ডায়াবেটিস রোগীদের কখন আর কতক্ষণ হাঁটা উচিত

ডায়াবেটিস আজকের সময়ে অন্যতম দীর্ঘস্থায়ী রোগ। বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে এ রোগীর সংখ্যা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। ওষুধ বা ইনসুলিন ছাড়াও খাদ্যাভ্যাস এবং জীবনযাপনের পরিবর্তন ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এর মধ্যে অন্যতম কার্যকর অভ্যাস হলো খাওয়ার পরে হাঁটা। গবেষণা প্রমাণিত হয়েছে, মাত্র ১০–১৫ মিনিটের হালকা হাঁটা খাবারের পরে রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে রাখে এবং নানা জটিলতা প্রতিরোধ করে।

কেন খাওয়ার পরে হাঁটা জরুরি 

১. রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ করা: খাবার খাওয়ার পর শরীরে কার্বোহাইড্রেট ভেঙে গ্লুকোজে পরিণত হয়, যা রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। ডায়াবেটিস রোগীদের ক্ষেত্রে ইনসুলিনের কার্যকারিতা কম থাকে, ফলে শর্করার মাত্রা দ্রুত বেড়ে যায়। খাবারের পরে হাঁটা শরীরের পেশিগুলোকে সক্রিয় করে তোলে এবং সেই পেশি রক্ত থেকে গ্লুকোজ ব্যবহার করে শক্তি উৎপাদন করে। এতে রক্তে শর্করার মাত্রা স্বাভাবিক থাকে।

২. হজমে সহায়ক ভূমিকা: খাবারের পরে হালকা হাঁটা খাবারকে সহজে হজম করতে সাহায্য করে। এক জায়গায় বসে থাকলে খাবার ধীরে হজম হয়, ফলে অ্যাসিডিটি, গ্যাস, পেট ফাঁপার মতো সমস্যা বাড়তে পারে। হাঁটার মাধ্যমে পাকস্থলী ও অন্ত্রের কার্যকারিতা উন্নত হয়।

৩. ওজন নিয়ন্ত্রণ করা: ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে ওজন একটি বড় ফ্যাক্টর। খাওয়ার পরে হাঁটার ফলে ক্যালরি পোড়ে, ফ্যাট জমা কমে এবং ওজন নিয়ন্ত্রণে থাকে।

৪. হৃদ্‌যন্ত্র সুরক্ষা করা: ডায়াবেটিস রোগীদের হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি সাধারণ মানুষের চেয়ে অনেক বেশি। নিয়মিত হাঁটা রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখে, কোলেস্টেরল কমায় এবং হৃদ্‌যন্ত্রকে সুস্থ রাখে।

৫. মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করা: খাওয়ার পরে খোলা বাতাসে হালকা হাঁটা মানসিক চাপ কমায়, ঘুমের মান উন্নত করে এবং মন ভালো রাখে।

বিভিন্ন গবেষণা খাবারের পরে হাঁটার উপকারিতা প্রমাণিত হয়েছে। যেমন–

১. আমেরিকান ডায়াবেটিস অ্যাসোসিয়েশন (ADA) এর মতে, খাবারের পরে ১০–১৫ মিনিটের হালকা হাঁটা রক্তে শর্করার মাত্রা ২০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে আনতে পারে।

২. ডায়াবেটোলজিয়া জার্নাল -এর একটি গবেষণা দেখা গেছে, প্রতিবার খাবারের পরে হাঁটা যারা নিয়মিত হাঁটেন, তাদের দীর্ঘমেয়াদী HbA1c মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে কম থাকে।

৩. নিউজিল্যান্ড ডায়াবেটিস ফাউন্ডেশন -এর গবেষণা বলা হয়েছে, দিনে তিনবার খাবারের পরে ১০ মিনিট হাঁটা একটানা আধা ঘণ্টা হাঁটার চেয়ে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে বেশি কার্যকর।

