শরীরের কিছু কোষ যদি দ্রুত হারে বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং এর ফলে শরীরে অসংখ্য অস্বাভাবিক কোষের সৃষ্টি হয় কিংবা এই অস্বাভাবিক কোষের বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব না হয় অথবা এই অস্বাভাবিক কোষসমূহ যদি শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ প্রত্যঙ্গে ছড়িয়ে পরে, তবে তা ক্যানসার হিসেবেই চিহ্নিত করা হয়। মানব দেহের সব অঙ্গ প্রত্যঙ্গেই ক্যানসার হতে পারে।
সাধারণত কোষের জিনগত অস্বাভাবিকতা এবং জিনের নানারকম ক্ষতি বা পরিবর্তনের কারণে ক্যানসার হয়। কোষের এই জিনগত পরিবর্তন বিভিন্ন কারণে হতে পারে। যেমন:
১. জেনেটিক রোগ- লি-ফ্রোমেনি সিনড্রোম এর কারণে হাড়ের ক্যানসার, ব্রেস্ট বা স্তন ক্যানসার, সফট টিস্যু সারকোমা, মস্তিষ্কের ক্যানসার, ডাউন সিনড্রোম এর কারণে লিউকিমিয়া বা ব্লাড ক্যানসার এবং টেষ্টিকুলার ক্যানসার হতে পারে।
২. তেজস্ক্রিয় রশ্মি যেমন আলফা (α) কণা, বিটা (β) কণা এবং গামা (γ) রশ্মি সমূহের কারণে মানুষের শরীরে ক্যানসার হতে পারে। সূর্যের আলোর অতিবেগুনী রশ্মি থেকেও ক্যানসার হতে পারে।
৩. কিছু ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ যেমন– রেডিয়াম, অ্যাসবেস্টসের গুঁড়ো, টার বা আলকাতরা ইত্যাদির সংস্পর্শে থাকাও ক্যানসারের উল্লেখযোগ্য কারণ।
৪. ধূমপান, মদ্যপান, খাবারের রং, খাবার সংরক্ষণের কেমিক্যাল, বারবিকিউ বা ঝলসানো মাংস খেলে ক্যানসার হতে পারে।
৫. হরমোনের তারতম্যের কারণ স্ত্রী দেহে ইস্ট্রোজেন হরমোনের মাত্রার তারতম্যের ফলে ইউটেরাসের ক্যানসার হতে পারে।
৬. কিছু কিছু জীবাণু বিশেষ করে ভাইরাসের কারণে ক্যানসার হতে পারে। যেমন:
- এপস্টেইন- বার ভাইরাস (EPV) থেকে বার্কিট লিম্ফোমা নামক ক্যানসার হতে পারে ।
- হিউম্যান টি লিম্ফোট্রপিক ভাইরাস (HTLV-1) থেকে টি কোষ লিউকেমিয়া হতে পারে।
- হেপাটাইটিস-সি ভাইরাস (HCV), হিউম্যান ইমিউনোডেফিসিয়েন্সি ভাইরাস (HIV), ভাইরাস থেকে লিমফোমা হতে পারে।
- হেপাটাইটিস-বি ও হেপাটাইটিস-সি ভাইরাস থেকে লিভার ক্যানসার হতে পারে।
- হিউম্যান ইমিউনোডেফিসিয়েন্সি ভাইরাস (HIV), হিউমেন হারপিস ভাইরাস-৮ (HHV-8), থেকে ক্যাপোসিস সারকোমা হতে পারে।
- হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস (HPV)-এর থেকে জরায়ু মুখের ক্যানসার হতে পারে।
- এইচ পাইলোরি (H. Pylori) ব্যাক্টেরিয়ার জন্য পাকস্থলীতে ক্যানসার হতে পারে
- সিস্টোসমা প্যারাসাইট থেকে মূত্রথলির ক্যানসার হতে পারে।
