বায়ুদূষণের কারণে প্রতিদিনই ঘটছে প্রাণহানির ঘটনা। ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব হেলথ মেট্রিক্স অ্যান্ড ইভালুয়েশনের সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, ২০২১ সালে বিশ্বব্যাপী বায়ুদূষণের কারণে ৪৭ লাখ মানুষের অকালমৃত্যু হয়ছে। এই সংখ্যা সবমিলিয়ে ডিমেনশিয়া, সড়ক দুর্ঘটনা, ম্যালেরিয়া এবং আত্মহত্যার কারণে হওয়া মৃত্যুর সমান।
সড়কে যানজট দূষিত বাতাসের অন্যতম কারণ। উদাহরণস্বরূপ লন্ডনে ঘরের বাইরে যে ধূলিকণা, এর ৬০ শতাংশের জন্যই দায়ী এটি। বৈদ্যুতিক যানবাহন অপেক্ষাকৃত বেশি পছন্দ করে মানুষ। কারণ এগুলো পরিষ্কার, টেকসই শক্তির উৎস দ্বারা চালিত হতে পারে এবং পেট্রোল ও ডিজেল গাড়ির বিপরীতে কোনো নিষ্কাশন ধোঁয়া উৎপন্ন করে না। তবে এসব গাড়ি সাধারণ অন্যান্য দূষণকারী পদার্থ নির্গত করে। নিষ্কাশন থেকে নয়, বরং ব্রেক, টায়ার এবং রাস্তা থেকে উৎপন্ন ধূলিকণার মাধ্যমে এগুলো হয়ে থাকে। এগুলো জনস্বাস্থ্যের জন্য সম্ভাব্য উল্লেখযোগ্য পরিণতি ঘটাতে পারে।
সবচেয়ে বিপজ্জনক ধূলিকণা হলো ২.৫ মাইক্রনের চেয়ে ছোট ব্যাসের কণা, যা ফুসফুসে প্রবেশ করে এবং রক্তপ্রবাহের মাধ্যমে অন্যান্য অঙ্গে পৌঁছায়। এই ধরনের ধুলো হৃদরোগ, স্ট্রোক, ফুসফুসের রোগ এবং ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। ব্রিটিশ সরকারের পরিসংখ্যান অনুসারে, টায়ার, ব্রেক প্যাড এবং রাস্তার ধীরে ধীরে ভাঙনের ফলে আসে বড় পরিমাপের ধূলিকণা।
গত ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত সাউদাম্পটন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের একটি গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা গেছে, কিছু ব্রেক-প্যাডের ধুলো ডিজেলের ধোঁয়ার কণার তুলনায় মানুষের ফুসফুসের কোষের জন্য বেশি ক্ষতিকর বলে মনে হয়। এর কারণ, এর মধ্যে উচ্চ মাত্রার তামা থাকে, যা কোষ এবং ডিএনএর ক্ষতি করতে পারে। যদিও পরিসংখ্যানটি অস্পষ্ট। তবে বিজ্ঞানীরা অনুমান করেন, বৈদ্যুতিক গাড়ি অন্যান্য গাড়ির তুলনায় এই নন-এক্সস্ট কণাগুলো বেশি উৎপন্ন করে। এর কারণ হলো এর ব্যাটারিগুলো এগুলোকে ভারী করে তোলে, যার ফলে তারা আরও ঘর্ষণ তৈরি করে।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেটা সায়েন্টিস্ট হান্না রিচির মতে, ২০২৩ সালে একটি বৈদ্যুতিক গাড়ির গড় ওজন ছিল ২১৩৩ কেজি, যেখানে ব্রিটেনে নিয়মিত গাড়ির ওজন ছিল প্রায় ১৫০০ কেজি এবং আমেরিকায় ১৮০০ কেজি। গাড়িগুলো বড় হতে থাকলে, সেগুলো আরও দূষণকারী হয়ে উঠবে।
যদিও বৈদ্যুতিক যানবাহন আপনার ধারণার চেয়ে বেশি নোংরা হতে পারে, তবুও এগুলো অন্যান্য গাড়ির তুলনায় বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কম দূষণকারী। এর আংশিক কারণ হলো এতে রিজেনারেটিভ ব্রেকিং নামক একটি অতিরিক্ত ব্রেকিং সিস্টেম ব্যবহার করা হয়। যখন চালক প্যাডেল থেকে পা সরিয়ে নেন, তখন গাড়ির ক্রমাগত সামনের দিকের গতি ব্যাটারি রিচার্জ করার জন্য সংগ্রহ করা হয়, যার ফলে গাড়ির গতি কমে যায়। এই সিস্টেমটি ব্রেক প্যাড থেকে স্বাধীনভাবে কাজ করে, সম্ভাব্যভাবে নির্গমনের একটি উৎসকে নির্মূল করে।
২০২১ সালের একটি গবেষণায় অনুমান করা হয়েছে, যখন সমস্ত ব্রেকিংয়ের জন্য রিজেনারেটিভ ব্রেকিং ব্যবহার করা হয়, তখন বৈদ্যুতিক বাহন শহুরে রাস্তায় প্রতি কিলোমিটারে প্রতি গাড়িতে মোট প্রায় ১৪ মিলিগ্রাম সূক্ষ্ম কণা উৎপন্ন করে। যেখানে পেট্রোল গাড়িগুলও প্রায় ১৮টি এবং ডিজেল গাড়িগুলো ২০টি (এক্সহস্ট সহ) কণা উৎপন্ন করে।
বৈদ্যুতিক যানবাহন থেকে হওয়া বায়ুদূষণ রোধে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে। টেলপাইপের ধোঁয়ার মতো নন-এক্সস্ট নির্গমন নিয়ন্ত্রণ করা মানুষের স্বাস্থ্যের ক্ষতি কমানোর একটি উপায় হবে। ছোট গাড়ি ব্যবহারের বিবেচনা করতে মানুষকে উৎসাহিত করা আরেকটি উপায় হবে। বিশাল গাড়ি সড়ক নিরাপত্তার জন্য বিপজ্জনক এবং বেশিরভাগ মানুষের কখনই বড় গাড়ির ব্যাটারি যে অতিরিক্ত জায়গা লাগে এতে তার প্রয়োজন হবে না। পরিষ্কার বিদ্যুতে বৈদ্যুতিক যানবাহন চালানো নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।
তথ্যসূত্র: দ্য ইকোনোমিস্ট