'আমার সন্তানের কাছ থেকে মোবাইল ফোনটা কেড়ে নেওয়া মাত্রই অস্থির হয়ে পড়ে। বিশ্বাস করবেন না, পাগলের মতন ব্যবহার করতে থাকে। চিৎকার, চেঁচামেচি, কান্নাকাটি, ভাংচুর, কোনটা বাদ দেব? মাঝে মাঝে তো মনে হয় সে ড্রাগ এডিকশনে ভুগছে!' এসব কথা একজন মা ক্লান্ত গলায় বলেন।
অবশ্য তিনি নিজেই একজন চিকিৎসক। রাগ, দুঃখ ছাপিয়ে কেমন যেন একটা অসহায়ত্ব ফুটে উঠেছে তাঁর দুচোখে। সন্তানের কয়েকদিন পর পরীক্ষা। কিন্তু মোবাইল থেকে দূরে গেলেই ভয়ংকর আচরণ করছে।
এবার সন্তানের দিকে দৃষ্টি দিলাম। সে আমার দিকে স্থির হয়ে তাকিয়ে আছে। মনে হয় বুঝার চেষ্টা করছে আমি শত্রুপক্ষের কিনা। সে মোবাইল শক্ত করে ধরে আছে। মোবাইলটা অনেক দামি বুঝতে পারছি। হঠাৎ মনে হলো মোবাইল যত বেশি দামি, তত বেশি মোবাইল ফিচার, ততো বড় ফাঁদ।
আমি তাকে প্রশ্ন করলাম, 'তুমি কি আমার সঙ্গে কথা বলতে চাও? কথা দিচ্ছি তোমার কথা আমি কাউকে বলবো না। তোমার মায়ের সামনেই এ কথা বলছি। যদি সেলফ হার্ম বা নিজেকে আঘাত করার প্রবণতা না থাকে তাহলে আমাকে বলা একটা শব্দও তোমার অনুমতি ছাড়া কাউকে বলা হবে না। কিন্তু স্বচ্ছতার সঙ্গে আমাকে তোমার মনের সব কথা খুলে বলতে হবে। এই শর্তে রাজি থাকলে আমরা কথা বলা বা সেশন শুরু করতে পারি।'
সে কিছুক্ষণ স্থির চোখে আমার দিকে তাকিয়ে থাকল। বরং বলা যায় আমাকে মাপতে চেষ্টা করল। কিন্তু স্পষ্ট বুঝতে পারছি, তার চঞ্চল চোখের মণি খুব একটা ফোকাস করতে পারছে না। যদিও সে চাচ্ছে কোন এক ছুতোয় এই রুম থেকে বের হয়ে যেতে।
কিছুক্ষণ পর কিছুটা দ্বিধার সঙ্গে জবাব দিল, 'আচ্ছা'। আমি বললাম, 'তোমার যদি মনে হয়, আমার সঙ্গে কথা বলে ভালো লাগছে না তাহলে তুমি যেকোনো সময় আমাকে না বলতে পারবে। আমাকে থামতে বলতে পারো। কেমন?' এ কথা বলার পর দেখলাম সে কিছুটা আশ্বস্ত হয়েছে।
এবার মায়ের দিকে তাকিয়ে বললাম, 'আপনি কি রাজি?' মা বললেন, 'আমার তো বয়স হয়েছে। অনেক কষ্টে একে মানুষ করছি। সবসময় আমার এই সন্তানকে সেরা জিনিসটি দেওয়ার চেষ্টা করেছি। দেশে না পেলে বিদেশ থেকেও এনে দিয়েছি। কিন্তু এখন তার আচরণ আমি মেনে নিতে পারছি না। আপনি কিছু একটা করেন। যা বলবেন তাতেই আমার মত আছে।'
এবার আমি তার সন্তানের কাছে জানতে চাইলাম, 'মোবাইল ফোনটা হাতের কাছে না পেলে তোমার কি হয় বলা যাবে?' সে উত্তর দিল, 'ফোন হাতের কাছে না থাকলে আমার প্রচন্ড দুশ্চিন্তা হয়, তারপর এত ভয় হয় যে রীতিমতো প্যানিক অ্যাটাক হতে থাকে। তখন আমার পাগলের মতো লাগে। ভয়ংকর অস্থির লাগে। কেমন যে লাগতে থাকে আপনাকে ঠিক বুঝাতে পারবো না। আমার এই সমস্যাটা কেউ বুঝতে পারে না। সবাই মনে করে ইচ্ছে করেই করছি। কিন্তু আসলেই আমি অনেক চেষ্টা করেও মোবাইল ছাড়তে পারছি না।'
