানকে এক ভিন্ন মাত্রা ও সার্থকতা দান করেছে।’
মৌলভীবাজার আদীবাসী সাঁওতাল সমাজ কল্যাণ পরিষদের সভাপতি দুলাল হাঁসদা বলেন, ‘আমরা আনন্দিত যে, সেঙ্গেল তাঁদের গানের ভিডিওচিত্র ধারণের জন্য আমাদের এই অঞ্চলকে বেছে নিয়েছে। আমদের ছেলে-মেয়েরা গানটিতে অভিনয় করেছে, আমাদের গ্রাম ও ঘর-বাড়ির চিত্র ফুটে উঠেছে। সাঁওতালী গানে নিজেদের অঞ্চলকে দেখে আরও ভালোলাগা কাজ করছে।’
গানটিতে নৃত্যপরিচালনা করেছেন জনপ্রিয় আদিবাসী নৃত্যদল ‘রাহালা রিমিল’। ভিডিওগ্রাফি করেছে আর্ট এক্সপ্রেস। ঐতিহ্যবাহী সাঁওতাল পোশাক-পরিচ্ছেদের ক্ষেত্রে সহযোগিতা করেছে সানাম হেরিটেজ। মিউজিক ভিডিওর পৃষ্টপোষকতায় রয়েছে গ্রাম বিকাশ কেন্দ্র, ত্রিসূল সমাজকল্যাণ সংস্থা, এমএইচ এগ্রো ও সান্তালী ক্যানভাস। প্রযোজনা করেছে শোফার স্টুডিও।
সেঙ্গেল ব্যান্ডের বর্তমান সদস্যরা হলেন রিংকু ইমানূয়েল মার্ডী (ভোকাল), হিমসন কিস্কু (ভোকাল ও গিটার), কামেল মার্ডী (দোতরা ও বাঁশি), শিমুল মার্ডী (মাদল ও ঢোল), ইলিয়াস মুর্মু (ড্রামস), শ্যামল হেমব্রম (বাঁশি) ও জন হেমব্রম (গিটার)। এ ছাড়া ব্যান্ডটির সঙ্গে সম্পৃক্ত রয়েছেন কাঞ্চন সরেন (কি-বোর্ড), ডেলিয়েন্স সুকমল হাঁসদা (রাহাড় ও টামাক)।
প্রসঙ্গত, মাদল ও নাগড়ার আওয়াজ শোনা গেলেই দু’চোখে ভেসে উঠে একদল সাঁওতাল রমনী কোমর বেঁধে কোনো এক সুরেলা গানে নাচছেন আর তরুণেরা হাততালি-বাঁশি বাজিয়ে আনন্দে মেতেছেন—এ যেন এক নির্মোহ আনন্দঘন মুহূর্ত। ঠিক এমন একটি পরিবেশ থেকেই সাঁওতালী গানের ব্যান্ড সেঙ্গেলের যাত্রা শুরু। বর্তমানে তাঁরা সাঁওতাল তরুণ-তরুণী ও প্রবীণদের মনে এক শিহরন জাগানো নাম।