স্টেরয়েডকে বলা হয়ে থাকে ম্যাজিক ড্রাগ। যেকোনো দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহজনিত রোগের প্রদাহ সাময়িকভাবে কমিয়ে দিতে পারে এই স্টেরয়েড। তাই এই ওষুধের ব্যবহার হঠাৎ করেই কমিয়ে দিতে পারে বিভিন্ন রোগের লক্ষণ। মনে হতে পারে রোগের উন্নতি হচ্ছে এবং চিকিৎসকরা এই সময়ের মধ্যে রোগের জন্য সুনির্দিষ্ট ওষুধের ব্যবহার শুরু করতে পারেন- যাতে দীর্ঘদিন রোগলক্ষণ নিয়ন্ত্রণে থাকে।
আবার, স্টেরয়েড খেলে শরীরে কিছুটা পানি জমে, তাই ওজন বাড়ানোর জন্য কিছু ফুড সাপ্লিমেন্টে স্টেরয়েড থাকে। হারবাল বা ভেষজ ওষুধেও চটকদার ফলাফল দেখানোর জন্য স্টেরয়েড মেশানো থাকতে পারে।
আর্থ্রাইটিস বা বাতরোগ, শ্বাসকষ্ট বা হাঁপানির রোগ, চর্মরোগ বা মারাত্মক অ্যালার্জি ও অন্যান্য কিছু রোগে সংকটাপন্ন ব্যক্তির রোগলক্ষণ কমাতে ওষুধ হিসেবে চিকিৎসকেরা অনেক সময় স্টেরয়েড দিয়ে থাকেন। এটা দেওয়া হয় খুব কম সময়ের জন্য। এরপর তা দ্রুত বন্ধ করে দেওয়া হয় বা ধীরে ধীরে মাত্রাটা কমিয়ে আনা হয়।
তবে, অন্যের প্রেসক্রিপশন দেখে ওষুধ খাওয়া অথবা ওষুধ বিক্রেতা বা হাতুড়ে চিকিৎসকের কথামতো বিভিন্ন ধরনের হারবাল বা হোমিওপ্যাথিক ওষুধ খাওয়া কিংবা চিকিৎসকের নির্দেশনামাফিক ফলোআপে না যাওয়ার (নির্দিষ্ট সময় পর পুনরায় চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া) প্রবণতার কারণে অনেকেই দীর্ঘমেয়াদে কিংবা ভুল মাত্রায় সেবন করে ফেলেন স্টেরয়েডজাতীয় ওষুধ।
দীর্ঘদিন অতিরিক্ত স্টেরয়েড জাতীয়ওষুধ খাওয়ার ফলে শরীরে দেখা দিতে পারে নানা ধরনের জটিলতা। যেমন– রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা বেড়ে ডায়াবেটিস হতে পারে, রক্তচাপ বেড়ে যেতে পারে, পাকস্থলীতে আলসার হতে পারে, হাড় ক্ষয়, মাংসপেশির দুর্বলতা এবং চোখে ছানি পড়তে পারে। পাশাপাশি শরীরের রোগ প্রতিরোধক্ষমতাও কমে যেতে পারে। আবার শরীরে পানি জমে মুখ ও পা ফুলে যেতে পারে।
দীর্ঘদিন এই ধরনের ওষুধ খেলে হাত-পায়ের মাংসপেশি ক্ষয় হয়ে গিয়ে পেটে অতিরিক্ত চর্বি জমে ওজন বাড়তে পারে। নারীদের ক্ষেত্রে মাসিক অনিয়মিত হতে পারে, মুখে বা শরীরে অবাঞ্ছিত লোমও দেখা যেতে পারে। আরও দীর্ঘদিন এই ওষুধ খেলে মাথার চুল অতিরিক্ত পড়ে যেতে পারে। এ ছাড়া ত্বক পাতলা, ত্বকে ফাটা দাগ এবং মুখে ব্রণ হতে পারে।
আরেকটা ক্ষতিকর দিক হলো, স্টেরয়েডের উপর নির্ভরশীলতা। ওষুধ বন্ধ করলেই শরীর দুর্বল লাগে, ক্লান্তি-অবসাদ, মাংসপেশি বা জয়েন্টে ব্যথার জন্য কোনো কিছুই করার শক্তি থাকে না। আসলে, যেকোনো মাত্রার স্টেরয়েড সেবনই শরীরে স্বাভাবিক স্টেরয়েড হরমোনের তৈরিতে ব্যাঘাত ঘটায়। তখন এ ধরনের লক্ষণ হতে পারে, যা রোগীকে সচল থাকার জন্য বারবার এই ধরনের ওষুধ খেতে বাধ্য করে। আবার রোগী হঠাৎ এই ওষুধ বন্ধ করে দিলে কখনো কখনো তীব্র সমস্যা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়। যেমন– শারীরিক দুর্বলতা, পেটব্যথা, বমি, শরীরে লবণের ঘাটতি, রক্তচাপ কমে যাওয়া, কখনো কখনো অজ্ঞান হয়ে পড়া।
চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া যেকোনো ওষুধ খাওয়াই যেমন সমস্যা, তেমনি চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি কোনো ওষুধ চালিয়ে যাওয়াও উচিত নয়। কখনো দীর্ঘমেয়াদে স্টেরয়েড গ্রহণ করতে হলে নিয়মিত রক্তচাপ, রক্তের গ্লুকোজ ইত্যাদি পরীক্ষা করতে হয় এবং সঙ্গে হাড়ক্ষয় প্রতিরোধের ওষুধ সেবন করতে হয়। তাই আমাদের সবার ওষুধ গ্রহণে সতর্ক হওয়া উচিত। যেকোনো ওষুধ গ্রহণের আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। আবার চটকদার বিজ্ঞাপন দেখে তাড়াতাড়ি রোগমুক্তির আশায় কোনো ওষুধ গ্রহণ করা উচিত নয়।
লেখক: এমবিবিএস, বিসিএস (স্বাস্থ্য), রেসিডেন্ট, বিএসএমএমইউ