বর্তমানে তথ্য–প্রযুক্তির যুগে পৃথিবী আমাদের হাতের মুঠোয়। এখন মোবাইল ফোন দিয়ে করা যায় না, এমন কাজের সংখ্যা খুব কম। কোনো জিনিসের উপস্থিতি বা অনুপস্থিতি যখন মানসিক অস্থিরতা তৈরি করে, তখনই সেটিকে ‘ফোবিয়া’ বলা হয়। ফোবিয়ায় ভয় যখন তীব্রমাত্রায় আতংকে রূপ নেয়, তখন দুশ্চিন্তায় স্বাভাবিক জীবনযাপনকে ব্যাহত হয়। মোবাইল ফোন নষ্ট হলে, হারিয়ে গেলে বা ফোনের চার্জ শেষ হয়ে গেলে মানুষের মধ্যে এক ধরনের অস্থিরতা দেখা দেয়। এসব লক্ষণে আক্রান্ত ব্যক্তিকে ‘নোমোফোবিয়ায় হিসেবে উল্লেখ করা যেতে পারে।
নোমোফোবিয়ার লক্ষণ
১. মোবাইল ফোন ব্যবহার করতে না পারলে দুশ্চিন্তা, ভয়, প্যানিক বোধ করা ।
২. মোবাইল ফোন বন্ধ রাখলে অথবা কিছুক্ষণের জন্য ব্যবহার করতে না পারলে উদ্বিগ্ন এবং অস্থির লাগা।
৩. ফোন খুঁজে না পেলে প্যানিক এবং দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হওয়া।
৪. মোবাইল ফোন ব্যবহার করতে না পারলে খিটখিটে মেজাজ, মানসিক চাপ বোধ করা এবং অস্থির আচরণ করা।
শারীরিক লক্ষণ
১. বুক চেপে ধরা।
২. দমটা আটকে থাকা।
৩. থরথর করে কাঁপা।
৪. ঘেমে যাওয়া।
৫. মাথা ঘুরে পড়ে যাওয়া
৬. মাথা ঝিমঝিম করা বা কিছু খেয়াল করতে না পারা।
৭. এলোমেলো চিন্তা করতে থাকা।
৮. বুক ধক ধক করা
৯. শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি দ্রুত হওয়া ইত্যাদি।
উল্লেখ্য, এ ক্ষেত্রে সবগুলো শারীরিক লক্ষণই যে থাকতে হবে তা কিন্তু নয়।
ছোটবেলায় আমরা একটা রচনা পড়েছিলাম, 'বিজ্ঞান আশীর্বাদ না অভিশাপ'। সেই ভাবনা দিয়ে বর্তমানে মোবাইল ফোনকে নিয়ে চিন্তা করা সময়ের দাবি। শুধু তাই নয়, মোবাইল ফোন কিন্তু আমাদের শিশুদের খেলার মাঠ থেকে ঘরে ঢুকিয়ে ফেলেছে। বন্ধুদের থেকে আলাদা করে দিচ্ছে। যতই আমরা খোলা মাঠ নেই বলে গলা শুকাই না কেন? বাসায় শিশুরা বেড়াতে আসলে কিন্তু প্রথমেই ইন্টারনেটের পাসওয়ার্ড খোঁজে। বর্তমানে শিশুরা মাঠ পেলে খেলতে যাচ্ছে কি?
কীভাবে বুঝবেন আপনি নোমোফোবিয়ায় আক্রান্ত
১. তীব্র ভয় পাবেন। ভয় না পাওয়ার কষ্ট কমাতে যেভাবেই হোক ফোনটা নিজের কাছে রাখাটা নিশ্চিত করবেন।
২. কেউ কেউ ফোন বিছানায় নিয়ে ঘুমায়, আবার বাথরুমেও নিয়ে যায়। এমনকি তীব্র মাত্রায় আক্রান্ত হলে ফোন গোসল করার সময় শাওয়ারের তলায়ও ধরে থাকে।
৩. ঘন ঘন ফোন দেখতে থাকা। যেন একটা নোটিফিকেশনও বাদ পড়ে না যায়।
৪. দিনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা মোবাইল ফোনে ব্যস্ত থাকা।
৫. ফোন ছাড়া নিজেকে অসহায় মনে করা।
৬. যে কোন মূল্যে মোবাইল ফোন হাতে, পকেটে বা কাছে রাখা নিশ্চিত করা।
কাদের বেশি হয়?
কিশোর–কিশোরী এবং তরুণ–তরুণীরা অধিক নোমোফোবিয়ায় আক্রান্ত হন।
কারণ কি?
এখনো পুরোপুরি কারণ বের করা যায়নি। ২০২০ সালের এক গবেষণায় বলা হয়েছে বিগত দশকের মোবাইল ফোনের ব্যবহার হওয়া এর একটি বড় কারণ।
কীভাবে কি হচ্ছে?
এখন মানুষ মোবাইল ফোনকে তীব্রভাবে আঁকড়ে ধরেছে। যার ফলে বারবার অযাচিতভাবে মোবাইল ফোন সংক্রান্ত চিন্তা এবং আচরণ তার সমস্ত কর্মকাণ্ডকে প্রভাবিত এবং ক্ষেত্র–বিশেষে নিয়ন্ত্রণ করছে।
কীভাবে হয়?
১. নিঃসঙ্গতা একটি বড় কারণ।
২. অন্যদের সঙ্গে মুখোমুখি দেখা করা বা যোগাযোগ যখন কমে যায়, তখন অন্যের সঙ্গে যোগাযোগের সহজতম মাধ্যম হয় ফোন।
৩. আত্মবিশ্বাসহীনতা এবং সামাজিক পরিবেশে মুখোমুখি যোগাযোগের অদক্ষতা।
৪. দিনের বেশিরভাগ সময় মোবাইলের স্ক্রিনে সময় দেওয়া। এখানে স্ক্রিন থেকে নির্গত ব্লু লাইট অ্যাডিকশন তৈরির সঙ্গে সম্পৃক্ত।
৫. আত্মবিশ্বাসহীন মানুষ মোবাইল ফোনের অগ্রহণযোগ্য ব্যবহারের মাধ্যমে সামাজিক মাধ্যমে স্বস্তি খুঁজছে। শুধু তাই নয়, যাদের অন্যান্য মানসিক ডিসঅর্ডার যেমন: সামাজিক ভয় বা দুশ্চিন্তা, প্যানিক ডিসঅর্ডার ইত্যাদি আছে তাদের মধ্যে নোমোফোবিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা অধিক।
জীবনানন্দ দাশ চমৎকার বলেছিলেন, ‘সব পাখি ঘরে আসে— সব নদী— ফুরায় এ জীবনের সব লেনদেন। থাকে শুধু অন্ধকার, মুখোমুখি বসিবার বনলতা সেন।’ আধুনিক নগরমুখী জীবন আমাদের এই মুখোমুখি বসিবার অবসরটুকু নিজের অজান্তেই অবচেতন মনে ছিনিয়ে নিচ্ছে। ইদানীং নিজের চোখের সামনে আয়না ধরলে, প্রায়শই নিজের জীবনযাপনের মান দিয়ে বুঝি, ব্যাপক মাত্রায় ডিজিটাল জীবনচর্চা, আমাদের জীবনকে দিয়েছে বেগ। কেড়ে নিয়েছে আবেগ।
লেখক: চিকিৎসক, কাউন্সেলর সাইকোথেরাপি প্র্যাকটিশনার, ফিনিক্স ওয়েলনেস সেন্টার বাংলাদেশ