পশ্চিমবঙ্গের প্রেক্ষাগৃহে আজ মুক্তি পেল প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় অভিনীত চলচ্চিত্র ‘অভিমান’। যেখানে ‘রকস্টার আকাশ চ্যাটার্জি’র ভূমিকায় রয়েছেন এই টলিউড মেগাস্টার। তবে সিনেমাটি মুক্তি পেতেই তাঁর বিরুদ্ধে উঠল গুরুতর অভিযোগ! প্রসেনজিতের বিরুদ্ধে অভিমান সিনেমার ‘ভাবনা ও চরিত্র চুরি’র অভিযোগ এনে বিস্ফোরক ‘কাদম্বরী’ নির্মাতা সুমন ঘোষ। একাধিক ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এই খবর জানিয়েছে।
এই নির্মাতার দাবি, গত আড়াই বছর ধরে তিনি এমন একটি চিত্রনাট্য নিয়ে প্রসেনজিতের সঙ্গে আলোচনা করেছিলেন, তার সঙ্গে অভিমান’র রকস্টার আকাশ চ্যাটার্জির অনেকটাই সাদৃশ্য রয়েছে।
ইতিম্যধ্যেই প্রসেনজিতকে ই-মেইলের মাধ্যমে নিজের অভিযোগ তুলে ধরেছেন সুমন। বিষয়টি সামাজিকমাধ্যমেও তিনি শেয়ার করেছেন। তাঁর দাবি, অভিমান ছবিতে প্রসেনজিতের চরিত্রায়ন তাঁর পরিকল্পিত ছবির গুরুত্বপূর্ণ অংশের সঙ্গে মিল রয়েছে। যদিও অভিমান ছবির নির্মাতা ইন্দ্রদীপ দাশগুপ্তের বিরুদ্ধে তাঁর কোনো অভিযোগ নেই, তিনি শুধু মনে করেন প্রসেনজিৎ বিষয়টি তাঁকে জানাতে পারতেন।
এ ছাড়া সুমন যেহেতু অভিমান ছবিটি এখনও দেখেননি, তাই দর্শকদের এই নিয়ে বিচার করার আহ্বান জানিয়েছেন। একইসঙ্গে তাঁর দাবি ভুল প্রমাণিত হলে তিনি ক্ষমা চাইবেন বলেও জানিয়েছেন।
প্রসেনজিতকে ই-মেইলে কী লিখেছেন সুমন
ই-মেইলে প্রসেনজিতকে সুমন লিখেছেন, ‘প্রিয় বুম্বাদা, অত্যন্ত ভারী মন নিয়ে তোমায় এই চিঠি লিখছি। শিল্পের সততা ও নৈতিকতা নিয়ে এমন কিছু প্রশ্ন বুকে চেপে বসেছে, যা আমার মতো একজন স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতাকে বিচলিত করছে। সৃজনশীলতা বা শিল্পের মূল ভিত্তি কী? শুধুই একটা চূড়ান্ত সৃষ্টি, নাকি সেই সৃষ্টি তৈরি হওয়ার পেছনের পারস্পরিক বিশ্বাস, সততা ও নৈতিকতা?’
এরপর সরাসরি প্রসেনজিতের দিকে আঙুল তুলে সুমন লেখেন, গত আড়াই বছর ধরে তিনি ‘স্টার’ নামে একটি চিত্রনাট্য তৈরি করেছেন, যেখানে কেন্দ্রীয় চরিত্রের জন্য শুরু থেকেই প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়কে ভেবেছেন। এরইমধ্যে তাঁদের একাধিক বৈঠক হয়েছে এবং চরিত্রটির বিভিন্ন দিক, লুক ও গল্পের উপাদান নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। কিন্তু অভিমান’র টিজার ও ট্রেলারে তিনি তাঁর পরিকল্পিত চরিত্রের সঙ্গে একাধিক বিস্ময়কর মিল খুঁজে পেয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে একজন সুপারস্টারের দুই ভিন্ন বয়সের রূপ, তার হঠাৎ অন্তর্ধান, নির্জন ও ভগ্নপ্রায় পরিবেশে বসবাস, শারীরিক ও মানসিক অবক্ষয়ের চিত্র, নিজের অতীত সত্তার প্রতীক ধ্বংস করা এবং একজন বিশ্বস্ত ম্যানেজারের উপস্থিতি।
নির্মাতার দাবি, গল্প আলাদা হলেও চরিত্রায়নের সাদৃশ্য তাঁর দীর্ঘদিনের সৃজনশীল পরিশ্রমকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। তাঁর অভিযোগ মূলত আইনি বা কপিরাইট সংক্রান্ত নয়, বরং শিল্পীসুলভ সততা, বিশ্বাস ও পেশাগত নৈতিকতার বিষয়ে। সুমন মনে করেন, একজন অভিনেতার সঙ্গে দীর্ঘ সময় ধরে শেয়ার করা ‘সৃজনশীল ভাবনা’র প্রতি ন্যূনতম সম্মান দেখানো উচিত ছিল। এই ঘটনা ভবিষ্যতে নতুন নির্মাতাদের শিল্পী ও প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিত্বদের প্রতি আস্থা নষ্ট করতে পারে বলেও তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
প্রসেনজিৎকে সরাসরি প্রশ্ন রাখলেন সুমন, ‘‘যদি ধরেও নিই এগুলো কেবলই কাকতালীয়, তবুও তোমার তো ‘স্টার’-এর স্ক্রিপ্টটি প্রায় মুখস্থ ছিল। বিবেকের কাছে একবারও কি মনে হলো না যে আমাকে অন্তত জানানো উচিত ছিল?’’
