ডায়াবেটিস বর্তমান পৃথিবীর অন্যতম ভয়াবহ স্বাস্থ্য সমস্যা। বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ডায়াবেটিসের রোগীর সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের মূল চাবিকাঠি হলো খাদ্যাভ্যাস। অনেক খাবারই ডায়াবেটিস রোগীরা নিয়ে দ্বিধায় ভোগেন, তার মধ্যে অন্যতম হলো আলু। আমাদের রান্নাঘরের অপরিহার্য সবজি হলেও ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য আলু খাওয়া নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে—
১. আলু কি সম্পূর্ণ এড়িয়ে চলতে হবে?
২. সাধারণ আলু ও রাঙা আলু কি সমান ক্ষতিকর?
৩. কতটুকু আলু খাওয়া নিরাপদ?
৪. আলু কীভাবে রান্না করলে রক্তে সুগার কম বাড়ে?
আলুর পুষ্টিগুণ
সাধারণ আলু হলো শর্করার অন্যতম উৎস। প্রতি ১০০ গ্রাম সিদ্ধ আলুতে গড়ে থাকে– ক্যালোরি ৮০–৯০ কিলোক্যালোরি, কার্বোহাইড্রেট ১৭–২০ গ্রাম, প্রোটিন ২ গ্রাম, ফাইবার ২ গ্রাম, ভিটামিন ভিটামিন C, ভিটামিন B6, খনিজ– পটাশিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম।
আলুতে ফ্যাট প্রায় থাকে না, তবে এতে থাকা স্টার্চ দ্রুত গ্লুকোজে রূপান্তরিত হয়ে রক্তে শর্করা বাড়ায়। যে কারণে আলু নিয়ে ডায়াবেটিস রোগীদের দুশ্চিন্তা তো হলো আলুর গ্লাইসেমিক ইনডেক্স (GI) তুলনামূলকভাবে বেশি। সাধারণত সেদ্ধ বা ভর্তা আলুর GI প্রায় ৭০–৯০, যা ‘উচ্চ’ ধরা হয়। এর মানে হলো আলু খেলে শরীরে গ্লুকোজ দ্রুত শোষিত হয়ে রক্তে শর্করা হঠাৎ বেড়ে যায়। ডায়াবেটিস রোগীদের ক্ষেত্রে এই দ্রুত শর্করা বৃদ্ধি ইনসুলিন নিয়ন্ত্রণের ওপর বাড়তি চাপ ফেলে। তবে সব ধরনের আলুর GI সমান নয়। আলুর প্রকারভেদ, রান্নার ধরন ও পরিমাণ অনুযায়ী শর্করার প্রভাব ভিন্ন হতে পারে।
রাঙা আলু বা মিষ্টি আলু–এর পুষ্টিগুণ
রাঙা আলু সাধারণ আলুর তুলনায় আলাদা বৈশিষ্ট্য বহন করে। প্রতি ১০০ গ্রাম সিদ্ধ রাঙা আলুতে থাকে— ক্যালোরি ৮৬ কিলোক্যালোরি, কার্বোহাইড্রেট ২০ গ্রাম, ফাইবার ৩ গ্রাম (সাধারণ আলুর চেয়ে বেশি), ভিটামিন প্রচুর বিটা-ক্যারোটিন (ভিটামিন A), ভিটামিন C, খনিজ– পটাশিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট– ফ্ল্যাভোনয়েড, পলিফেনল। রাঙা আলুর গ্লাইসেমিক ইনডেক্স প্রায় ৫০–৬০, অর্থাৎ মধ্যম। তাই এটি ধীরে গ্লুকোজে ভাঙে, ফলে রক্তে শর্করা তাড়াহুড়া করে বাড়ে না। তাই ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য রাঙা আলু সাধারণ আলুর তুলনায় বেশি উপযোগী।
আলুর গ্লাইসেমিক প্রভাব রান্নার ধরনে নির্ভর করে। যেমন–
১. আলু কীভাবে রান্না করা হচ্ছে, সেটিও রক্তে শর্করার ওপর বড় প্রভাব ফেলে।
২. সেদ্ধ আলু : GI তুলনামূলক কম হয়।
৩. ভর্তা আলু: স্টার্চ দ্রুত ভেঙে যায়, ফলে GI বেশি।
৪. ভাজা আলু (ফ্রেঞ্চ ফ্রাই বা আলুর চিপস): তেল ও লবণ যোগ হওয়ায় ক্যালোরি ও GI দুই-ই বেড়ে যায়।
ঠান্ডা সিদ্ধ আলু: ফ্রিজে রাখা সেদ্ধ আলুতে ‘Resistant Starch’ তৈরি হয়, যা ফাইবারের মতো কাজ করে এবং শর্করা কম বাড়ায়।
তাই ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য সেদ্ধ বা স্টিম করা আলু সবচেয়ে নিরাপদ।
কতটুকু আলু খাওয়া যেতে পারে?
ডায়াবেটিস রোগীদের আলু পুরোপুরি বাদ দেওয়ার প্রয়োজন নেই, তবে নিয়ন্ত্রণ জরুরি।
- সাধারণ আলু: সপ্তাহে ২–৩ বার, প্রতি বেলায় সর্বোচ্চ ১টি ছোট সাইজের আলু (৫০–৭০ গ্রাম সেদ্ধ), ভাত/রুটি কমিয়ে আলু খেতে হবে।
- রাঙা আলু: সপ্তাহে ৩–৪ বার খাওয়া যেতে পারে। প্রতিবার আধা কাপ সেদ্ধ রাঙা আলু বা একমুঠো সমপরিমাণ নিরাপদ।
কোন সময়ে আলু খাওয়া ভালো?
সকালের নাশতা বা বিকেলের খাবারে খাওয়া উত্তম। সকালের নাশতায় সামান্য রাঙা আলু খেলে দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা থাকে। দুপুরে সবজির সঙ্গে ছোট আলু যুক্ত করা যায়। রাতে আলু খাওয়া এড়িয়ে চলা ভালো, কারণ রাতে শর্করা পোড়াতে শরীরের কার্যক্রম কম থাকে।
আলুর সঙ্গে অন্য খাবারের সমন্বয়
শুধু আলু খেলে রক্তে শর্করা দ্রুত বাড়বে। কিন্তু যদি আলু সবজির সঙ্গে মেশানো হয়, অথবা ডাল/মাছ/ডিমের সঙ্গে খাওয়া হয়, তবে শর্করা ধীরে বাড়বে। ফাইবার ও প্রোটিন একসঙ্গে থাকলে ইনসুলিনের চাপ কমে।
আলু গ্রহণে সতর্কতা
১. ভাজা আলু, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই বা আলুর চিপস সম্পূর্ণ এড়িয়ে চলা উচিত।
২. অতিরিক্ত লবণ ও তেল দিয়ে রান্না করা আলু ডায়াবেটিসের পাশাপাশি উচ্চ রক্তচাপ ও স্থূলতার ঝুঁকি বাড়ায়।
৩. আলু খাওয়ার দিনে ভাত/রুটির পরিমাণ কমিয়ে নিতে হবে।
৪. প্রতিদিন হাঁটা বা শারীরিক কসরত করলে আলুর গ্লুকোজ শরীরে ব্যবহার হয়, ফলে ঝুঁকি কমে।
ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য আলু পুরোপুরি নিষিদ্ধ নয়। তবে সাধারণ আলু সীমিত পরিমাণে, সেদ্ধ বা স্টিম করে খেতে হবে। রাঙা আলু তুলনামূলকভাবে নিরাপদ, তবে এটিও পরিমাণ নিয়ন্ত্রিত হওয়া জরুরি। রান্নার ধরন, সময় ও অন্য খাবারের সঙ্গে সমন্বয়ের ওপর নির্ভর করে আলুর শর্করার প্রভাব কমানো সম্ভব। অতএব, সঠিক নির্দেশনা মেনে আলু খেলে ডায়াবেটিস রোগীরও প্রিয় এই সবজিটিতে উপভোগ করা সম্ভব, রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ রেখে।
লেখক: নিউট্রিশন অফিসার, ন্যাশনাল হেলথকেয়ার নেটওয়ার্ক, বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি


কোষ্ঠকাঠিন্য প্রতিরোধ ছাড়াও আমড়া খেলে যত উপকার
ডায়াবেটিস রোগীদের কখন আর কতক্ষণ হাঁটা উচিত
