দাঁতের গোড়ায় ফোড়া? জেনে নিন বাঁচার উপায়

অনেক মানুষই দাঁতের বিষয়ে সচেতন নন। দাঁতে কোনো সমস্যা হলে অনেকেই ডাক্তারের পরামর্শ নিতে দেরি করেন। কিন্তু দাঁতের ইনফেকশন কিংবা ব্যথাকে কখনোই হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়। কারণ গবেষণা বলছে- দাঁতে জীবাণুর সংক্রমণ দীর্ঘস্থায়ী হলে তা থেকে দেখা দিতে পারে বিভিন্ন জটিল রোগের সমস্যা।

দাঁতের গোড়ায় অ্যাবসেস বা ফোড়া

যখন শরীরের কোনো অংশ ফুলে যায়, সাধারণত সেখানে পুঁজ জমা হয়। এটি অ্যাবসেস বা ফোড়া। ত্বকে যখন ফোড়া হয় তখন অনেক ক্ষেত্রেই তা পেকে গিয়ে সাদা হয়ে আসে। দাঁতের গোড়ায়ও এই অ্যাবসেস বা ফোড়া হতে পারে। সাধারণত আগে থেকেই ক্ষতিগ্রস্ত কোনো দাঁতের গোড়ায় এই ফোড়া দেখা যায়। তবে এটি একদিনে বা হঠাৎ করে হয় না। এর জন্য অনেক সময় লাগে।

সাধারণত দাঁত ক্ষয়রোগ বা ক্যারিজে আক্রান্ত হওয়ার পরও যথাযথ চিকিৎসা না করলে, আঘাতে দাঁতের শিকড় বা শিকড়ের অংশবিশেষ ভেঙে গেলে, যথাযথভাবে দাঁত পরিষ্কার না করলে এ ধরনের ইনফেকশন হয়।

দাঁতে জীবাণুর সংক্রমণ দীর্ঘস্থায়ী হলে তা থেকে দেখা দিতে পারে বিভিন্ন জটিল রোগ। ছবি: ফ্রিপিক

লক্ষণ ও উপসর্গ

এ সময় ক্রমাগত দাঁতে ব্যথা হয়। ফলে মাড়ির নিচে শিরা–উপশিরাগুলি ফুলে যায়। দাঁতের সংক্রমণের সঙ্গে জড়িত অন্যান্য উপসর্গগুলো হল–

১. দাঁতে ঠান্ডা বা গরমের স্পর্শে সংবেদনশীলতা।

২. জ্বরের অনুভূতি।

৩. কিছু খাওয়ার সময় কামড়াতে বা চিবাতে অসুবিধা ও ব্যথার অনুভূতি।

৪. মুখে দুর্গন্ধ সৃষ্টি ইত্যাদি।

যেভাবে অ্যাবসেস তৈরি হয়

অ্যাবসেস সাধারণত শুরু হয় দাঁতের ক্যারিজ বা ক্ষয়রোগ থেকে। ক্যারিজ যখন দাঁতের এনামেল ও ডেন্টিন ক্ষয় করে দন্তমজ্জা বা পাল্পে প্রবেশ করে তখন প্রথমে দাঁতে ব্যথা হয়। এ সময় ক্যারিজ বা ক্ষয়রোগের কারণ যে ব্যাকটেরিয়াগুলো তারাও দ্রুত পাল্পে প্রবেশ করে এবং ধীরে ধীরে পাল্প পঁচিয়ে ফেলে। এই পচে যাওয়া পাল্প বা পাল্পপুঁজ তখন দাঁতের শিকড়ের ভেতরে থাকা নালি দিয়ে গোড়ায় চলে যায়। সেখানে থাকা অস্থিকেও ব্যাকটেরিয়া আক্রমণ করে এবং সেখানেও পচন শুরু হয়।