এবার আমি বললাম, 'আমি তোমাকে সম্পূর্ণ বিশ্বাস করছি। ফোন ছাড়া তুমি খুব অস্থির বোধ করো?' সে মাথা ঝাঁকিয়ে হ্যাঁ বলে। আমি বললাম, "শরীরিকভাবে তুমি এই অস্থিরতা কীভাবে অনুভব করো?' সে বুকে হাত দিল বলে, 'বুকের মধ্যখানটা চেপে ধরে আসে, তখন মনে হয় দম নিতে পারছি না, প্রচন্ড বুক ধরফর করে, রীতিমতো হাত-পা কাঁপতে থাকে, শরীর ঘামতে থাকে, মনে হয় অজ্ঞান হয়ে যাব, মাথা ঘুরতে থাকে, তখন আমার কোন জ্ঞান থাকে না যে, আমি কোথায়, কার সামনে আছি, কি করছি, কি বলছি।'
এ কথার প্রেক্ষিতে আমি বললাম, 'এমন কি কোন কাজ কর? যার জন্য পরে তোমার পরে খারাপ লাগে।' সে সম্মতি সূচক মাথা নাড়ল।
আপনারা ফোবিয়া শব্দের সঙ্গে পরিচিত। ফোবিয়ায় ভয় যখন তীব্রমাত্রায় আতংকে রূপ নেয়, তখন দুশ্চিন্তায় আমরা বারবার ভীত হয় পড়ি। যেটা স্বাভাবিক জীবনযাপনকে ব্যাহত করে। তখন ফোবিয়া আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে সমস্যা তৈরি করে।
নোমোফোবিয়া কী
আমার কাছে যে এসেছে সে ঠিক এ ধরনের একটি ফোবিয়াতে ভুগছে। কিন্তু আলোচ্য ফোবিয়াটি পৃথিবীর ইতিহাসে অপেক্ষাকৃত নতুন। বলা যায়, ফোবিয়া ঘরানার অত্যাধুনিক সংযোজন। এর নাম নোমোফোবিয়া। ২০০৮ সালে ইউকে পোস্ট অফিসের এক গবেষণার মোবাইল ফোন ব্যবহারকারীদের দুশ্চিন্তার কারণ খুঁজতে গিয়ে এই নামকরণ হয়।
২০১৯ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ৫৩ শতাংশ ব্রিটিশ যারা ২০০৮ সাল থেকে মোবাইল ফোন ব্যবহার করছেন তাঁরা হাতের কাছে ফোন না পেলে কিংবা ব্যাটারি নষ্ট হয়ে গেলে অথবা মোবাইলের সেবা চালু না থাকলে নোমোফোবিয়ায় ভুগছেন।
আমাদের এই উপমহাদেশও কিন্তু নোমোফোবিয়ার হাত থেকে রক্ষা পাচ্ছে না। ২০১৭ সালে ভারতে প্রথম বর্ষের ১৪৫ জন মেডিকেল শিক্ষার্থীর উপর এক গবেষণায় দেখা যায়, ১৭.৯ শতাংশ স্বল্পমাত্রায়, ৬০ শতাংশ মাঝারি মাত্রায় এবং ২২.১ শতাংশ শিক্ষার্থী তীব্র মাত্রায় নোমোফোবিয়া ভুগছেন।
২০১৬ সালের গবেষণায় একে ফোবিয়া বা দুশ্চিন্তা এর সঙ্গে কম বরং অ্যাডিকশনের সঙ্গে বেশি সংযুক্ত বলে এক দল গবেষক চিহ্নিত করেন। তারা নাম পরিবর্তন করে একে 'স্মার্টফোন অ্যাডিকশন ডিসঅর্ডার' বলে প্রস্তাব দেন। তখন ডায়াগনস্টিক অ্যান্ড স্ট্যাটিস্টিকাল ম্যানুয়াল অব মেন্টাল ডিসঅর্ডার (ডিএসএম-V) এ নোমোফোবিয়াকে ডিসঅর্ডার বলে তালিকাবদ্ধ করা হয়নি। একে প্রস্তাব করা হয় স্পেসিফিক ফোবিয়া বলে যা (ডিএসএম-IV) এর সংজ্ঞার উপর নির্ভরশীল।
এটাকে অনেকাংশে মাদকাসক্তির মতো ফোনের প্রতি আসক্তি এবং ঘুমের ওষুধে নির্ভরতার মত ফোনের প্রতি নির্ভরতা হিসেবেও ধরা হয়। অর্থাৎ আক্রান্ত ব্যক্তি ফোনে সংযুক্ত হতে না পারলেই ভয়, দুশ্চিন্তা, অস্থিরতায় ভুগছেন। ফোবিয়ার সাথে দুশ্চিন্তা খুবই সম্পৃক্ত। এবং এটা কখনো কখনো শারীরিক প্রতিক্রিয়াও তৈরি করে।
লেখক: চিকিৎসক, কাউন্সেলর সাইকোথেরাপি প্র্যাকটিশনার, ফিনিক্স ওয়েলনেস সেন্টার বাংলাদেশ


ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি কী কী? প্রতিরোধ করবেন যেভাবে
সন্তান জন্মের পর মা কেন বিষণ্ণতায় ভোগেন?
মানসিক চাপ কমাতে কতটুকু ঘুমাবেন
