ডায়াবেটিস এমন একটি রোগ, যা মুখসহ পুরো শরীরকে প্রভাবিত করতে পারে। ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে। সবার জানা জরুরি, এ রোগের প্রভাব মারাত্মক হলেও সঠিক জ্ঞান ও তার অনুশীলনের মাধ্যমে একে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
বিভিন্ন প্রচারমাধ্যমের সহায়তায় ও চিকিৎসকদের সচেতনতামূলক পরামর্শে অনেকেই এখন ডায়াবেটিসজনিত জটিলতা থেকে চোখ, পা, স্নায়ু, কিডনি বা হার্টকে রক্ষা করতে সচেতন হচ্ছেন। তবে মুখের যত্নের ব্যাপারে উদাসীনতা এখনও স্পষ্ট। যেমন- সঠিক নিয়মে নিয়মিত দাঁত ও মুখ পরিষ্কার না করা।
ডায়াবেটিস রোগীদের ডেন্টাল যত্নের কোনো বিকল্প নেই। অনেকের ধারণা, ডেন্টাল মানে শুধুই দাঁত, ডেন্টাল শব্দের প্রকৃত অর্থ হচ্ছে দাঁত-সম্পর্কীয়। এখানে দাঁতসহ মাড়ি, জিহ্বা, তালু, চোয়ালের ভেতরের অংশ, ঠোঁট, লালা ও লালাগ্রন্থি, চোয়ালের হাড় সবই অন্তর্ভুক্ত।
ডায়াবেটিস রোগীদের মাড়ির সংক্রমণের আশঙ্কা বেশি থাকে এবং তা চোয়ালের হাড়গুলোকেও সংক্রমিত করে।
কারণ
১. উচ্চ রক্ত সরবরাহের কারণে মুখ শুকনা হয় এবং মাড়িগুলো দুর্বল হয়ে পড়ে।
২. লালা নিঃসরণ কমে গিয়ে মুখ শুষ্ক হয়ে যাওয়ার ফলে লালার স্বাভাবিক কাজ যেমন- মুখ ও দাঁতকে ধৌত করা, জীবাণু বৃদ্ধি রোধ করা, খাবার খেতে ও স্বাদ গ্রহণে সাহায্য করা, মুখে ঘর্ষণজনিত মাইক্রো আলসার প্রতিরোধ করা প্রভৃতি ব্যাহত হয়। ফলে মাড়ির রোগ, দাঁতে গর্ত বা ক্যারিজ, মুখে জ্বালাপোড়া, খাদ্য গ্রহণে সমস্যা, মুখে দুর্গন্ধসহ নানা সমস্যা তৈরি হতে পারে।
৩. মাড়ির রোগের সঙ্গে ডায়াবেটিসের নিবিড় সম্পর্ক। মাড়ির সংক্রমণ থেকে মাড়ি ফুলে যায়, রক্ত পড়ে, দাঁত নড়ে যায়, এমনকি পড়েও যেতে পারে।
৪. রক্তনালির স্থিতিস্থাপকতা কমে যাওয়ায় ও রক্তে শ্বেতকণিকার কার্যকারিতা হ্রাস পাওয়ার ফলে ডায়াবেটিস রোগীদের মুখে ছত্রাক সংক্রমণসহ নানা সংক্রমণ অনেক বেশি দেখা যায়।
৫. ডায়াবেটিস আক্রান্ত রোগীদের দাঁতের গোড়া বা মাড়িতে নানা সংক্রমণ হওয়ার আশঙ্কা থাকে। রক্তে শর্করার মাত্রাধিক্য হাড়ক্ষয়ের গতি বাড়িয়ে দেয়। ফলে মাড়ির নিচে থাকা হাড় ক্ষয়ে গিয়ে দাঁত আলগা হয়ে যায় এবং দাঁত ও মাড়ির মাঝখানে পকেট তৈরি হয়ে খাবার জমে দাঁত ক্ষয়ে যেতে শুরু করে। তবে রক্তে চিনির মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখলে এসব সমস্যার ঝুঁকি কমে।
করণীয়
১. সঠিকভাবে দাঁত ব্রাশ (সকালে নাশতার পরে এবং রাতে ঘুমানোর আগে)।
২. ব্রাশ করার পাশাপাশি ফ্লসিং করা দরকার। দাঁতের ফাঁকে যেন খাবার আটকে না থাকে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
৩. ডেন্টাল সার্জনের পরামর্শে মাউথ ওয়াশ দিয়ে ভালো করে কুলকুচি করতে হবে।
৪. ডায়াবেটিসে স্টিকি বা মিষ্টি দেওয়া চটচটে খাবার (যেমন- কেক, জ্যাম জেলি, পেস্ট্রি, চকলেট ইত্যাদি) খাওয়া মানা। তবু অনেকেই এসব খাবার খেয়ে ফেলেন। এ ধরনের খাবার খেয়ে সঙ্গে সঙ্গে কুলকুচি করে মুখ ধুয়ে নেওয়া উচিত।
৫. ধূমপানসহ যেকোনো তামাক ব্যবহার একেবারেই মানা।
৬. ‘সুগার ফ্রি চুইংগাম’ ব্যবহার করা যেতে পারে। এতে মুখের লালা নিঃসরণ কিছুটা বাড়ে।
৭. ডায়াবেটিসের রোগীদের ভাঙা বা ধারালো দাঁত থেকে অনেক সময় মুখে ঘা হতে পারে। এ বিষয়েও সতর্ক থাকতে হবে।
মনে রাখা উচিত, ডায়াবেটিস থাকলে নার্ভের কার্যক্ষমতা ও সংবেদনশীলতা কমে যায়। ফলে ডায়াবেটিসের রোগীরা দাঁতে অসুবিধা হলেও শিরশিরানি বা ব্যথা চট করে টের পান না। আর এ কারণেই বছরে দুবার ডাক্তারের কাছে গিয়ে দাঁত পরীক্ষা করালে ছোটখাটো সমস্যা ধরা পড়ে। সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসা করালে ভোগান্তি থেকে রেহাই পাওয়া যায়।
লেখক: ডেন্টাল সার্জন, সিকদার ডেন্টাল কেয়ার


দাঁত ব্যথার সঙ্গে চোখের সম্পর্ক আছে কি?
হঠাৎ ভেঙে গেছে দাঁত? জেনে নিন করণীয়
