কিন্তু এত কিছুর ভিড়েও হাতেগোনা কয়েকটি সিনেমা পাওয়া যায়, যেগুলোতে ওপরের বিষয়গুলোর সবই থাকে অনুপস্থিত। বরং সিনেমাটি দেখে শেষ করার পর এক অদ্ভুত ভালোলাগায় মন ভরে থাকে!
সিনেমাটির গল্পের শুরুটা খুবই সাধারণ। এক আটপৌরে বিবাহিত গৃহিণীর রোজকার জীবন দিয়ে শুরু হয় সিনেমা। ইরাবতী নামের ওই চরিত্রটিকে ঘটনাক্রমে যেতে হয় বাড়ি থেকে দূরের শহরে, বোনের কাছে। বোনটি হাসপাতালে ভর্তি, অনাগত সন্তান আসি আসি করছে। এমন পরিস্থিতিতেই ইরাবতীকে মেট্রোরেলে নিয়মিত চড়ার মতো অবস্থায় পড়তে হয়, যোগাযোগের সুবিধার্থেই। তবে ট্রেনযাত্রা নিয়ে বেশ ট্রমা আছে ইরাবতীর। মেট্রোরেলের স্টেশনেও তার মুখোমুখি হতে হয় তাঁকে, ঘিরে ধরে প্যানিক অ্যাটাক। ঠিক যে সময়টায় ইরাবতীর সব কিছু ভেঙে পড়ার মতো অবস্থা, অন্যদিকে মেট্রোও ছেড়ে দেবে দেবে করছে, ঠিক সেই সময়টায় ইরাবতীর দিকে এগিয়ে এল একজনের সাহায্যের হাত। প্রীতম নামের অপরিচিত ওই ব্যক্তিটির কথাতেই শেষ পর্যন্ত সাহস করে মেট্রোরেলে চেপে বসে ইরাবতী। আর এভাবেই শুরু এক নতুন সম্পর্কের পথচলা। এই সম্পর্কের কার্যকারণ কেবলই যেন মেট্রোরেল!
এ সিনেমার প্রধান দুটি চরিত্র হলো ইরাবতী ও প্রীতম। দুটি চরিত্রে যথাক্রমে অভিনয় করেছেন সাইয়ামি খের ও গুলশান দেবাইয়াহ। সাইয়ামি খুবই ভালো অভিনয় করেছেন। অত্যন্ত সাধারণ একটি চরিত্রকে অসাধারণ দক্ষতায় পর্দায় ফুটিয়ে তুলেছেন তিনি। আর গুলশান ছিলেন এক কথায়, দুর্দান্ত। এর আগেও বিভিন্ন সিরিজ ও সিনেমায় তিনি নিজের সক্ষমতার জানান দিয়েছিলেন। তবে ‘এইট এ.এম. মেট্রো’তে আগে দেখানো দক্ষতার সীমানা তিনি অতিক্রম করে গেছেন। একজন নিভৃতচারী অথচ মানুষের সঙ্গের জন্য কাঙাল একটি চরিত্রকে তিনি একেবারে নিখুঁতভাবে তুলে ধরেছেন। এই প্রীতম হাসতে চায়, কিন্তু কান্না ছাড়া যে তাঁর আর কিছুই অবশিষ্ট নেই।
মানুষের জীবনে আসলে কী থাকে? কিছু সুখ, কিছু দুঃখ, কিছু পাওয়া, কিছু না পাওয়া, কিছু আশা–হতাশা—সব মিলিয়ে কেবলই যোগ আর বিয়োগের খেলা। এই কিছু যোগ হলো, তো পরক্ষণেই হারিয়ে ফেলা হয় অনেকটা। অথচ ফ্ল্যাশব্যাকে জীবনটাকে দেখলে মনে হবে, আমাদের দুঃখের কারণ আসলে আমরা নিজেরাই! কারণ জীবনের উপাদানগুলোকে যে থাকা অবস্থায় আমরা গুরুত্ব দিতে চাই না। হারানোর পরই কেবল বুঝতে পারি, কী গেল! এমন অবস্থায় কেউ যদি নিজের জীবনটাকে কল্পনাতেও অন্যভাবে সাজাতে চায়, আগের ভুলগুলো শুধরে নিতে চায়, তবে কি তাকে দোষ দেওয়া যাবে? পাগল বলা যাবে? আচ্ছা, বুকে হাত দিয়ে বলুন তো, এমনটা কে না চায়!
সিনেমায় গুলজারের লেখা বেশ কিছু কবিতার পাঠ আছে। সেসব কবিতা দেয় বাড়তি এক আনন্দ। এই সিনেমা দেখে একজন দর্শক যেমন মুচকি হাসবেন, তেমনি চোখের কোণে জলও জমা হবে। আর শেষ করার পর মনে মিলবে এক দারুণ সন্তুষ্টি। এমন মনোমুগ্ধকর গল্পের দুরন্ত চিত্রায়ন সিনেমার পর্দায় যে খুব কমই মেলে!
রেটিং: ৪.৬/ ৫.০০
পরিচালক: রাজ রাচাকোনডা
গল্প ও চিত্রনাট্য: শ্রুতি ভাটনগর,আসাদ হোসেন, রাজ রাচাকোনডা ও মৈত্রী শেখর
অভিনয়শিল্পী: সাইয়ামি খের, গুলশান দেবাইয়াহ, সন্দীপ ভরদ্বাজ প্রমুখ
ভাষা: হিন্দি
ধরন: ফ্যামিলি ড্রামা
মুক্তি: ১০ মে ২০২৪, জি ফাইভ
লেখক: সাংবাদিক ও চলচ্চিত্র সমালোচক