আমাদের মধ্যে অনেকেই আছেন যারা দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকেন। এই দীর্ঘ সময় এক পর্যায়ে গিয়ে দীর্ঘ দিনে পরিণত হয়। দিনের পর দিন খাবারের প্রতি অনিয়ম করলে পিত্তথলির পিত্তরস ঠিকঠাক কাজ করে না। ফলে পিত্তথলিতে পাথর তৈরি হয়। তবে এই পাথর শুধু খাবারে অনিয়মের জন্য হয় না। এর পাশাপাশি আরও অনেক কারণে হয়ে থাকে। যেমন: ভেজাল, চর্বিযুক্ত খাবার খাওয়া, রক্তে চর্বির মাত্রা বৃদ্ধি পাওয়া ও শারীরিক পরিশ্রম কম হওয়ার ফলেও এমনটা হতে পারে।
আমাদের শরীরের গলব্লাডার পিত্ত রসের সঞ্চয়স্থান। এটি পেটের ডানে উপরের দিকে থাকে। পিত্তরসের যে কোনো পরিবর্তনের ফলে পিত্তথলিতে ছোট নুড়ির মতো পাথর তৈরি হয়, একে পিত্তথলি বা পিত্তথলির পাথর বলা হয়। গলব্লাডার বা পিত্তথলিতে পাথরের সমস্যায় অনেকেই ভুগে থাকেন। এতে পেটের যন্ত্রণা, বমি বমি ভাব, খেতে ইচ্ছে না করা, হলুদ প্রস্রাব, বমি বমি ভাব, ঘাম হওয়া ও দুর্বল লাগতে পারে। এসব উপসর্গের কারণে যে কোনো সময় রোগীর পেটের ডান দিকে প্রচণ্ড ব্যথাসহ জ্বর আসতে পারে। এবং এ ব্যথা কাঁধ পর্যন্ত ছড়াতে পারে।
পিত্তথলিতে পাথর বা গলস্টোন হয় তখনই, যখন পিত্তরস কঠিন হয়ে পিত্তথলিতে জমা হয়। এতে পেটের উপরের অংশের ডানদিকে তীব্র যন্ত্রণা হয়। যকৃতের নিচে ডান দিক ঘেঁষে থাকে পিত্তথলি। পিত্তরসের বাড়তি জমা হয় এই থলিতে। এই পিত্ত কঠিন হয়ে পাথরের মত হয়ে যায়, আর জমা পড়ে পিত্তথলিতে।
পিত্ত পাথুরি বা গলস্টোন বেশি হয় নারীদের। এ ছাড়া মেদবহুল ৪০ বছরের বেশি বয়সের লোকদেরও হয়ে থাকে। আবার ডায়াবেটিস রোগীদের এ সমস্যা হতে পারে। এতে হঠাৎ ব্যথা শুরু হয়, আর তা খুব অসুস্থ করে ফেলে। আহারের পর এই ধরনের ঘটনা ঘটে বেশি। এই সময় পিত্তথলি সংকুচিত হয়ে চাপ দেয় পিত্তনালীকে, আর তখন হয় ব্যথা শুরু হয়।
লক্ষণ
১. কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসা।
২. বমিভাব বা বমি হওয়া।
৩. তেল, মশলাজাতীয় খাবার খেলে পেটে হয় তীব্র ব্যথা।
৪. পেটের পেছন দিকে, কাঁধে ও পেটের মাঝ বরাবর ব্যথা ছড়িয়ে পড়া।
৫. পেটের ডান দিয়ে ব্যথা শুরু হয়ে কাঁধে পৌঁছায়। এরকম হলে অবশ্যই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে।
করণীয়
১. প্রস্রাবের রং গাঢ় খয়েরি হলে সন্দেহ করতে হবে।
২. ব্যথা বেশি হলে দেরি না করে অবশ্যই হাসপাতালে যেতে হবে।
৩. হাসপাতালের চিকিৎসক সিদ্ধান্ত নেবেন কি করতে হবে।
৪. চিকিৎসক হয়ত ওষুধ দিয়ে চিকিৎসা করবেন। আর না হয় অবস্থা বুঝে অপারেশন করবেন।
পিত্তথলির পাথর সাধারণত ল্যাপারোস্কপির মাধ্যমে বের করে আনা হয়। পেটের যে অংশে পিত্তথলি অবস্থিত, সেখানে ছোট ছোট ছিদ্র করে সূক্ষ্ম সরু যন্ত্র দিয়ে পিত্তথলির পাথর অপসারণ করা হয়। এতে পেট কাটতে হয় না। পেটে ছোট ছোট ছিদ্র করে ল্যাপারোস্কপি যন্ত্রের মাধ্যমে পাথর বের করে আনা হয়। অস্ত্রোপচারের পরদিনই রোগী বাড়ি যেতে পারেন। এ সময় যেসব বিষয়ে খেয়াল রাখতে হবে সেগুলো হলো:
১. বেশ কয়েকদিন খাওয়া–দাওয়ার দিকে নজর দিন।
২. অপারেশনের পর কয়েকদিন স্যুপ জাতীয় খাবার খেতে দিন।
২. এরপর ওটসের খিচুড়ি বা জাউ ভাত খেতে দিতে পারেন রোগীকে।
৩. আদা, জিরা বাটা দিয়ে মাছ বা চিকেন সেদ্ধ করে স্যুপ দিতে পারেন।
৪. এ সময চর্বি খেলে হজম হবে না। তাই ভাত কিংবা রুটি খেতে দিতে পারেন।
৫. টক, মিষ্টি, ঝাল ও মশলাজাতীয় খাবার না খাওয়া ভালো।
লেখক: সাবেক অধ্যক্ষ, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল
আরও পড়ুন: