ওজন কমানোর জন্য প্রয়োজন পরিমিত খাদ্যাভ্যাস ও নিয়মিত ব্যায়াম, কোনো কোনো ক্ষেত্রে ওষুধ এবং কিছু নির্দিষ্টক্ষেত্রে সার্জারি। এগুলোর ভেতর প্রথমেই আসে খাদ্যাভ্যাস। ওজন কমানোর ক্ষেত্রে শতকরা ৭০ ভাগই খাদ্যাভ্যাস। নেট দুনিয়ায় খোঁজ করলে এমন হাজারটা খাদ্যব্যবস্থা পাওয়া যাবে, যার মূলে রয়েছে কম ক্যালরির প্রোটিন ও ফাইবারসমৃদ্ধ সুষম খাবার।
মোটামুটি এইসব খাবার তালিকায় ৫০০ কিলোক্যালরির একটা ঘাটতি রাখা হয়, যেটা ওজন কমাতে সাহায্য করে। এ নিয়ে মূল ব্যাপারটা হচ্ছে, আমাদেরকে খেতে হবে সচেতনভাবে। যে খাবারটা খাব, চিন্তা করতে হবে তার পুষ্টিগুণ, খাবারের মধ্যে কোন উপাদান কতটুকু আছে।
ওজন কীভাবে কমাব?
আমরা যারা বাসার বাইরে কাজ করি, তাদের কাছে–পিঠে এখন শতশত ফাস্টফুডের আউটলেট। যে জায়গা গুলোর খাবার খেতে সুস্বাদু হলেও- ক্যালরি ও শর্করায় ঠাসা। তাই বাইরের ভাঁজা-পোড়া স্ন্যাকস খেয়ে আর যাই হোক, ওজন কমানো সম্ভব নয়। বিপরীতে বলতে হয়, খাবারের মজা বলেও একটা কথা আছে।
আমাদের মত অতিথি ও বন্ধুবৎসল দেশে- যেখানে সবাই মিলে পেটভরে খাওয়াটা একটা উৎসব, সেখানে একজনের খাওয়া আনন্দশূন্য করে দেওয়া-ও উচিত নয়। তাইতো এখন বলা হয় Mindful Eating–এর কথা। ছোট্ট একটা প্লেটে অর্ধেকটা সবজি নিয়ে, সম্ভব হলে কাঁটাচামচে, পরিবারের সবাই মিলে বসে, গল্প করতে করতে আস্তে আস্তে খাওয়া- যাতে অল্প খেয়েই মনে হয়- পরিতৃপ্ত!
ব্যায়াম ছাড়া আর কিছু কী জরুরি?
ওজন কমানোর জন্য আমরা ব্যায়াম করবো। ধীরে ধীরে ওজন কমে আসলে- সেটা ধরে রাখার জন্যও ব্যায়াম চালিয়ে যাব। শরীরের গঠন ও চাহিদা অনুযায়ী একেকজনের জন্য একেকধরণের ব্যায়াম, কিংবা ব্যায়ামের লিস্ট ভিন্ন হবে। তবে ব্যায়ামই সব না। ব্যায়ামের পাশাপাশি তাড়াতাড়ি ঘুমাতে যাওয়া, পরিমিত ঘুমানো (বয়স্কদের জন্য ৬-৮ ঘণ্টা), স্ট্রেস লেভেল কমিয়ে রাখা, ব্যায়ামের পর পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পান করা, স্ক্রিনটাইম কমিয়ে ফেলা (০২ ঘণ্টার কম), সৃষ্টিমূলক কাজে অংশগ্রহণ করে- মনকে উৎফুল্ল রাখা- এগুলোরও গুরুত্ব রয়েছে।
ওজন কীভাবে ধরে রাখবো?
দুশ্চিন্তার বিষয় হচ্ছে, শতকরা ৯৫ ভাগ ক্ষেত্রে- যারা ওজন কমিয়ে ফেলেন, তারা আবার আগের ওজনে ফিরে যান। গবেষণায় দেখা যায়, ওজন কমানোতে খাদ্যাভ্যাস ও ব্যায়ামের সমান ভূমিকা থাকলেও- ওজন ধরে রাখার জন্য নিয়মিত ব্যায়াম চালিয়ে যাওয়ার গুরুত্ব সর্বাধিক। ব্যায়াম সাধারণত কয়েকটা ভাগে ভাগ করে প্রেসক্রাইব করা হয়। ওজন কমানোর, ওজন ধরে রাখার কিংবা সুস্থ থাকার জন্য ব্যায়াম। আবার রয়েছে, মাংসপেশি গঠনের জন্য ব্যায়াম, হার্টকে সুস্থ রাখার ব্যায়াম। তবে, সেই ব্যায়ামই শুরু করা ভালো- যেটা নিয়মিত করে যাওয়া সম্ভবপর।
সপ্তাহে ১৫০ মিনিটের মাঝারি মাত্রার ব্যায়াম হতে পারে সবার জন্য উপকারী। স্মার্টফোনে স্টেপ কাউন্টার চালু রেখে, সহজে নিজের ব্যায়ামের পরিমাপও রাখা যায়। যারা আমরা ওজন কমানোর চেষ্টা করি- তারা প্রতিদিন ১০,০০০ স্টেপ, যারা ওজন ধরে রাখতে চাই- তারা ৮,০০০ স্টেপ। আর, শুধুমাত্র সচল ও সুস্থ থাকার জন্য ৬,০০০ স্টেপই যথেষ্ট।
ওজন কমে যাওয়া কখন দুশ্চিন্তার?
ওজন কমে যাওয়া শুধুই যে ভালো তা নয়। অনেক ক্ষেত্রে জীবনঘাতি অনেক অসুখ, ওজন কমে যাওয়ার লক্ষণ নিয়ে প্রকাশ পায়। তবে সেক্ষেত্রে ওজন কমে যাওয়াটা সাধারণত অনৈচ্ছিক এবং তার সঙ্গে খাওয়ার রুচিও কমে যায়। কোনোপ্রকারের চেষ্টা ছাড়া, ০৬ মাসে ০৩ কেজি বা এর বেশি ওজন কমে গেলে- সেটাকে গুরুত্বপূর্ণ ধরা হয়, এবং সেক্ষেত্রে অবশ্যই আমাদের চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে।
শিল্পায়নের সঙ্গে সঙ্গে কায়িকশ্রমের দায়ভার যন্ত্রের উপর চাপানো আর তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ফাস্টফুডের প্রতি অনুরক্ততা, শারীরিক স্থূলতার সংখ্যা বাড়িয়ে চলেছে ছোট-বড় সকল বয়সে। এখনই আচরণগত পরিবর্তন না আনলে, সামনে আমাদের জন্য এটাই একটা প্যানডেমিক হতে চলেছে। বিশেষজ্ঞরা তাই গুরুত্ব বোঝানোর জন্য, স্থূলতাকে এখন একটা অবস্থা না বলে, রোগ বলতে চান।
আমরা যারা ওজন কমাতে চাই, সবাই সহজ কয়েকটা ব্যবহারিক উপদেশ মনে রাখতে পারি, যেমন-
১. চিনিযুক্ত পানীয় পান না করা।
২. ঘণ্টা বা তার বেশি সময় ব্যায়াম করা।
৩. ঘণ্টা বা তার কম স্ক্রিনটাইমে সময় দেওয়া।
৪. প্রতিদিন পর্যাপ্ত পানি পান করা।
৫. প্রতিদিন ফল ও সবজি খাওয়া।
লেখক: এমবিবিএস, বিসিএস (স্বাস্থ্য), রেসিডেন্ট, বিএসএমএমইউ


ওজন যতটা কমলে দুশ্চিন্তা করতেই হবে
আচার খেলেও কি ওজন বাড়ে?
