গল্পের শুরুতেই দেখা যায়, ২০০১ সালে ভারতের কাল্পনিক জায়গা নির্মল প্রদেশের এক গ্রামে বিয়ে হচ্ছে নবদম্পতির। কনের নাম ফুল, আর বরের নাম দীপক। বিয়ে শেষ করে বরের এবার বাড়ি ফেরার পালা। মা তার মেয়ের মাথায় লম্বা করে ঘোমটা টেনে দেন। স্বাভাবিকভাবেই ঘোমটার কারণে সামনে দেখতে পায় না ফুল। রাস্তায় হোঁচট খায় সে। তখন মায়ের সাবধানবাণী—‘বিয়ের পর ঘোমটা দিয়ে সামনে দেখতে হয় না, নিচের দিকে তাকিয়ে হাঁটতে হয়।’ সাইকেল, বাস, নৌকা এবং এরপর ট্রেন—সদ্য বিবাহিত এ যুগলের বাড়ি ফিরতে পাড়ি দিতে হবে দীর্ঘপথ। ঘটনার সূত্রপাত হয় এখানেই। ট্রেনের যে বগিতে ফুল ও দীপক ওঠে, সেখানে আরও দুই নবদম্পতি বসে আছে। সবার পরনে একই রকম পোশাক এবং লম্বা ঘোমটা টানা। সমাজের প্রচলিত রীতি অনুযায়ী বিয়ের পর মেয়েদের ঘোমটা টেনেই থাকতে হয়। আর বিপত্তিটা সেখানেই! মাঝরাতে বদল হয়ে যায় দীপকের বউ। জয়া ওরফে পুষ্প নামের আরেক নববধূকে নিয়ে ট্রেন থেকে নেমে পড়ে সে। অন্য বরের সঙ্গে ভুল স্টেশনে নেমে পড়েছে—এই ভেবে প্রথমে খানিকটা দ্বিধান্বিত থাকলেও পরে সোজা তার সঙ্গেই পা বাড়ায় পুষ্প! দীপকের সাথে হাজির হয় তার বাড়িতে। আর ঘুমাতে থাকা ফুল চলে যায় অজানা এক স্টেশনে।
এদিকে বউ হারিয়ে পাগলপ্রায় দীপক। সে তার ভালোবাসার মানুষটিকে খুঁজতে হাজির হয় থানায়। সেখানে দুর্নীতিবাজ এক পুলিশ তার কেসটি হাতে নেয়। পুলিশের হাতে একমাত্র সূত্র ফুলের একটি ছবি। তবে সেখানেও ঘোমটা লম্বা করে টানা থাকায় দেখা যায় না তার চেহারা। তাই দীপকের হারিয়ে যাওয়া সত্যিকারের বউ খুঁজে বের করাটা যেন অন্ধকারে সুই খুঁজতে থাকার মতোই। ‘লাপাতা লেডিস’-এর গল্প বলাটা আপাতত এখানেই থামাই। নইলে সিনেমার পুরো গল্পটাই যে বলা হয়ে যাবে!
এই সিনেমার সবচাইতে জরুরি বিষয় হচ্ছে, ভারতবর্ষে চলে আসা কিছু সামাজিক ও পারিবারিক নিয়মরীতিকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়া যে, এগুলো কতটা সমস্যা সৃষ্টিকারী। সিনেমাটিতে গল্পের বাঁকে বাঁকে বের হয়ে আসে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের অত্যাচারের চিহ্ন। নিয়মের বেড়াজালে আঁটকে রেখে নারীদের কূপমণ্ডুক বানানোর প্রক্রিয়াও দেখানো হয়। গল্পের ছলে যৌতুক প্রথা, নারী নির্যাতন ও কুসংস্কারের মতো বিষয়গুলোকে দেওয়া হয়েছে খোঁচা। উঠে এসেছে পুরুষতন্ত্রের সাথে লড়াই করে নারীদের স্বাবলম্বী হওয়ার পথ।
সিনেমাটির গল্প লিখেছেন বিপ্লব গোস্বামী। এর চিত্রনাট্য লিখেছেন স্নেহা দেশাই। নির্দেশনায় আছেন কিরণ রাও। সিনেমাটি প্রযোজনা করেছে আমির খান প্রোডাকশনস। এই সিনেমার জন্য কলাকুশলীদের শুধু ধন্যবাদ দিলে ছোট করা হবে। চিত্রনাট্য, সংলাপ, নির্দেশনা, অভিনয়, চিত্রগ্রহণ ও প্রোডাকশন ডিজাইন মিলিয়ে সিনেমাটিতে এক অভূতপূর্ব গল্পের উপস্থাপন করা হয়েছে। গল্পের টাইটেল কার্ড, আবহ ও সম্পাদনায় ছিল যত্নের ছাপ। বলা যেতে পারে এই গল্পের সংকট ও সমাধান সহজেই অনুমেয়। তবে সহজ গল্প বলাই যেন এই ছবির শক্তি।
সিনেমাটিতে দুর্দান্ত ছিলেন অভিনয়শিল্পীরা। দীপক চরিত্রে স্পর্শ শ্রীবাস্তব, জয়া চরিত্রে প্রতিভা রত্না এবং ফুল চরিত্রে নিতাংশী গোয়েল ছিলেন সাবলীল। আর বাকি চরিত্রদের মধ্যে আলো ছড়িয়েছেন দুর্নীতিবাজ দারোগার চরিত্রে রবি কিষেণ। সবচেয়ে বেশি মুগ্ধতা ছড়িয়েছেন স্টেশনের বৃদ্ধা মঞ্জু চরিত্রে ছায়া কদম। কারো অভিনয়ে ছিল না বাড়তি মেদ।
সব শেষে বলতে হয় এই গল্পে দুই নারী চরিত্রের হারিয়ে যাওয়া আসলে নিজেদেরকেই খুঁজে পাওয়া। বাবার বাড়ি, শ্বশুরবাড়ি, রান্নাঘর ও স্বামী–সন্তানের বাইরে নারীদের লম্বা ঘোমটা তুলে সামনে তাকানোর শক্তি জোগায় এই সিনেমা। তাই আত্মবিশ্বাসের সাথে বলা যায়, বৃথা যাবে না ওটিটি প্ল্যাটফর্ম নেটফ্লিক্সে কাটানো আপনার ২ ঘন্টা ৪ মিনিট।
রেটিং: ৪.৫/৫
পরিচালক: কিরণ রাও
গল্প ও চিত্রনাট্য: বিপ্লব গোস্বামী ও স্নেহা দেশাই
অভিনয়শিল্পী: স্পর্শ শ্রীবাস্তব, প্রতিভা রত্না, নিতাংশী গোয়েল, রবি কিষাণ, ছায়া কদম, দুর্গেশ কুমার
ধরন: কমেডি, ড্রামা
সময়: ২ ঘণ্টা ৪ মিনিট
মুক্তি: ১ মার্চ ২০২৪
ওটিটিতে মুক্তি: ২৬ এপ্রিল ২০২৪
লেখক: সাংবাদিক