মানুষের সামনে কথা বলতে গেলেই কেন ভয় হয়?

‘মানুষের সামনে যখনই বক্তৃতা দিতে যাই, দেখি বুক ধক ধক করে, হাতের তালু এত ঘামে যে হাত থেকে মাইক পিছলে যায়, গলার স্বর কাঁপতে থাকে, এর থেকে ভয়ংকর ব্যাপার হচ্ছে, এতো ভয়ংকরভাবে পেটে মোচড় দেয় যে বাথরুমে ছুটতে হয়। তখন পেটের ভেতরে প্রজাপতি ফরফর করে উড়তে থাকে…’

এসব কথা নিজের নখ খুঁটতে খুঁটতে এক ভদ্রলোক বলেন। খেয়াল করে দেখলাম, রুমে ঢুকবার পর আমার থেকে ভদ্রলোকের নিজের নখের দিকেই মনোযোগ বেশি।

আমি কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকলাম। কারণ বেশ বুঝতে পারছি তাঁকে ধাতস্থ হওয়ার জন্য একটু সময় দেওয়া দরকার। কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে আছি। মাথার ওপরে ফ্যান ঘুরছে।

ভদ্রলোক নিজের পায়ের দিকে তাকিয়ে বলেন, 'আমি পছন্দ করি না, কেউ আমার দিকে তাকিয়ে থাকুক। এমন কি কেউ যখন আমার সামনে আসে, তাঁর সামনেই উঠে দাঁড়াতেও আমি পছন্দ করি না। এ কারণে স্কুলে খুবই সমস্যা পড়তাম। অফিসের প্রথম দিকে সমস্যা হয় নি। এখন প্রমোশনের ব্যাপার আছে। নিজের কোম্পানিকে অনেকের সামনে উপস্থাপন করতে হয়। বিশ্বাস করেন, অনেক লোকের সামনে কথা বলতে গেলে আমার প্রচণ্ড ভয় হয়। যখন দেখি অনেক মানুষ আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। তখন মনে হয়, এরা সবাই আমাকে জাজ করছেন। আমার কাজকে অবমূল্যায়ন করছেন। বক্তৃতায় কি বলবো, অন্যরা কি ভাবছে এসব ভাবনা মাথার মধ্যে ঘুরতে থাকে। আমার প্রচণ্ড ভয় হতে থাকে। এর মধ্যে যদি প্রশ্ন–উত্তরের পর্ব থাকে, তখন জানা প্রশ্নের উত্তরও ভুলে যাই। আমি উত্তর দিতে পারি না। আমার মুখ চোখ লাল হয়ে যায়।'

ভদ্রলোকের এই অবস্থা দেখে জানতে চাইলাম, আমি আপনার পেছন দিকের দোলনাটায় বসলে কি আপনার জন্য সুবিধা হয়? তাহলে আমার দিকে আপনার তাকাতে হবে না?' এই প্রথম খেয়াল করলাম ভদ্রলোক চোখ তুলে আমার দিকে তাকালেন। এক মুহূর্ত চোখে চোখ রাখলেন। তারপর আবার দৃষ্টি সরিয়ে নিলেন নিজের বুড়ো আঙ্গুলের নখের দিকে তাকিয়ে উত্তর দিলেন না।

আমি জানতে চাইলাম, চা খাবেন? এবারও ভদ্রলোক মাথা ঝাঁকিয়ে ‘না’ বললেন। বুঝতে পারছি অতিরিক্ত প্রশ্ন করা হলে, তিনি বরং বিব্রতই হবেন।

মৌনতার একটি শক্তি আছে। মাঝে মাঝে চুপচাপ দুটো মানুষ মুখোমুখি বসে থাকার মধ্যেও ভাবের আদান-প্রদান ঘটে।  
ভদ্রলোককে প্রশ্ন করলাম, আমাকে কি ভয় পাচ্ছেন? এই প্রথম ভদ্রলোক পূর্ণ দৃষ্টিতে আমার চোখে চোখ রাখলেন। অপেক্ষা করলাম কতক্ষণ পরে তিনি চোখ সরান। বেশ কিছুক্ষণ গেল। হঠাৎ করে খেয়াল করলাম ভদ্রলোকের মুখের কঠিন রেখাগুলো কোমল হয়ে আসছে। তিনি হাসলেন।

আপনি আমার কাছে কেন এসেছেন? নরম গলায় জানতে চাইলাম। ভদ্রলোক বলেন, ‘সংসারের সবকিছু আমার স্ত্রী একাই সামলায়। বেশ কিছুদিন ধরে আমাদের দাম্পত্য সম্পর্ক খুবই খারাপ যাচ্ছে। ইদানীং ভয়ে অফিসের মিটিংয়ের আগের দিন রাতে ভালো করে ঘুমাতে পারছি না। কারণ কিছু কিছু মিটিং অনেকের উপস্থিতিতে করতে হয়। আমার সামনে কেউ বসে থাকলে, কথা বলার সময় ভয় কাজ করে। আমার এই ভয় ছোটবেলা থেকে। অফিসের মিটিংয়ে নিজের মতামতকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারি না। অফিস থেকে প্রমোশনের প্রস্তাব গ্রহণ করছি না। কারণ আমি অফিসের বাইরের মানুষের সঙ্গে কাজ করতে চাই না। এখন অফিসে যে বিষয়ে আমি কাজ করি, এই কাজের জন্য আমি ছাড়া অফিসে বিকল্প আর কেউ নেই। এই কাজের জন্য আমাকে অন্তত ৫০ টা দেশে যেতে হবে। আমি চাকরি ছেড়ে দিতে চাই, কিন্তু আমার এই সিদ্ধান্তে স্ত্রী বাধা দিচ্ছে। তাই আপনার কাছে আসা।’

আলোচ্য ভদ্রলোক সম্ভবত গ্লসোফোবিয়াতে (Glossophobia) আক্রান্ত। এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি জনসমক্ষে কথা বলতে তীব্র ভয় পান। এটি একটি নির্দিষ্ট ধরনের ফোবিয়া, যেখানে আক্রান্ত ব্যক্তি ক্রমাগত ভয় পান। এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি সাধারণত মানুষের সামনে কথা বলতে গেলেই ভয় এবং দুশ্চিন্তার ভোগান্তিতে পড়েন। সে কারণে তিনি জনসমক্ষে কথা বলা যতটুকু সম্ভব এড়িয়ে চলেন। এই ধরনের ঘটনা চলমান থাকায় তার মানসিক স্বাস্থ্যের উপর নেতিবাচক প্রভাব সিন্দাবাদের দৈত্যের মত চেপে বসে।

ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব মেন্টাল হেলথের উপাত্ত অনুযায়ী, এই ফোবিয়ায় বিশ্বের প্রায় ৭৫ শতাংশ মানুষ আক্রান্ত। আক্রান্ত ব্যক্তির কাছে অন্যদের সামনে কেমন কর্মক্ষমতা দেখালাম সেটাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। অন্যান্য ফোবিয়ার মতন যেমন: উচ্চতার ভয় বা পোকামাকড় ভয় অথবা মৃত্যুর ভয় পাওয়া, এটি তেমন নয়। এখানে কিন্তু আক্রান্ত ব্যক্তি মনে করছেন না যে তিনি বক্তৃতা দিতে গিয়ে মারা যাবেন। বরং তিনি ভয় পাচ্ছেন, বক্তৃতা সময় বা বক্তৃতা পরবর্তী তিনি কী ধরনের বিব্রতকর অবস্থায় পড়বেন। অনেকটা স্টেজ ভীতি বলা যায়। গড়পড়তা হিসাবে ২১ শতাংশ থেকে ৩৫ শতাংশ মানুষ জনসম্মুখে বক্তৃতা দিতে ভয় পান। 

লেখক: চিকিৎসক, কাউন্সিলর, সাইকোথেরাপি প্র্যাকটিশনার, ফিনিক্স ওয়েলনেস সেন্টার, বাংলাদেশ