মায়ের ডায়াবেটিস থাকলে সন্তানেরও কি হতে পারে?

ডায়াবেটিস বর্তমানে এক বৈশ্বিক স্বাস্থ্য সমস্যায় রূপ নিয়েছে। বাংলাদেশেও ডায়াবেটিসের প্রভাব দিন দিন বাড়ছে। তবে ডায়াবেটিস শুধু একজন ব্যক্তির সমস্যা নয়—পরিবারের পরবর্তী প্রজন্মের জন্যও এটি বিপদের কারণ হতে পারে। অনেক সময় দেখা যায়, মা যদি ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হন, সন্তানদের মধ্যেও রোগটির ঝুঁকি তৈরি হয়। তবে সচেতনতা, সময়মতো চিকিৎসা ও সঠিক খাদ্যাভ্যাসের মাধ্যমে এই ঝুঁকি অনেকটাই কমিয়ে আনা যায়। পুষ্টিবিজ্ঞান অনুযায়ী, একটি পরিবারের খাদ্যাভ্যাসই সন্তানের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

ডায়াবেটিস মেলিটাস (Diabetes Mellitus) মূলত একটি বিপাকীয় রোগ, যেখানে শরীর পর্যাপ্ত ইনসুলিন উৎপাদন করতে পারে না বা উৎপন্ন ইনসুলিন সঠিকভাবে কাজ করতে পারে না। এর ফলে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা বেড়ে যায়। প্রধানত দুই ধরনের ডায়াবেটিস দেখা যায়:

টাইপ-১ ডায়াবেটিস: এটি সাধারণত শিশু বা কৈশোরে ধরা পড়ে। শরীর সম্পূর্ণ ইনসুলিন উৎপাদন বন্ধ করে দেয়।

টাইপ-২ ডায়াবেটিস: অধিকাংশ ক্ষেত্রে এটি পরিণত বয়সে হয়। ইনসুলিন ঠিকভাবে কাজ না করলে বা ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স তৈরি হলে এটি হয়।

এছাড়াও বিশেষ কিছু ধরনের ডায়াবেটিস রয়েছে যেমন– গর্ভকালীন ডায়াবেটিস (Gestational Diabetes)। যখন গর্ভাবস্থায় মা প্রথমবার ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হন, তখন তাকে বলা হয় গর্ভকালীন ডায়াবেটিস। এটি ভবিষ্যতে মা ও সন্তানের উভয়ের জন্য টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।

মায়ের ডায়াবেটিস থাকলে সন্তানদের মধ্যে ডায়াবেটিসের প্রবণতা থাকার কারণ:

১. জেনেটিক সংক্রমণ – মা ও বাবার ডায়াবেটিস থাকলে সন্তানের ডিএনএ-তে ঝুঁকি থেকে যায়। একাধিক গবেষণা অনুযায়ী, জেনেটিক বা বংশগত কারণে ডায়াবেটিস ছড়াতে পারে। যদি একজন মায়ের টাইপ-২ ডায়াবেটিস থাকে, তাহলে তার সন্তানের ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা গড়ে ২০-৩০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে।

২. অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস – পরিবারে যদি অতিরিক্ত শর্করা ও চর্বি নির্ভর খাবার খাওয়া হয়, সন্তানরাও সেই অভ্যাস গ্রহণ করে।

৩. শরীর পরিশ্রমবিহীন জীবনধারা – আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর জীবনযাত্রা, মোবাইল বা টেলিভিশনের প্রতি আসক্তি শিশুদের ব্যায়ামহীন জীবন গড়ে তোলে।

৪. গর্ভাবস্থায় অতিরিক্ত ওজন বৃদ্ধি বা অস্বাস্থ্যকর খাওয়া – মায়ের ডায়াবেটিস থাকলে গর্ভের শিশুর উপরও রক্তে উচ্চ শর্করার প্রভাব পড়ে।

