নিরাপদ মাতৃত্ব দিবস

মা ও শিশুর সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে হবে

মাতৃত্বের স্বাদ গ্রহণ নারী জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। নিরাপদ মাতৃত্ব প্রতিটি নারীর অধিকার। ১৯৮৭ সালে কেনিয়ার নাইরোবি কনফারেন্সে প্রথম এই নিরাপদ মাতৃত্বের ঘোষণা করা হয়। এর প্রধান উদ্দেশ্য ছিল পুরো বিশ্বব্যাপী, বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ২০০০ সালের দিকে ৫০ শতাংশ মাতৃমৃত্যু কমানো।

১৯৯৭ সালে বাংলাদেশ সরকার এ দিবসের অনুমোদন দেন। তখন থেকে দেশব্যাপী প্রতি বছর ২৮ শে মে নিরাপদ মাতৃত্ব দিবস পালিত হয়ে আসছে। ২০১৫ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এই উদ্যোগকে টেকসই উন্নয়নের অন্তর্ভুক্ত করে। নিরাপদ মাতৃত্বের কার্যক্রমে বাংলাদেশে মাতৃমৃত্যুর হার কমে এসেছে। সর্বশেষ বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (BBS) রিপোর্ট অনুযায়ী, বাংলাদেশে মাতৃমৃত্যু হার ১৩৬ (প্রতি ১ লাখ জীবিত জন্মের বিপরীতে)। ২০৩০ সালের টেকসই উন্নয়নে এই সংখ্যা ৭০ জনে কমিয়ে আনতে হবে। 

নিরাপদ মাতৃত্ব দিবস পালনের উদ্দেশ্য কী? 
এ দিবস পালনের উদ্দেশ্য হলো জনগণকে সচেতন করে মা ও শিশুর সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করা। নিরাপদ মাতৃত্ব দিবসের এবারের প্রতিপাদ্য হচ্ছে—‘হাসপাতালে সন্তান প্রসব করান, মা ও নবজাতকের জীবন বাঁচান’।

নিরাপদ মাতৃত্ব বলতে কী বোঝায়?
মাতৃত্ব মানে দুটো জীবন—একজন মা এবং একজন শিশু (গর্ভস্থ /নবজাতক)। নিরাপদ মাতৃত্ব মানে এই দুজনের জীবনের সুস্থতার নিশ্চয়তা দেওয়া। তাহলে নিরাপদ মাতৃত্ব বলতে আমরা যা বুঝি, তা হলো–
১. একজন নারীর স্বেচ্ছায় সন্তান ধারণ। অর্থাৎ সে সন্তান নিবে কি নিবে না অথবা কখন নিবে এটা তার ইচ্ছের উপর নির্ভর করবে। তাকে জোর করে চাপিয়ে দেওয়া যাবে না। 
২. এরপর গর্ভধারণ হলে নিয়মিত গর্ভকালীন স্বাস্থ্যসেবা পেতে হবে। 
৩. এর জন্য নিরাপদ প্রসব এবং প্রসব পরবর্তী স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হবে। 

নিরাপদ মাতৃত্ব অর্জনে প্রতিবন্ধকতা কী?
আমাদের দেশে এখনো অনেক বাধা আছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো –

বাল্যবিবাহ
এদেশে ১৮ বছর বয়সের পূর্বে ৪১.৬ শতাংশ মেয়ের বিয়ে দেয়া হয় (বিবিএস ২০২৩)। এই সব কিশোরী মায়েদের জন্মনিরোধক পদ্ধতি সম্পর্কে কোনো ধারণা নেই। তারা নানারকম স্বাস্থ্যঝুঁকিতে থাকেন। এদের মধ্যে গর্ভাবস্থায় গর্ভপাত, গর্ভজনিত উচ্চ রক্তচাপ, খিঁচুনি, অকাল প্রসব ইত্যাদির ঝুঁকি বেশি থাকে। এ ছাড়া তার প্রসবপথ পরিপক্ব না হওয়ায় প্রসবকালীন সময়ে বিলম্বিত ও বাধাগ্রস্ত প্রসবের সমূহ সম্ভাবনা থাকে। এমনকি জরায়ু ফেটে যেতে পারে। ফলে মা এবং গর্ভস্থ শিশু উভয়ই মারা যেতে পারে। আর যারা বেঁচে থাকে তারা জননপথের সংক্রমণ বা অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ থেকে শুরু করে প্রসবজনিত ফিস্টুলার মতো দুর্বিষহ অবস্থার সম্মুখীন হতে পারে।

পরিকল্পিত পরিবার গঠন
মাত্র ৬৩ শতাংশ নারী জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি গ্রহণ করে থাকেন (Bangladesh Maternal mortality and Health Care Survey,  2016)। তাহলে বাকী ৩৭ শতাংশ নারীর মধ্যে অনেকেই অপরিকল্পিত গর্ভধারণের শিকার হন? ফলে তারা কখনো কখনো গর্ভপাত করাতে চান। আর সেটা যদি অদক্ষ হাতে হয় তাহলে ভয়াবহ সংক্রমণ থেকে শুরু করে নারীর মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।

অজ্ঞতা
গর্ভবতী নারী অথবা তাঁর পরিবারের সদস্যদের গর্ভকালীন, প্রসবকালীন মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা সম্পর্কে সঠিক তথ্য এবং জ্ঞানের অপ্রতুলতা। এখনও মাত্র ৩৯ শতাংশ নারী চার বা তদুর্ধ্ববার প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মীর নিকট গর্ভকালীন স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ করেন (বিবিএস ২০২৩)।  এবং প্রায় ৫০ ভাগ প্রসব বাড়িতে হচ্ছে অদক্ষ হাতে।

প্রতিবন্ধকতা উত্তরণের পথ কি? 
একটা ভবন তৈরির সময় প্রথমে তার একটা শক্ত ভিত (Basement) তৈরি করা হয়। এরপর এই মজবুত ভিতের উপরে শক্ত পিলার বা স্তম্ভ দাঁড় করানো হয়। উদ্দেশ্য হলো ভবনটা যেন ভেঙে না পড়ে। তেমনি নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিত করতে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার মূল চারটি স্তম্ভকে অতিশয় গুরুত্ব দিতে হবে।

১. পরিবার পরিকল্পনা (Family Planning)।
২. গর্ভকালীন পরিচর্যা (Antenatal Care)।
৩. নিরাপদ প্রসব (Safe Delivery)।
৪. অত্যাবশ্যক প্রসূতি যত্ন (Essential Obstetric Care)।

দেশে এখন ৫০ শতাংশ প্রসব বাড়িতে হচ্ছে। প্রাতিষ্ঠানিক ডেলিভারির সংখ্যা বাড়ানোর জন্য ব্যাপক প্রয়াস চালাতে হবে। তাহলে প্রসবকালীন জটিলতা মোকাবিলা করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি প্রসব পরবর্তী স্বাস্থ্য সেবাও অনেকাংশে নিশ্চিত করা যাবে। 

আসুন আমরা সবাই মিলে নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিত করি,  মা এবং শিশুর জীবন রক্ষা করি।

লেখক: অধ্যাপক, প্রসূতিবিদ্যা ও স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ এবং ফিস্টুলা সার্জন, কুমুদিনী উইমেন্স মেডিকেল কলেজ