যে অসুখে মানুষ সব ভুলে যায়

আমাদের আশপাশে এমন অনেকেই আছেন, যারা প্রায় সময় বলে থাকেন—‘আমি ভুলে গেছি’। কল্পনা করুন, যদি আপনার পরিচিত মানুষ, কাছের মানুষ, এমনকি নিজের নাম-পরিচয়ও একসময় ভুলে যান? তাহলে কেমন হবে?

এমন এক মস্তিষ্কজনিত অসুখ আছে, যেখানে ধীরে ধীরে একজন মানুষ তার স্মৃতি, চেনা পরিবেশ, এমনকি নিজের অস্তিত্বও হারিয়ে ফেলেন। এই ভয়াবহ ও নির্মম অসুখের নাম আলঝেইমার রোগ।

আলঝেইমার কী?

আলঝেইমার একটি নিউরোডিজেনারেটিভ (স্নায়ু ক্ষয়জনিত) অসুখ। এটি মস্তিষ্কের কোষগুলোকে ধীরে ধীরে নষ্ট করে দেয়। ফলে ব্যক্তি স্মৃতি, চিন্তা, ভাষা এবং দৈনন্দিন কাজের দক্ষতা হারাতে শুরু করেন। এটি ডিমেনশিয়ার (Dementia) একটি সবচেয়ে প্রচলিত ও মারাত্মক ধরণ।

উপসর্গগুলো কী কী?

আলঝেইমারের প্রাথমিক উপসর্গগুলো সাধারণত ভুলে যাওয়ার মধ্য দিয়ে শুরু হয়। এ ছাড়া যেসব উপসর্গগুলো প্রকাশ পায়, সেগুলো হলো:

  • সাম্প্রতিক ঘটনা বা কথাবার্তা ভুলে যাওয়া।
  • বারবার একই প্রশ্ন করা।
  • পরিচিত জায়গায় পথ ভুলে যাওয়া।
  • শব্দ খুঁজে পেতে অসুবিধা হওয়া।
  • সিদ্ধান্ত নিতে অসুবিধা।
  • মানসিকভাবে স্থবির ও বিহ্বল হয়ে পড়া।

এই উপসর্গগুলো ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। একসময় রোগী তার পরিবারের সদস্যদের চিনতে পারেন না, খাবার খেতে ভুলে যান, এমনকি নিজেকে পরিচয় দিতেও অক্ষম হয়ে পড়েন।

কাদের বেশি হয়?

  • সাধারণত ৬৫ বছরের বেশি বয়সীদের মধ্যে এই রোগ দেখা যায়, যদিও ইয়াং-অনসেট আলঝেইমার নামক একটি ধরণে ৪০–৫০ বছর বয়সেও শুরু হতে পারে।
  • যাদের পরিবারে এই রোগের ইতিহাস আছে, তাদের ঝুঁকি বেশি।
  • দীর্ঘমেয়াদি ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, ডিপ্রেশন ও স্থূলতা এই রোগের সহায়ক হতে পারে।

একজন রোগীর গল্প

রোকেয়া বেগম, বয়স ৭২, এক সময় স্কুলের শিক্ষিকা ছিলেন। স্মার্ট, স্মৃতিশক্তিতে প্রখর, সংগঠনের কাজেও ছিলেন অগ্রণী। কয়েক বছর আগে তিনি তার মেয়ের নাম ভুলে যান। তারপর ধীরে ধীরে রান্না করতে ভুলে যেতে লাগলেন, নিজের জামাকাপড় কোথায় রেখেছেন, সেটাও মনে রাখতে পারতেন না। আজ তিনি বিছানায় শুয়ে থাকেন—চোখে শূন্যতা, মুখে অজানা হাসি, সামনে দাঁড়িয়ে থাকা স্বামীকেও চিনতে পারেন না। তার পরিচয়, তার স্মৃতি, সব যেন কোথাও হারিয়ে গেছে।

সাইকোলজিক্যাল প্রভাব

এই রোগ শুধু রোগীকেই নয়, পুরো পরিবারকেও ভীষণভাবে প্রভাবিত করে। যেমন:

  • রোগী মানসিকভাবে অত্যন্ত বিভ্রান্ত, হতাশ, কখনো কখনো আগ্রাসী হয়ে উঠতে পারেন।
  • পরিবারের সদস্যদের মানসিক চাপ ও ক্লান্তি বেড়ে যায়।
  • অনেক সময় রোগী নিজের শরীরচর্চা ও স্বাস্থ্যবিধি ভুলে যান। এতে রোগী অন্যের উপর পরিপূর্ণ নির্ভরশীল হয়ে পড়েন।

চিকিৎসা আছে?

দুঃখজনকভাবে, আলঝেইমারের এখনও কোনো নিশ্চিত প্রতিকার নেই। তবে কিছু ওষুধ আছে, যা রোগের অগ্রগতি কিছুটা ধীর করতে পারে। মনোচিকিৎসা, স্মৃতি উন্নয়ন অনুশীলন এবং রোগীকে সহানুভূতির সঙ্গে দেখা ও যত্ন করাও গুরুত্বপূর্ণ।

করণীয়

  • পরিবারের সদস্যদের রোগীর সঙ্গে ধৈর্যশীল আচরণ করা।
  • রোগীর রুটিন ঠিক রাখা।
  • পুরোনো ছবি, গান বা পরিচিত জিনিসের মাধ্যমে স্মৃতি জাগিয়ে তোলা।
  • মানসিক ও সামাজিক সহায়তা দেওয়া।
  • কেয়ারগিভারদের মানসিক সাপোর্ট নিশ্চিত করা।

প্রতিরোধ কীভাবে?

পুরোপুরি প্রতিরোধ সম্ভব না হলেও, নিচের অভ্যাসগুলো আলঝেইমারের ঝুঁকি কমাতে পারে: যেমন–

  • নিয়মিত মানসিক ব্যায়াম (পাজল, বই পড়া)।
  • স্বাস্থ্যকর খাবার।
  • রক্তচাপ ও সুগার নিয়ন্ত্রণে রাখা।
  • সামাজিক সংযুক্তি বজায় রাখা।
  • পর্যাপ্ত ঘুম।

আলঝেইমার এমন এক অসুখ, যেখানে একজন মানুষ ধীরে ধীরে নিজের অস্তিত্ব ভুলে যান। অথচ তার আশেপাশের মানুষ তখনো তাকে ভালোবাসে, তাকে মনে রাখে। এই রোগ আমাদের মনে করিয়ে দেয়—মানুষ শুধু মস্তিষ্ক নয়, তার পরিচয় ভালোবাসা ও যত্নেও নিহিত।

আসুন, আলঝেইমার আক্রান্তদের পাশে দাঁড়াই—ভুলে যাওয়া একজন মানুষকেও যেন আমরা মনে রাখি।

লেখক: সাইকোলজিস্ট, শান্তিবাড়ী