সন্তানদের ভবিষ্যতে ডায়াবেটিস থেকে রক্ষা করতে হলে মাতৃত্বকালীন সময় থেকেই সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে। একজন পুষ্টিবিদের পরামর্শ অনুযায়ী নিচের বিষয়গুলো অনুসরণ করা অত্যন্ত জরুরি:

১. গর্ভাবস্থায় সঠিক পুষ্টি ও রক্তে শর্করার নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। সাদা চাল, মিষ্টি, মিষ্টিজাতীয় খাবার, মিষ্টি ফল পরিহার করুন। বেশি করে আঁশযুক্ত শাকসবজি, ভিটামিন ও মিনারেল সমৃদ্ধ খাবার খেতে হবে। উচ্চ গ্লাইসেমিক ইনডেক্স যুক্ত খাবার এড়িয়ে যেতে হবে। ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী কার্বোহাইড্রেট ও প্রোটিনের ভারসাম্যপূর্ণ ডায়েট অনুসরণ করা উচিত।

২. মায়ের স্তন্যদান চালিয়ে যাওয়া উচিত। মায়ের দুধ শিশুকে শুধু পুষ্টি নয়, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও বাড়ায়। গবেষণায় দেখা গেছে, যারা দীর্ঘসময় মায়ের দুধ পান করে, তাদের ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে কম।

৩. শিশুর খাদ্যাভ্যাসে স্বাস্থ্যকর পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। শিশুর প্রথম খাবার থেকে শুরু করে সুষম পুষ্টির দিকে নজর দিন। চিনি বা প্রক্রিয়াজাত খাবার থেকে দূরে রাখুন। প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় শাকসবজি, ফল (লো GI), ডাল, দুধ ও মাছ রাখুন।

৪. ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি। বাচ্চার বডি মাস ইনডেক্স (BMI) নিয়মিত পরীক্ষা করে দেখা দরকার সে অতিরিক্ত ওজনের দিকে যাচ্ছে কি না। মোটা শিশুদের ভবিষ্যতে টাইপ-২ ডায়াবেটিস হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেশি।

৫. শারীরিক পরিশ্রমের অভ্যাস গড়ে তোলা উচিত। শিশুদের খেলাধুলা, হাঁটা, সাইকেল চালানোর মতো শারীরিক কার্যক্রমে উৎসাহিত করুন। প্রতিদিন কমপক্ষে ৩০-৬০ মিনিট অ্যাকটিভ ফিজিক্যাল এক্সারসাইজ থাকা দরকার।

৬. মানসিক স্বাস্থ্য ও ঘুম ঠিক রাখতে হবে। ঘুম কম হলে ও মানসিক চাপ থাকলে ইনসুলিনের কার্যকারিতা কমে যায়। শিশুর ঘুম যথেষ্ট হচ্ছে কি না তা নিশ্চিত করতে হবে।

৭. সন্তানকে ঝুঁকি থেকে রক্ষা করতে মায়ের নিজের ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। গর্ভাবস্থার আগেই ওজন নিয়ন্ত্রণে আনুন। সঠিক সময়ে গর্ভকালীন চেকআপ করান। সন্তানকে ছোটবেলা থেকেই স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের শিক্ষা দিন। সচেতনতা ও অভ্যাসই সেরা প্রতিরোধ।

ডায়াবেটিসের মতো দীর্ঘস্থায়ী রোগের ক্ষেত্রে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ঝুঁকি যাওয়া অস্বাভাবিক নয়, তবে তা রোধ করা যায় পুষ্টিকেন্দ্রিক জীবনযাত্রা অনুসরণ করে। মা যদি নিজের স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতন হন, সন্তানের ক্ষেত্রেও সুস্থতা নিশ্চিত করা সহজ হয়। তাই পুষ্টিবিদ ও চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী খাদ্য তালিকা অনুসরণ, নিয়মিত শরীরচর্চা এবং স্বাস্থ্য পরীক্ষা এই সমস্যার টেকসই সমাধানে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে।

লেখক: নিউট্রিশন অফিসার, ন্যাশনাল হেলথকেয়ার নেটওয়ার্ক, বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি