নারীর জন্য প্রসবকালীন সময়টা অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। প্রসবকালীন একজন নারীর অন্যান্য অনেক জটিলতা ও সমস্যার মধ্যে সবচেয়ে বেদনাবহ সমস্যা হচ্ছে ‘প্রসবজনিত ফিস্টুলা’। সাধারণত বিত্তহীন প্রান্তিক নারীদের মধ্যে প্রসবজনিত ফিস্টুলা বেশি দেখা যায়। এই রোগের চিকিৎসা কোথায় কীভাবে হয় অথবা আদৌ কোনো চিকিৎসা আছে কিনা, তারা সেটা জানেন না।
জেনিটাল ফিস্টুলা হলো নারীর জননপথের (মাসিকের রাস্তা) সঙ্গে মূত্রথলি/মূত্রনালী বা মলদ্বার অথবা উভয়ের একটি অস্বাভাবিক সংযোগ স্থাপিত হওয়া। ফলে জননপথ দিয়ে অনবরত নিয়ন্ত্রণহীন প্রস্রাব/পায়খানা বা উভয়ই ঝরতে থাকে। জেনিটাল ফিস্টুলার প্রধান কারণ হচ্ছে বাধাগ্রস্ত প্রসব । তবে অপারেশন অথবা আঘাতজনিত কারণেও এটা হতে পারে। যখন এটা প্রসবজনিত কারণে হয়, তখন তাকে বলে ‘প্রসবজনিত ফিস্টুলা’।
প্রসবজনিত ফিস্টুলার মূল কারণগুলো হলো:
১. বাল্যবিবাহ।
২. প্রসব সংক্রান্ত সামাজিক কুসংস্কার।
৩. গর্ভবতী নারী অথবা তার পরিবারের সদস্যদের গর্ভকালীন, প্রসবকালীন মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা সম্পর্কে সঠিক তথ্য এবং জ্ঞানের অপ্রতুলতা।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, কোনো গর্ভবতী নারী যদি নিয়মিত আটবার অথবা কমপক্ষে চারবার কোন প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মী দ্বারা স্বাস্থ্য পরীক্ষা করান তাহলে তার অনেক সমস্যা আগে থেকে নির্ণয় করা এবং তদনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়।
ফিস্টুলা রোগের জটিলতা কি?
শারীরিক সমস্যা
১. এই রোগীদের শরীরে প্রস্রাব বা পায়খানা অথবা উভয়ের তীব্র দুর্গন্ধ থাকে।
২. প্রসবজনিত ফিস্টুলার রোগী বরাবরই দরিদ্র পরিবার থেকে আসে। এরা পুষ্টিহীনতা gx রক্তস্বল্পতায় ভোগেন। ফলে তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকে।
৩. ফিস্টুলা রোগীরা প্রস্রাব হওয়ার ভয়ে কম পানি পান করে। ফলে তাদের প্রস্রাবের ঘনত্ব বেড়ে যায়। ফলে মুত্রথলিতে পাথর হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়।
৪. অনবরত এই প্রস্রাব ঝরার ফলে জননপথের আশেপাশে চুলকানি, এমনকি ঘা পর্যন্ত হতে পারে।
ব্যক্তিগত ও মানসিক সমস্যা
১. নিদ্রাহীনতা ও অবসন্নতা।
২. মল-মূত্রের দুর্গন্ধ থাকায় এসব নারীদের স্বামী এক বিছানায় ঘুমায় না। এদের অধিকাংশ স্বামী পরিত্যক্তা হয়ে থাকেন। এদের স্বামীরা প্রায়শ একাধিক বিয়ে করেন।
৩. ভাই-বোন বা অন্যান্য আত্মীয়-স্বজনও তাদের জায়গা দিতে চান না।
৪. তাকে কেউ কাজে ডাকেনা। কাজে নিয়োজিত থাকাদের চাকরি বা কাজ চলে যায়।
৫. জীবিকার জন্য অনেকে ভিক্ষাবৃত্তি বেছে নেয়।
৬. এরা সংসার, স্বজন ও সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
৭. এরা সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন হয়। ফলে ধীরে ধীরে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে।
৮. এমনকি অনেকের মধ্যে আত্মহননের প্রবণতা দেখা দেয়।
প্রসবজনিত ফিস্টুলা কীভাবে নির্ণয় করা হয়?
এটি এমন একটি রোগ, যে রোগী কক্ষে প্রবেশ করলেই বোঝা যায়। কারণ তার সঙ্গে মল বা মূত্র অথবা উভয়ের গন্ধ থাকে, যা নাকে লাগে। কিন্তু তারপরও এই রোগী সঠিকভাবে শনাক্ত করা কিছুটা কঠিন। বাংলাদেশ সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের মাঠ পর্যায়ের কর্মী এবং কিছু বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের স্বাস্থ্য কর্মীরা কিছু প্রশ্নভিত্তিক নির্দেশিকা ব্যবহার করে প্রাথমিকভাবে এসকল রোগীদের শনাক্ত করেন।
এরপর তাদেরকে মাঠ পর্যায়েই ডাই টেস্ট (Dye Test) করা হয়- মিথিলিন ব্লু নামক এক ধরনের রঙিন ঔষধ নল বা ক্যাথেটারের মাধ্যমে মূত্রথলিতে প্রবেশ করানো হয়। যদি ফিস্টুলা থাকে, তাহলে এই রং জননপথে বের হয়ে আসে, একে বলে ‘পজিটিভ ডাই টেস্ট’। অর্থাৎ তার ফিস্টুলা আছে। এই পরীক্ষা করতে সময় লাগে ১ থেকে ২ মিনিট। এরপর তাদেরকে সঠিক জায়গায় চিকিৎসার জন্য পাঠানো হয়। যেখানে আরও বিস্তারিত ইতিহাস এবং পরীক্ষার পর চিকিৎসা দেওয়া হয়। ২০৩০ সালের মধ্যে প্রসবজনিত ফিস্টুলা মুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব। আমরা নিশ্চয় এ লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারব।
লেখক: অধ্যাপক, প্রসূতিবিদ্যা ও স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ এবং ফিস্টুলা সার্জন, কুমুদিনী উইমেন্স মেডিকেল কলেজ
আরও পড়ুন:



