প্যালিয়েটিভ কেয়ার, যা নিরাময় অযোগ্য জীবন সীমিত রোগে আক্রান্ত রোগীদের শারীরিক, মানসিক, সামাজিক কষ্ট লাঘবের লক্ষ্যে স্বাস্থ্যসেবার একটি অপরিহার্য অংশ, তা বিশ্বজুড়ে লক্ষাধিক নারীর নাগালের বাইরে। বিশ্বব্যাপী, নারীরা প্যালিয়েটিভ কেয়ার প্রয়োজন–এমন রোগ; যেমন, ক্যানসার, এইডস/এইচআইভি এবং অর্গান ফেইলিউরের বোঝা অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে বহন করে। অথচ তারা এসব সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে কাঠামোগত বাধার মুখোমুখি হয়। ২০২৩ সালের বিএমজে গ্লোবাল হেলথ গবেষণা অনুসারে, নিম্ন ও মধ্য আয়ের দেশগুলোতে নারীরা পুরুষদের তুলনায় ৩০ শতাংশ কম ব্যথানাশক সেবা পায়, যা মূলত স্বাস্থ্য খাতে লৈঙ্গিক পক্ষপাত ও আর্থ-সামাজিক বৈষম্যের কারণে।
বাংলাদেশে পরিস্থিতি ভয়াবহ। দেশে ৫০টিরও কম প্যালিয়েটিভ কেয়ার কেন্দ্র রয়েছে, যার বেশির ভাগই ঢাকা ও চট্টগ্রামের মতো শহুরে এলাকায় কেন্দ্রীভূত। ফলে গ্রামীণ নারী–যারা মোট নারী জনসংখ্যার ৭০ শতাংশ–তারা এসব সেবা থেকে বঞ্চিত। সাংস্কৃতিক রীতিনীতি সমস্যাকে আরও তীব্র করে। নারীরা প্রায়ই পরিবারের স্বাস্থ্যকে নিজের চেয়ে অগ্রাধিকার দেয় এবং জরায়ু বা স্তন ক্যান্সারের মতো রোগ সম্পর্কে সমাজের কুসংস্কার রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসাকে বিলম্বিত করে। ২০২৪ সালের জার্নাল অব পেইন অ্যান্ড সিম্পটম ম্যানেজমেন্ট গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের মাত্র ৮ শতাংশ নারী প্রাণঘাতী রোগে পেশাদার প্যালিয়েটিভ কেয়ার পান, যেখানে পুরুষদের ক্ষেত্রে এই হার ২২ শতাংশ। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কেস স্টাডিতে ৪৫ বছর বয়সী জরায়ু ক্যানসার রোগী আয়েশা বেগমের গল্প উঠে এসেছে, যিনি মরফিন পাওয়ার আগে মাসের পর মাস তীব্র যন্ত্রণা সহ্য করেছেন, যা পদ্ধতিগত অবহেলারই প্রতিচ্ছবি।
সমস্যার বিবৃতি: সহমর্মিতার সংকট
বাংলাদেশে প্যালিয়েটিভ কেয়ারের ঘাটতি একটি মানবিক সংকট, যা কাঠামোগত ও সাংস্কৃতিক ব্যর্থতার শিকড় থেকে উৎপন্ন:
অবকাঠামোর স্বল্পতা: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) প্রতি ১ লাখ মানুষের জন্য একটি প্যালিয়েটিভ কেয়ার কেন্দ্রের সুপারিশ করে। বাংলাদেশে এই হার প্রতি ১ লাখে ০.০৩টি, এবং গ্রামীণ এলাকাগুলো প্রায় অপরিসেবিত।
লৈঙ্গিক অসমতা: গভীরভাবে প্রোথিত পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থা নারী স্বাস্থ্যকে দ্বিতীয় শ্রেণির হিসেবে চিহ্নিত করে। ২০২৩ সালে প্রথম আলো‑এর তদন্তে পাওয়া গেছে, ৬৮% নারী রোগীকে ‘ব্যয়বহুল’ জীবনাবসানকালীন সেবা নেওয়া থেকে নিরুৎসাহিত করা হয়।
