অনিয়ন্ত্রিত উচ্চরক্তচাপে মৃত্যু ঝুঁকি এড়াতে করণীয় 

উচ্চ রক্তচাপ একটি নীরব ঘাতক। এটি এমন একটি অসুখ, যা নিয়ন্ত্রণে না রাখলে- হৃদ্রোগ ও স্ট্রোকের সম্ভাবনা থাকে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে ২৫ ভাগ মানুষ উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন। এদের ৫০ ভাগই জানেন না, তারা উচ্চ রক্তচাপের রোগী। ডব্লিউএইচও-এর গ্লোবাল রিপোর্ট অন হাইপারটেনশন ২০২৩ এর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালে বাংলাদেশে ২ লাখ ৭৩ হাজার মানুষ হৃদরোগজনিত অসুস্থতায় মৃত্যুবরণ করেন। যার ৫৪ শতাংশের জন্য দায়ী উচ্চ রক্তচাপ। তবে, খুব সহজেই এই মৃত্যু এড়ানো সম্ভব।

একজন প্রাপ্তবয়স্ক সুস্থ স্বাভাবিক মানুষের রক্তচাপ থাকে ১২০/৮০ মিলিমিটার। কারো ব্লাডপ্রেশার রিডিং যদি ক্রমাগতভাবে ১৪০/৯০ বা এর চেয়েও বেশি হয়, তখন বুঝতে হবে তার উচ্চ রক্তচাপের সমস্যা আছে। স্থূলতা, বেশি লবণ গ্রহণ, অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, ধূমপান, কিডনি রোগ, ডায়াবেটিস, জন্মগত হার্টের সমস্যা, গর্ভাবস্থা, নিদ্রাহীনতা—এসব কারণে রক্তচাপ বেড়ে যেতে পারে।

তবে, অধিকাংশ সময়ে উচ্চ রক্তচাপের কারণ জানা যায় না। এটি একটি বংশগত রোগও বটে। বাবা-মায়ের থাকলে ধরে নিতে হবে ৫০ শতাংশ আশঙ্কা আছে সন্তানের আক্রান্ত হওয়ার। তাই উচ্চ রক্তচাপ ধরা পড়লে, প্রথমেই যেটা করা উচিত তা হচ্ছে, একজন চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া। চিকিৎসক উচ্চ রক্তচাপ আছে কিনা তা নিশ্চিত করেন। পাশাপাশি উচ্চ রক্তচাপের কারণ ও অন্য কোনো জটিলতা আছে কিনা তা দেখার জন্য কিছু পরীক্ষা করান।

উচ্চ রক্তচাপ একটি অসংক্রামক এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণযোগ্য অসুখ। তাই প্রথমে প্রয়োজন জীবনযাপনের প্রণালী নিয়ন্ত্রণে আনা। যেমন:

১. ওজন স্বাভাবিক রাখা, সেজন্য পর্যাপ্ত শারীরিক পরিশ্রম করা প্রয়োজন। এতে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রিত থাকবে।
২. ফাস্টফুড বা রাস্তার দোকানের চটকদার খাবার পরিহার করা।
৩. প্রতিদিনের খাবারের তালিকায় যথেষ্ট পরিমাণে শাকসবজি ও ফলমুল রাখা। 
৪. মদ্যপান পরিহার করা। এ ছাড়া অতিরিক্ত চা-কফি, কোমল পানীয় ও অন্যান্য ক্যাফেইন জাতীয় পানীয় খাওয়ার অভ্যাস থাকলে তা বর্জন করা।  
৫. অতিরিক্ত লবণ খাওয়া– আমাদের দেশে খুব প্রচলিত একটি অভ্যাস। ‘লবণ ভেজে খেলে ক্ষতি নেই’- এমন একটি ভুল ধারণা প্রচলিত রয়েছে অনেকের মধ্যে। কিন্তু এটি সঠিক নয়। লবণ যেকোনো ভাবে খেলেই প্রেশার বাড়ে। 
৬. অতিরিক্ত মানসিক চাপ ও রাতে অপর্যাপ্ত ঘুম (একটানা ৬-৮ ঘণ্টার চেয়ে কম) বাড়িয়ে দেয় রক্তচাপ। তাই, মানসিক প্রশান্তি ও স্বস্তির ঘুম- সুস্থতার জন্য অত্যাবশ্যক।

জীবনযাপনের পাশাপাশি অধিকাংশ ক্ষেত্রে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে ওষুধের প্রয়োজন হয়। মোটা দাগে উচ্চ রক্তচাপের চার ধরনের ওষুধ হয়। ব্যক্তির রক্তচাপের মাত্রা অনুযায়ী চিকিৎসক ওষুধের ধরণ ও মাত্রা নির্ধারণ করেন। ওষুধ শুরু করার পর ফার্মেসির লোকের কথামতো ওষুধ বাড়ানো বা কমানো উচিত নয়। অনেকে মনে করেন, ‘আমার তো কোনো লক্ষণ নেই- ওষুধ কেন খাব? ওষুধ বন্ধ করে দিই!’—এটা একটা ভুল ধারণা। অধিকাংশ ক্ষেত্রে উচ্চ রক্তচাপে কোনো লক্ষণ প্রকাশ পায় না। এটাই উচ্চ রক্তচাপের সবচাইতে খারাপ দিক। যদিও এ সময় রোগীর কোনো লক্ষণ থাকে না, তবুও নীরবে উচ্চ রক্তচাপ শরীরের বিভিন্ন অংশকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। এ জন্যই উচ্চ রক্তচাপকে বলা হয় নীরব ঘাতক।

অনিয়ন্ত্রিত এবং চিকিৎসাবিহীন জীবনযাপনে উচ্চ রক্তচাপ থেকে অনেক ধরনের শারীরিক জটিলতা দেখা দিতে পারে। রক্তচাপ নিয়ন্ত্রিত না থাকলে শরীরের গুরুত্বপূর্ণ ৪টি অঙ্গে মারাত্মক ধরনের জটিলতা দেখা দিতে পারে। যেমন- হৃৎপিণ্ড, কিডনি, মস্তিষ্ক ও চোখ। স্ট্রোক, হার্ট অ্যাটাক, কিডনি জটিলতাসহ উচ্চ রক্তচাপের নানা লক্ষণ প্রকাশ পায়। আবার রোগী যখন চিকিৎসা নেন, তখন রোগ অনুযায়ী রক্তচাপের লক্ষ্যমাত্রা ভিন্ন হয়। তাই চিকিৎসক নির্ধারণ করবেন কোন ওষুধ, কী মাত্রায়, কতদিন চলবে। তবে আশার কথা হচ্ছে, রক্তচাপ সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণে থাকলে, মৃত্যু ঝুঁকি অনেকখানি কমিয়ে আনা সম্ভব। 

উন্নত বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে উচ্চ রক্তচাপের অনেক নিরাপদ ওষুধ আমাদের দেশে রয়েছে। সুস্থ থাকতে জীবনযাত্রার মান নিয়ন্ত্রণে রাখা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে সদিচ্ছার অভাব রয়েছে বেশিরভাগ রোগীর। আর সেই কারণে, অনেকক্ষেত্রে ভালো ওষুধেও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ হয় না। তাই জীবনযাত্রার মানকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে নিয়মিত ওষুধ গ্রহণ করে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে আমাদের মনোযোগী হওয়া উচিত।

লেখক: এমবিবিএস, বিসিএস (স্বাস্থ্য), রেসিডেন্ট, বিএসএমএমইউ