সঙ্গীকে অহেতুক অবিশ্বাস কি মানসিক রোগের কারণ

পেশাগত জীবনে একাধিক রোগীর সঙ্গে কাজ করেছি, যাদের প্রধান সমস্যাটি ছিল অযৌক্তিক ও স্থায়ী সন্দেহ। তারা বারবার তাদের সঙ্গীর প্রতি অবিশ্বাস প্রকাশ করতেন, যদিও বাস্তবে কোনো প্রমাণ পাওয়া যেত না।

ওথেলো সিনড্রোম হল এক ধরনের মানসিক রোগ, যেখানে একজন ব্যক্তি তার সঙ্গীর প্রতি অহেতুক সন্দেহ বা ঈর্ষা পোষণ করেন, যেখানে ঈর্ষা ও সন্দেহের কোনো বাস্তব প্রমাণ থাকে না।

এই ধরনের মানসিক অবস্থা সাধারণ সন্দেহের চেয়ে অনেক গভীর ও ক্ষতিকর, কারণ এটি সন্দেহভিত্তিক ভ্রান্তিজনিত ব্যাধি (ডিলিউশনাল ডিসঅর্ডার) হিসেবে চিহ্নিত। এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা তাদের সঙ্গীর প্রতি সন্দেহবাতিক হয়ে নানা ধরনের অস্বাভাবিক আচরণ করতে থাকেন।

ওথেলো সিনড্রোমে আক্রান্ত ব্যক্তি যুক্তি ও প্রমাণকে উপেক্ষা করে এমন এক সন্দেহে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েন যা তার চিন্তাজগৎকে নিয়ন্ত্রণ করে ফেলে এবং সম্পর্ককে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

এই ধরনের মানসিক অবস্থা সাধারণ সন্দেহের চেয়ে অনেক গভীর ও ক্ষতিকর হতে পারে। ছবি: ফ্রিপিকক্লিনিক্যাল পর্যবেক্ষণ

পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, ওথেলো সিনড্রোমে আক্রান্ত ব্যক্তিরা কিছু নির্দিষ্ট ধরনের আচরণ প্রদর্শন করেন:

১. অবিরাম সন্দেহ

রোগী প্রতিদিন তার স্বামীর কল লিস্ট পরীক্ষা করেন এবং অফিসে কার সঙ্গে কথা বলেন, অফিসের বাইরে কার সঙ্গে ঘুরতে যান, সে বিষয়ে খোঁজখবর নেন।

ব্যাখ্যা: এটি ‘অতিরঞ্জিত যাচাই’ আচরণ, যেখানে রোগীর মস্তিষ্ক বারবার ভুলভাবে হুমকি শনাক্ত করে।

২. নিয়ন্ত্রণমূলক আচরণ

স্বামী তার স্ত্রীর অফিসে যাতায়াত সীমিত করার চেষ্টা করেন কারণ তিনি মনে করেন স্ত্রী অন্য কারো সঙ্গে সম্পর্কে আছেন।

ব্যাখ্যা: নিয়ন্ত্রণমূলক আচরণ মূলত নিজের সন্দেহ যাচাই ও নিরাপত্তাহীনতা ঢাকার চেষ্টা।

৩. প্রমাণ উপেক্ষা করা

রোগী বারবার বলেন, ‘প্রমাণ নেই মানেই কিছু হয়নি, এটা আমি মানতে পারি না।’

ব্যাখ্যা: এটি ভ্রান্ত ধারণার স্থিতি নির্দেশ করে, যেখানে বাস্তবতা যাচাই ব্যর্থ হয়।

৪. মানসিক কষ্ট ও উত্তেজনা

অনেক রোগীর মধ্যে অস্থিরতা, উদ্বেগ, রাগ এবং কখনও সহিংসতার প্রবণতা দেখা যায়। এটি সম্পর্ক ও পারিবারিক পরিবেশকে অস্থিতিশীল করে তোলে।

ব্যাখ্যা: এটি অতিরিক্ত চাপ নেওয়ার কারণ হিসেবে নির্দেশ করে,যেখানে  ব্যক্তি সারাক্ষণ অযাচিত চিন্তা এবং এই অপ্রয়োজনীয় চিন্তার বাস্তবতার সাথে মিল খুঁজে পান না।

মনোবৈজ্ঞানিক কারণ

  • আত্মসম্মানের ঘাটতি: নিজের অপ্রতুল বোধ থেকে সঙ্গীর প্রতি সন্দেহ তৈরি হয়।
  • অতীতের ট্রমা: পূর্বে প্রতারণা বা অবিশ্বাসের অভিজ্ঞতা বর্তমান সম্পর্কেও সন্দেহের ছাপ ফেলে।
  • শৈশবের অভাববোধ: শৈশবে অবহেলা ও নিরাপত্তাহীনতা ভবিষ্যতে সম্পর্কের প্রতি অতিরিক্ত সংবেদনশীলতা তৈরি করে।

বৈজ্ঞানিক কারণ

  • ফ্রন্টাল লোবের কার্যহীনতা: যা সিদ্ধান্ত ও যুক্তি নিয়ন্ত্রণ করে।
  • ডোপামিনের ভারসাম্যহীনতা: অতিরিক্ত ডোপামিন অপ্রাসঙ্গিক ঘটনার মধ্যে ভ্রান্ত সংযোগ তৈরি করে।

সামাজিক কারণ

  • সম্পর্কের মধ্যে অবিশ্বাস ও দূরত্ব।
  • অবিশ্বাস পূর্ণ পরিবেশে বেড়ে ওঠা।

চিকিৎসা ও করণীয়: ক্লিনিক্যাল দৃষ্টিভঙ্গি

১. জ্ঞানভিত্তিক আচরণ চিকিৎসা (CBT)

রোগীর ভ্রান্ত সন্দেহগুলোকে চ্যালেঞ্জ করে বাস্তব তথ্যের সঙ্গে তুলনা করানো হয়। যেমন, এক রোগীকে আমি প্রতিবার তার সন্দেহের জন্য প্রমাণ খুঁজতে বলতাম। সময়ের সাথে তিনি বুঝতে পারলেন তার ধারণার কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই।

২. সম্পর্কমুখী থেরাপি

দম্পতি কাউন্সেলিং রোগীর নিরাপত্তাহীনতা কমাতে কার্যকর। খোলামেলা আলোচনার মাধ্যমে আস্থা পুনর্গঠন হয়।

৩. চিন্তার পুনর্গঠন (Cognitive Restructuring)

রোগীকে বিকল্প চিন্তা করতে শেখানো হয়। যেমন: ‘প্রমাণ ছাড়াই সন্দেহ করা আমাকে কষ্ট দিচ্ছে।’

৪. উদ্বেগ নিয়ন্ত্রণ ও মাইন্ডফুলনেস

ধ্যান, শ্বাসপ্রশ্বাস অনুশীলন ও মাইন্ডফুলনেসের মাধ্যমে মানসিক উত্তেজনা কমানো হয়।

৫. ওষুধ প্রয়োগ (মনোরোগ বিশেষজ্ঞের তত্ত্বাবধানে)

তীব্র ভ্রান্তি থাকলে ওষুধ প্রয়োগ করা হয়, বিশেষত যখন উদ্বেগ বা উত্তেজনা বেশি থাকে।

কেস স্টাডি

তানভীর (ছদ্মনাম) বয়স ৩৮, বিবাহিত, অভিযোগ ছিল স্ত্রীকে অন্য কারো সঙ্গে সন্দেহ করেন। তিনি বারবার স্ত্রীর চলাফেরা পরীক্ষা করতেন, এমনকি অফিসে গিয়ে সহকর্মীদেরও প্রশ্ন করতেন। থেরাপির ৮ম সেশনে সিবিটি (CBT) কৌশল প্রয়োগের মাধ্যমে তিনি নিজের সন্দেহের অযৌক্তিকতা উপলব্ধি করতে শুরু করেন। এতে ধীরে ধীরে সম্পর্কের মধ্যে যোগাযোগ ফিরিয়ে আনা যায় এবং ৪ মাসে উনার ভ্রান্ত ধারণা অনেকটাই কমে আসে।

ওথেলো সিনড্রোমে সন্দেহ শুধু একটি অনুভূতি নয়, এটি একটি গভীর মানসিক ব্যাধি যা ব্যক্তি ও সম্পর্ক উভয়কে আঘাত করে। পেশাদার থেরাপি, সহানুভূতি এবং সময়োপযোগী চিকিৎসা না হলে এটি সহিংসতা ও সম্পর্ক ভাঙনের কারণ হতে পারে। মনোবিজ্ঞানীদের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ যে সন্দেহকে সাধারণ ঈর্ষা ভেবে অবহেলা না করে, এটিকে ভ্রান্তিজনিত ব্যাধি হিসেবে শনাক্ত করে যথাযথ হস্তক্ষেপ করা।

লেখক: সাইকোলজিস্ট, শান্তিবাড়ী