প্লাস্টিক ভেঙে ছোট ছোট টুকরোতে পরিণত হয়, যা মাইক্রোপ্লাস্টিক নামে পরিচিত। এই মাইক্রোপ্লাস্টিক বাতাস, পানি এবং খাদ্যচক্রে প্রবেশ করে জীবজগতের ক্ষতিসাধন করছে। প্লাস্টিক দূষণ শুধু পরিবেশের জন্য নয়, মানবস্বাস্থ্যের জন্যও একটি হুমকি। গবেষণায় দেখা গেছে, প্লাস্টিক থেকে নির্গত রাসায়নিক পদার্থ মানবদেহে প্রবেশ করে হৃদরোগ, ক্যানসার, হরমোনের ভারসাম্যহীনতা, বন্ধ্যাত্ব, স্নায়ুবিক সমস্যা এবং মৃত্যুঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
প্লাস্টিক দূষণ প্রতিরোধে ব্যক্তি, সমাজ ও সরকারের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। টেকসই বিকল্প ব্যবহার এবং কঠোর নীতি প্রণয়নের মাধ্যমে আমরা একটি প্লাস্টিকমুক্ত ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে পারি। প্লাস্টিক মুক্ত পৃথিবীই হবে আগামী প্রজন্মের জন্য সবচেয়ে বড় উপহার।
বাংলাদেশে পলিথিন নিষিদ্ধ হলেও বাজার দখল করেছে টিস্যু ব্যাগ (যা আসলে প্লাস্টিকের)। পলিথিন/ টিস্যু ব্যাগ মূলত প্লাস্টিক। প্লাস্টিকের মূল উপাদান পলিপ্রোপাইলিন অপচনশীল পদার্থের তৈরি পলিথিন ব্যাগ বা যেকোনো পণ্য বা মোড়ক পরিবেশের জন্য সমান ক্ষতিকর। পলিথিন তৈরি কাঁচামাল পলি-ইথাইলিন ও পলি-প্রোপাইলিন ১২০ থেকে ১৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় গলনাঙ্কে কার্বন ডাই-অক্সাইড এবং কার্বন-মনোক্সাইড গ্যাস ছড়িয়ে অক্সিজেনের মাত্রা কমিয়ে বাতাসকে মারাত্মকভাবে দূষিত করে। পলিথিন ব্যাগের মতো পলিথিন জাতীয় কাঁচামাল দিয়ে তৈরি নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের অপচনশীল প্যাকেট ও মোড়ক যত্রতত্র নিক্ষিপ্ত হচ্ছে, যা মাটি, পানি, বাতাসকে দূষিত করাসহ পরিবেশে ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।
ঢাকায় প্রতিদিন ৩৮১ টন প্লাস্টিক বর্জ্য উৎপাদিত হয়। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা অনুযায়ী, বাংলাদেশের ৭৩ শতাংশ মাছে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞানের এক গবেষণা বলেছে, বাংলাদেশের বিভিন্ন বাজারে পাওয়া ১৫ প্রজাতির দেশি মাছে ৭৩ দশমিক ৩ শতাংশ মাইক্রোপ্লাস্টিক বা প্লাস্টিকের ক্ষুদ্র কণার সন্ধান মিলেছে। এসব মাছ হচ্ছে কালবাউশ, বেলে, টেংরা, কই, রুই, বাটা, পাবদা, পুঁটি, রয়না, শিলং, বাইন, টাটকিনি, বাছা, তেলাপিয়া ও কমন কার্প জাতীয় মাছ। এর মধ্যে আবার রায়না, টাটকিনি ও টেংরা মাছের শরীরে প্লাস্টিকের পরিমাণ বেশি রয়েছে। গবেষণায় আরও প্রতীয়মান যে, পানির সবচেয়ে নিচে বাস করা মাছের শরীরে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতির পরিমাণ বেশি।
প্লাস্টিক দূষণ প্রতিরোধের উপায় সমূহ
১. প্লাস্টিকের বিকল্প ব্যবহার: পাট, কাপড়, কাগজের ব্যাগ ব্যবহার করা। স্টিল, কাচ ও সিরামিক পাত্রে খাবার সংরক্ষণ করা।
২. সরকারি নিয়ন্ত্রণ: প্লাস্টিকের ব্যবহার কমাতে এবং টেকসই বিকল্পগুলি প্রচারের লক্ষ্যে জননীতি তৈরিতে সরকার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। কিছু প্রধান কর্মকাণ্ডের মধ্যে রয়েছে আইন প্রণয়ন, যা একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের ব্যবহার নিষিদ্ধ বা সীমাবদ্ধ করে। এছাড়া প্লাস্টিক উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলোর উপর কঠোর নজরদারি করা।
৩. সচেতনতা বৃদ্ধি: প্লাস্টিকের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে জনসচেতনতা তৈরি। স্কুল-কলেজে প্লাস্টিক দূষণের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে শিক্ষা দেওয়া। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ক্যাম্পেইন চালানো। প্লাস্টিক দূষণের বিরুদ্ধে লড়াই কেবল ব্যক্তিগত দায়িত্ব নয়, বরং এটি একটি সম্মিলিত কর্তব্য যা সরকার এবং সমগ্র সমাজের সাথে জড়িত। এই দুই খাতের মধ্যে সহযোগিতা এই পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় অপরিহার্য।
৪. পুনর্ব্যবহার: প্লাস্টিক বর্জ্য রিসাইক্লিং করার ব্যবস্থা করা। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি উন্নত করা।
৫. পরিবেশগত আন্দোলন: প্লাস্টিক দূষণের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে পরিবেশগত আন্দোলনগুলি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পরিবেশগত শিক্ষার প্রচার করুন।পরিবেশগত দায়িত্ব এবং সামাজিক সম্পৃক্ততার সংস্কৃতি তৈরির জন্য এই আন্দোলনগুলি অপরিহার্য।
সোনালি ব্যাগসহ অন্যান্য পাটের তৈরি ব্যাগ
বাংলাদেশে উদ্ভাবিত পাটের সেলুলোজ থেকে তৈরি সোনালি ব্যাগ। এগুলো শুধু বায়োডিগ্রেডেবল নয়, বরং টেকসই ও জল-প্রতিরোধীও। প্লাস্টিক বা পলিব্যাগের তুলনায় এগুলো ভারী বোঝা বহন করতে সক্ষম। এই ব্যাগ ফেলে দেওয়ার কয়েক মাসের মধ্যে এর উপাদানগুলো সম্পূর্ণরূপে ভেঙে যায়। কোনো কিছুই আর অবশিষ্ট থাকে না।
এরকম পাটজাত ব্যাগগুলো পলিথিনের একটি সেরা বিকল্প। পাটের ব্যাগের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এগুলোকে বছরের পর বছর ধরে বারবার ব্যবহার করা যায়। তা ছাড়া পাট চাষে ঝামেলাও কম, পানি-সার ও কীটনাশকও অল্প প্রয়োজন হয়।
তুলার ব্যাগ
দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহারের জন্য আরও একটি দারুণ বিকল্প হচ্ছে তুলার ব্যাগ। এই ব্যাগগুলো হালকা ওজনের, ধোয়া যায় ও সহজেই ভাঁজ করা যায়। তবে চাষের ক্ষেত্রে তুলা বৃদ্ধির জন্য যথেষ্ট পরিমাণে পানির প্রয়োজন হয়। জৈব তুলার ব্যাগ সিন্থেটিক কীটনাশক বা সার ছাড়াই জন্মায়। এগুলো বায়োডিগ্রেডেবল ও অপসারণ করা হলে দ্রুত সম্পূর্ণরূপে ক্ষয়ে যায়।
কাগজের ব্যাগ
উপাদানগত দিক থেকে কাগজের ব্যাগ পুনর্ব্যবহারযোগ্য ও প্রাকৃতিকভাবে দ্রুত নিঃশেষযোগ্য। এই ব্যাগগুলোর সঠিকভাবে নিষ্পত্তি করা হলে তা মাটির পুষ্টি ফিরিয়ে দিতে পারে। পাট বা তুলার মতো শক্তিশালী না হলেও, কাগজের ব্যাগ হালকা ওজনের জিনিস বহন করার জন্য একটি নির্ভরযোগ্য বিকল্প।
কাপড়ের তৈরি ব্যাগ
লিনেন, মসলিন বা অন্যান্য ফেব্রিক মিশ্রণের উপাদান থেকে তৈরি কাপড়ের ব্যাগ যথেষ্ট টেকসই হয়ে থাকে। এগুলো পানিতে ধুয়ে নিয়ে অসংখ্যবার ব্যবহার করা যেতে পারে। ইতোমধ্যে সুপরিচিতি পেয়েছে ক্যানভাস ব্যাগগুলো, যেগুলো মূলত তুলা বা লিনেন থেকে তৈরি। বৈশিষ্ট্যগতভাবেই এগুলো হালকা ওজনের ও ভাঁজ করা সহজ। উপকরণের একদম শেষ অংশগুলো চূড়ান্তভাবে প্রকৃতিতে মিশে যেতে খুব সময় নেয় না। তাই পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলার আশঙ্কা থাকে না।