দাঁত যেহেতু হাড়ের ভেতর প্রতিস্থাপিত থাকে, তাই দাঁতের গোড়ায় পচন বা পুঁজ হওয়া মানে হাড়েও ইনফেকশন ছড়িয়ে যাওয়া। ধীরে ধীরে দাঁতের গোড়ার চারপাশে থাকা হাড় যখন পচে গিয়ে নরম মাংসে পৌঁছায়, তখনই আমরা ওই স্থানটি ফুলে যেতে দেখি। যেহেতু ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণে অ্যাবসেস হয়, তাই ডেন্টাল চিকিৎসা ছাড়াও অ্যান্টিবায়োটিক সেবনের প্রয়োজন হয়।

সনাক্তকরণ ও চিকিৎসা

সর্বপ্রথম কাজ হল দন্ত চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার সময় ঠিক করা। যাতে উনি পর্যবেক্ষণ করে দেখতে পারেন যে দাঁত ও মাড়ির কতটা অংশে পুঁজের সংক্রমণটি ছড়িয়েছে। দন্ত চিকিৎসক কিছু পরীক্ষা করার পরামর্শ দিতে পারেন, যা থেকে সংক্রমণটির বৃদ্ধি ও ছড়িয়ে পরার বিষয়ে জানা যাবে।

যে পরীক্ষাগুলি সাধারণত দাঁতের সংক্রমণ নির্ধারণে ব্যবহৃত হয় সেগুলি নিচে দেওয়া হল–

১. এক্স-রে- সংক্রমণের অবস্থান নির্ণয়ের জন্য করা হয়।

২. ওপিজি এক্সরে– দাঁত ও চোয়ালের বেড়ে যাওয়া সংক্রমণ পর্যবেক্ষণের জন্য ব্যবহৃত হয়।

সংক্রমণ এড়াতে সাধারণত যে সতর্কতাগুলি অবলম্বন করা হয় তার মধ্যে দাঁতের পরিষ্কার–পরিচ্ছন্নতা বিশেষভাবে জরুরি। চিকিৎসক প্রতিদিন দুবার দাঁত মাজার ও ফ্লসিংয়ের পরামর্শ দেন। যিতে প্লাক জমা হওয়া ও সংক্রমণ এড়ানোর সম্ভবপর হয়। তবুও, যখন সংক্রমণ ঘটে বা ছড়িয়ে পড়ে, তখন যে অ্যান্টিবায়োটিকের সঙ্গে যে চিকিৎসা পদ্ধতিগুলি ব্যবহার করা হয় তা হল–

১. পুঁজ ভর্তি ফোড়াগুলো বাদ দেওয়া- পুঁজ ভর্তি ফোড়া হলে, ব্যথা কমাতে চিকিৎসক ফোড়াগুলো থেকে পুঁজ বের করে দেন।

২. রুট ক্যানেল পদ্ধতি- দন্ত চিকিৎসক রুট ক্যানেল পদ্ধতির মাধ্যমে মাড়িতে ছড়িয়ে পরা সংক্রমণ ও জমা হওয়া পুঁজ বের করেন।

৩. প্রভাবিত দাঁতটি উপরে ফেলা- প্রভাবিত দাঁতটিতে রুট ক্যানেল পদ্ধতি যখন কার্যকরী হয়না তখন শেষ পদক্ষেপ হিসাবে দাঁতটি তুলে ফেলা হয়।

যথাযথভাবে দাঁত পরিষ্কার না করলে এ ধরনের ইনফেকশন হয়। ছবি: ফ্রিপিক

পরিশেষে বলতে চাই, শরীরের যে কোনো অঙ্গের মতো দাঁতের যত্নও অত্যন্ত জরুরি। তাই দাঁতকে ভালোভাবে সংরক্ষণ করতে নিয়মিত যত্ন ছাড়াও ডেন্টাল চেকআপ প্রয়োজন। দাঁতের সমস্যা সম্পর্কে আগে থেকে জানা থাকলে সমস্যার শুরুতেই সমাধান সম্ভব।

লেখক: ডেন্টাল সার্জন, সিকদার ডেন্টাল কেয়ার