অপিয়েড সেবায় বাধা: কঠোর মাদক নিয়ন্ত্রণ আইন ও অপ্রতুল প্রশিক্ষণের ফলে ২০২২ সালের ল্যানসেট প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের ৯০ শতাংশ স্বাস্থ্যকর্মী ব্যথা ব্যবস্থাপনায় অপ্রস্তুত।
সচেতনতার অভাব: প্যালিয়েটিভ কেয়ারকে ‘হার মানা’ হিসাবে ভুল ধারণা পরিবারগুলোকে এড়িয়ে যেতে উদ্বুদ্ধ করে।
পরিণতি: নারী, পরিবার ও সমাজের ওপর চাপ
এই ঘাটতি অমোচনীয় থাকলে দুর্ভোগের চক্র চলতেই থাকবে:
শারীরিক ও মানসিক আঘাত: ব্যথানাশক ছাড়া নারীরা প্রতিরোধযোগ্য যন্ত্রণা ভোগ করে। ২০২৪ সালের পাবমেড-সূচিত গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশি নারীদের মধ্যে চিকিৎসাবিহীন ক্যানসার ব্যথা ডিপ্রেশনের ঝুঁকি ৪০ শতাংশ বাড়ায়।
অর্থনৈতিক বিপর্যয়: পরিবারগুলো ব্যর্থ চিকিৎসার জন্য সম্পত্তি বিক্রি করে। বিশ্বব্যাংক অনুমান করে, স্বাস্থ্যসেবা সম্পর্কিত খরচের কারণে প্রতি বছর বাংলাদেশের ১২ শতাংশ পরিবার দারিদ্র্যের মুখে পড়ে।
স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার চাপ: প্যালিয়েটিভ সহায়তা বাড়িতে পরিচালনা করা গেলে এমন রোগীরা জরুরি বিভাগে ভিড় জমাতেন না। কারণ গবেষণা ভিত্তিক উপাত্তের মতে অধিকাংশ মানুষই মারা যেতে চান নিজের ঘরে। হাসপাতালে নয়। আর কিছু করার নেই বাড়ি নিয়ে যান বলে হাসপাতালও এই মানুষগুলোকে শেষ পর্যন্ত পরিত্যাগ করে।
প্রজন্মান্তরে প্রভাব: শিশুরা, বিশেষত মেয়েরা, অসুস্থ মায়ের দেখভালের জন্য স্কুল ছাড়ে–যা লৈঙ্গিক বৈষম্যকে বাড়িয়ে দেয়।
সমাধান: বাংলাদেশের জন্য অগ্রগতির পথ
এই সংকট সমাধানে করণীয়:
নীতিগত সংস্কার: জাতীয় স্বাস্থ্য নীতিতে প্যালিয়েটিভ কেয়ার এবং সমাজ প্যালিয়েটিভ সেবার জন্য জাতীয় অর্থনীতিতে বাজেট বরাদ্দ প্রয়োজন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশিকা অনুসরণ করে ভারতের ২০১৪ সালের মডেলের মতো মরফিন প্রাপ্যতা ৩০০ শতাংশ বাড়ানো প্রয়োজন। কারণ, ঢাকা শহরেই যেখানে সবখানে মরফিন সহজলভ্য নয়, সেখানে ঢাকার বাইরের অবস্থা সহজেই অনুমেয়। উপরন্ত কতজন নবীন চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশনে মরফিন লেখার অভিজ্ঞতা আছে, অথবা নার্সের রোগীকে মরফিন প্রদানের অভিজ্ঞতা আছে, সেই প্রশ্ন তুললে অধিকাংশ উত্তরই নেতিবাচক দেখা যাবে।