এখানেই থেমে থাকেননি সুমন! তিনি বলেন, ‘এই ইন্ডাস্ট্রির বহু নামী এবং কিংবদন্তি শিল্পীর সাথে আমার কাজ করার সৌভাগ্য হয়েছে—যেমন সৌমিত্রকাকু, মিঠুনদা, শর্মিলা ঠাকুর বা অপর্ণা সেন। তাঁদের কাছ থেকে প্রফেশনাল এথিক্স শেখা উচিৎ। তাঁদের কারও কাছ থেকে এমন আচরণ অবিশ্বাস্য। তাই তোমার মতো একজন সিনিয়র অভিনেতার কাছ থেকে এই চরম অসৌজন্যমূলক উপেক্ষা এবং অনৈতিক আচরণ অত্যন্ত বেদনাদায়ক।’
ই-মেইলের শেষে লেখা হয়েছে, ‘যদি ইন্ডাস্ট্রিতে দীর্ঘ সময় ধরে থাকা একজন মানুষের সাথে এমন আচরণ হতে পারে, তবে নতুন যে ছেলেমেয়েরা শুধু গল্প বলার স্বপ্ন নিয়ে এই ইন্ডাস্ট্রিতে পা রাখছে, তারা কি আর প্রসেনজিৎ চ্যাটার্জিদের ওপর ভরসা রাখতে পারবে? …কোনো শিল্পীর নিষ্ঠা ও ডেডিকেশনকে যেন এভাবে অবহেলা না করা হয়। শিল্প টিকে থাকে সততায়, ক্ষমতার দম্ভে নয়। তোমার পদ্মশ্রীর যথার্থ মর্যাদা যেন অক্ষুণ্ন থাকে। তোমার নতুন ছবির জন্য শুভকামনা রইল। হোক না তা অনৈতিকতার ওপর দাঁড়িয়ে।’
সুমনের অভিযোগে যা বলছেন প্রযোজকরা
সুমনের অভিযোগের পাল্টা জবাব দিয়েছেন অভিমান ছবির প্রযোজকরা। যিশু সেনগুপ্ত ও সৌরভ দাসের প্রযোজনা সংস্থা হোয়াই সো সিরিয়াস ফিল্মসের পক্ষ থেকে একটি বিবৃতি দেওয়া হয়েছে। সেখানে তাঁরা স্পষ্ট জানিয়েছেন, অভিমান’র গল্পটি মৌলিক। সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র কাহিনি নিয়েই ছবিটি তৈরি করেছেন তাঁরা।
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, অভিমান-এর মূল ভাবনাটি যিশুর, সেখান থেকে চিত্রনাট্য ও সংলাপ তৈরি করেছিলেন শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায় এবং পরিচালক ইন্দ্রদীপ দাশগুপ্ত। তবে সেই বিবৃতিতে কোথাও প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় বা সুমন ঘোষের নাম উল্লেখ করা হয়নি।
ছবি মুক্তির দিনেই এমন অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে প্রযোজকদের আহ্বান, দর্শকরা যেন ছবিটি দেখতে আসেন এবং দেখে নিজেরাই বিচার করেন।
প্রসঙ্গত, শুক্রবার (১৯ জুন) সকালে নির্মাতা সুমন ঘোষের এক ফেসবুক পোস্ট ঘিরে মূলত এই বিতর্কের শুরু। সিনেমাটির ট্রেলার দেখে পরিচালক জানান, গত আড়াই বছর ধরে তিনি যে ভাবনা নিয়ে প্রসেনজিতের সঙ্গে আলোচনা করেছেন, অভিমান’র মুখ্য চরিত্রে তারই প্রতিফলন দেখা গেছে। এর জন্য অবশ্য অভিমান’র নির্মাতাকে নয়, সরাসরি প্রসেনজিৎকেই দায়ী করেছেন সুমন! এবার তারই জবাবে প্রযোজকদের পক্ষ থেকে বিবৃতি দিয়ে অভিযোগ অস্বীকার করা হলো।