উলের ব্যাগ
এই প্রাকৃতিক ফাইবার যথেষ্ট মজবুত, পুনর্ব্যবহারযোগ্য ও বায়োডিগ্রেডেবল। উল প্রাকৃতিকভাবে জলপ্রতিরোধী হওয়ার যেকোনো আবহাওয়াতেই এগুলো ব্যবহারের উপযোগী। ওপরন্তু, উলের উৎপাদনে প্রয়োজনীয় উপকরণ পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করে না। উলের ব্যাগ বছরের পর বছর স্থায়ী হওয়ার কারণে এগুলোর ঘন ঘন প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন পড়ে না। প্রাকৃতিকভাবে নিঃশেষ হওয়ার সময় মাটিকে দূষিত করার পরিবর্তে সমৃদ্ধ করে।
বেতের ব্যাগ
দ্রুত বর্ধনশীল ও রিনিউয়েবল হওয়ায় ব্যাগের জন্য উৎকৃষ্ট একটি উপকরণ হতে পারে বেত। ভারী জিনিস বহনের জন্য বেতের ব্যাগ সেরা। স্থায়িত্বের দিক থেকে প্রসিদ্ধ হওয়ায় বেত অল্প ব্যবহারেই অপসারণের প্রয়োজন হয় না। তাই ঘন ঘন বর্জ্য সামলানোর ঝামেলা নেই।
শণের ব্যাগ
বর্তমান সময়ের সবচেয়ে টেকসই ফাইবারগুলোর মধ্যে একটি হচ্ছে শণ। এর চাষের জন্য অল্প পরিমাণে পানি প্রয়োজন হয়। দ্রুত বেড়ে ওঠার জন্য কোনো কীটনাশকের দরকার পড়ে না। শণের ব্যাগ তুলা বা পাটের থেকেও অনেক শক্তিশালী ও পর্যাপ্ত ভারী ওজন নিতে পারে। এ ছাড়া শণের মধ্যে দূষিত মাটি পরিষ্কার করার গুণ রয়েছে।
কচুরিপানা থেকে তৈরি ব্যাগ
পলিব্যাগের সৃজনশীল বিকল্পগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে কচুরিপানার ব্যাগ। দ্রুত বর্ধনশীল এই জলজ উদ্ভিদকে ব্যাগের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহারের জন্য প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে বায়োডিগ্রেডেবল বৈশিষ্ট্য যুক্ত করা যেতে পারে। এই ব্যাগগুলোর ঘন ঘন উৎপাদন বিভিন্ন জলাধারগুলোতে কচুরিপানার ঘনত্ব কমাবে। এতে করে স্থানীয় বাস্তুতন্ত্র ব্যাহত হওয়া থেকে রক্ষা পাবে।
উচ্চ ক্রয়মূল্য
তুলা বা পাটের ব্যাগের মতো পরিবেশ-বান্ধব বিকল্পগুলো পলিথিনের চেয়ে বেশি দামি হতে পারে। এই উচ্চমূল্য ভোক্তাদের নিরুৎসাহিত করতে পারে। এখানে উৎপাদন মূল্যের কারণে চূড়ান্ত বিক্রয়মূল্য কমানোটা কঠিন হবে। ওপরন্তু, এই ব্যাগগুলো নিয়ে ব্যবসা করার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় প্রাথমিক বিনিয়োগটিও একটি আর্থিক বোঝা হতে পারে।
সাপ্লাই চেইন ও প্রাপ্যতা সমস্যা
বিভিন্ন সাপ্লাই চেইন অতিক্রম করে বিক্রয়যোগ্য পণ্যের পর্যায় পর্যন্ত আসার প্রক্রিয়াটা জটিল হতে পারে। এতে শুধু যে খরচই বাড়বে তা নয়, সঠিক আউটলেট পর্যন্ত আসতে অতিরিক্ত সময়েরও প্রয়োজন হতে পারে। যেমন: যে অঞ্চলগুলোতে পাট বা তুলা চাষ হয় না, সে জায়গাগুলোতে বেশি পরিমাণে ব্যাগ সরবরাহ করাটা চ্যালেঞ্জিং হতে পারে। ওপরন্তু, দোকানে পর্যাপ্ত পরিমাণে পণ্য আসতে কালবিলম্ব হলে তা ভোক্তাদের আবার পলিব্যাগ ব্যবহারের দিকে ধাবিত করতে পারে।
লেখক: জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, পরিচালক, বিজিসি ট্রাস্ট মেডিকেল কলেজ হসপিটাল, চট্টগ্রাম