প্রশিক্ষণ ও কর্মী সংখ্যা বৃদ্ধি: নার্স ও মাঠকর্মীদের প্যালিয়েটিভ কেয়ারের মৌলিক প্রশিক্ষণ প্রদান এখন সময়ের দাবি। উগান্ডার সফল মডেল অনুসারে বাংলাদেশের ৬০,০০০ মাঠকর্মীকে কাজে লাগানো যেতে পারে।
প্যালিয়েটিভ কেয়ার সোসাইটি অব বাংলাদেশ-এর মতো দাতব্য সংগঠনগুলোর সাথে অংশীদারত্ব করে গ্রামীণ পর্যায়ে সেবা সম্প্রসারণ প্রয়োজন।
লৈঙ্গিক সংবেদনশীল সচেতনতামূলক প্রচারণা: মিডিয়া ও ধর্মীয় নেতাদের ব্যবহার করে প্যালিয়েটিভ কেয়ার সেবা প্রাপ্তির বৈষম্য দূর করা প্রয়োজন। ২০২৩ সালের সোশ্যাল সায়েন্স অ্যান্ড মেডিসিন গবেষণায় দেখা গেছে, সিলেটের ইমামরা মাতৃস্বাস্থ্য প্রচারে কার্যকর ভূমিকা রেখেছেন। এ ক্ষেত্রে আয়েশা বেগমের মতো নারীদের গল্প তুলে ধরে সমস্যাকে মানবিক করে তোলা যায়।
ডেটা ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ: ২০২৪ সালের ব্রিটিশ মেডিকেল জার্নাল (বিএমজে)‑এর সম্পাদকীয় সুপারিশ অনুযায়ী, প্যালিয়েটিভ কেয়ারের চাহিদা নির্ণয়ে জাতীয় রেজিস্ট্রি চালু করা প্রয়োজন।
আন্তর্জাতিক নারী দিবস ২০২৫-এ কর্মের ডাক
‘অধিকার, সমতা, ক্ষমতায়ন নারী ও কন্যার উন্নয়ন’ প্রতিপাদ্যে বিশ্বজুড়ে আন্তর্জাতিক নারী দিবস ২০২৫ পালনের প্রাক্কালে বাংলাদেশ একটি নিদারুণ মুহূর্তের মুখোমুখি। প্যালিয়েটিভ কেয়ারের ঘাটতি পূরণ করা কেবল চিকিৎসাগত অপরিহার্যতা নয়, বরং নারীদের জন্য মর্যাদা ও ন্যায়বিচারের এই দিনের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ একটি নৈতিক দায়িত্ব। লৈঙ্গিক সংবেদনশীল নীতি, প্রশিক্ষণ ও সম্প্রদায় সম্পৃক্ততার মাধ্যমে বাংলাদেশ জীবনাবসানকালীন সেবাকে একটি অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারে। নিষ্ক্রিয়তার মূল্য–হারানো জীবন, ভাঙা পরিবার ও সামাজিক বৈষম্য–এতটাই উচ্চ যে, তা এড়ানো যায় না। ২০২৫ হোক সেই বছর, যখন বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় সহানুভূতিপূর্ণ ও সাম্যভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবার নেতৃত্ব দেবে।
সূত্র
১. বিএমজে গ্লোবাল হেলথ (২০২৩)। "বৈশ্বিক প্যালিয়েটিভ কেয়ার সুবিধায় লৈঙ্গিক বৈষম্য।"
২. প্রথম আলো (২০২৩)। "বাংলাদেশের গ্রামীণ নারীদের নীরব যন্ত্রণা।"
৩. দ্য ল্যানসেট (২০২২)। "এলএমআইসিতে অপিয়েড প্রাপ্যতা: বাংলাদেশের কেস স্টাডি।"
৪. বিশ্ব ব্যাংক (২০২৪)। "দক্ষিণ এশিয়ায় স্বাস্থ্যসেবা-প্ররোচিত দারিদ্র্য।"
৫. সোশ্যাল সায়েন্স অ্যান্ড মেডিসিন (২০২৩)। "স্বাস্থ্য প্রচারে ধর্মীয় নেতাদের ভূমিকা।"
লেখক: চিকিৎসক ও শিক্ষক,কাউন্সিলর এবং সাইকোথেরাপি প্র্যাকটিশনার ফিনিক্স ওয়েলনেস সেন্টার বাংলাদেশ