- লিভার ফ্লুক প্যারাসাইট থেকে কোলেঞ্জিওকারসিনোমা হতে পারে।
কিছু খাবার আছে যা ক্যানসার চিকিৎসা চলাকালীন খাওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। ক্যানসার আক্রান্ত রোগীরা ফ্রেশ সব খাবার খেতে পারবেন। তবে এর মধ্যে কিছু খাবার ক্যানসার রোগীরা খাবেন না। এসব খাবার তাদের জন্য ক্ষতিকর। যেসব খাবার ক্যানসার রোগীরা খাবেন না সেগুলো হলো:
১. ফ্রিজে রাখা খাবার, বাসি খাবার, ক্যানসার রোগীরা খাবেন না।
২. প্রক্রিয়াজাত খাবার বা ফাস্ট ফুড, সিঙ্গাড়া, সমুচা ও অতিরিক্ত মসলাজাতীয় খাবার খাওয়া, ভাজাপোড়া খাবার, লাল মাংস খাওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে।
৩. বারবিকিউ জাতীয় খাবার অর্থাৎ যেসব খাবার সরাসরি আগুনে পুড়িয়ে তৈরি করা হয় সেসব খাবার খাবেন না।
৪. ক্যানসার রোগীকে আটা বা ময়দার তৈরি কোনো খাবার দেওয়া চলবে না। আটা বা ময়দাতে গ্লুটেন থাকে, যার ফলে রোগীর হজমশক্তিকে নষ্ট করে দেয়।
৫. খাদ্য সংরক্ষণে ফরমালিন নিষিদ্ধ হয়েছে অনেক আগে। তবে নানারকম প্রিজারভেটিভের ব্যবহার চলছেই। প্রিজারভেটিভ দেওয়া খাবার খাবেন না।
৬. ক্যানসারের চিকিৎসা চলাকালীন মাল্টা, কমলা, কামরাঙা, বাঁধাকপি এবং হলুদ এড়িয়ে চলা উচিত।
৭. আদাজাতীয় খাবার ক্যানসার রোগীকে কোনো অবস্থাতেই খাওয়ানো যাবে না। আদা শরীরে রক্ত জমাট বাঁধতে দেরি করায়। ফলে ক্যানসার রোগীর ক্ষত শুকাতে দেরি হয়, যা মোটেও কাম্য নয়।
৮. ধূমপান করা যাবে না। মানবদেহে যত ধরনের ক্যানসার হয়, তার ৩০ শতাংশের ক্ষেত্রেই ধূমপান ও তামাকের সরাসরি ভূমিকা রয়েছে। তাই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ধূমপান হতে বিরত থাকুন।
ক্যানসার রোগীরা যা যা খেতে পারবেন:
১. কেমোথেরাপির সময় ক্যানসার রোগীকে নরম ভাত খাওয়াতে হবে। নরম ভাতের সঙ্গে তেল-মসলা কম দিয়ে মাছ, ছোট মুরগী, তরকারি খাওয়াতে হবে। এ সময় রোগীকে বেশি করে পানি পান করাতে হবে।
২. সবুজ শাকসবজি, কচুশাক, লালশাক, ডাঁটাশাক খাওয়াতে হবে।
৩. হিমোগ্লোবিন কমে গেলে বিট রুটের শরবত, আনার, লেবুর রস মিশিয়ে দেওয়া যেতে পারে।
৪. ক্যানসার রোগীকে টমেটো স্যুপ দেওয়া যেতে পারে। টমেটো স্যুপে যে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকে, তা ক্যানসার প্রতিরোধেও সাহায্য করে।
৫. ক্যানসার রোগীকে প্রতিদিন একটি করে রসুন খাওয়াতে পারেন। রসুন একপ্রকার অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট।
লেখক: জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও পরিচালক, বিজিসি ট্রাস্ট মেডিকেল কলেজ হসপিটাল, চট্টগ্রাম