৪. ঢাকার এক গবেষণা দেখা গেছে, যারা প্রতিদিন খাবারের পরে ১৫ মিনিট হাঁটেন, তাদের রক্তে শর্করা ও HbA1c মাত্রা যারা হাঁটেন না তাদের তুলনায় অনেক ভালো। শুধু ওষুধ নয়, হাঁটা নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত করাই ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের অন্যতম উপায়।

খাওয়ার ১০–১৫ মিনিট পরে হাঁটা শুরু করুন। ফাইল ছবিকখন এবং কতক্ষণ হাঁটা উচিত

১. খাওয়ার ১০–১৫ মিনিট পরে হাঁটা শুরু করুন।

২. একবারে ১০–২০ মিনিট হাঁটা যথেষ্ট।

৩. দিনে মোট ৩০–৪৫ মিনিট হাঁটা উপকারী।

৪. দুপুর ও রাতের খাবারের পরে হাঁটা সবচেয়ে কার্যকর।

সঠিকভাবে হাঁটার নিয়ম–

১. সোজা ভঙ্গিতে হাঁটুন।

২. ধীর থেকে মাঝারি গতিতে হাঁটুন (৮০–১০০ ধাপ/মিনিট)।

৩. ভারী কিছু বহন না করে আরামদায়কভাবে হাঁটুন।

৪. খোলা বাতাস বা পার্কে হাঁটা উত্তম।

৫. একসাথে দীর্ঘ হাঁটার চেয়ে ছোট ছোট হাঁটা ভালো।

হাঁটার ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা–

১. যাদের ডায়াবেটিক নিউরোপ্যাথি আছে, তাদের পায়ে সুরক্ষামূলক জুতা ব্যবহার করা জরুরি।

২. যাদের হৃদ্‌রোগ আছে, ডাক্তারকে পরামর্শ নিয়ে হাঁটা শুরু করতে হবে।

৩. স্থূলতা বা হাঁটুর ব্যথা থাকলে হাঁটা ভাগ করে করা উচিত।

নিয়মিত হাঁটার পাশাপাশি সঠিক খাদ্যাভ্যাস

ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে হাঁটার সঙ্গে সঠিক খাদ্যাভ্যাসও অপরিহার্য। খাদ্য তালিকায় যে সকল খাবার রাখবেন–

১. আঁশযুক্ত শাকসবজি।

২. পরিমিত ভাত/রুটি।

৩. মাছ, মুরগির মাংস, ডিম।

৪. ডাল, শস্যজাতীয় খাবার।

৫. লো-গ্লাইসেমিক ইনডেক্স ফল যেমন পেয়ারা, আপেল, জাম।

খাওয়ার পরে হাঁটলে রক্তে শর্করার হঠাৎ বৃদ্ধি কমাতে সাহায্য করে। ফাইল ছবিখাদ্য তালিকা থেকে যে সকল খাবার বর্জনীয়–

১. মিষ্টি, সফট ড্রিঙ্ক।

২. অতিরিক্ত ভাজাপোড়া খাবার।

৩. সাদা ভাত ও ময়দার তৈরি খাবার।

হাঁটার সঙ্গে ডায়েটের সমন্বয়

খাওয়ার পরে হাঁটলে রক্তে শর্করার হঠাৎ বৃদ্ধি কমাতে সাহায্য করে। উদাহরণস্বরূপ, যদি কেউ দুপুরে ভাত, মাছ, সবজি খান—তারপর ১০ মিনিট বিশ্রাম নিয়ে ১৫ মিনিট হাঁটেন, তাহলে সেই খাবারের গ্লুকোজ রক্তে ধীরে ধীরে প্রবেশ করবে। এর ফলে ওষুধ বা ইনসুলিনের কার্যকারিতা ভালোভাবে কাজ করবে এবং হাইপারগ্লাইসেমিয়ার ঝুঁকি কমবে।

ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য খাওয়ার পরে হাঁটা একটি সহজ, সাশ্রয়ী এবং বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত পদ্ধতি। এটি রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে, ওজন কমায়, হজমে সাহায্য করে, হৃদ্‌রোগ প্রতিরোধ করে এবং মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটায়। পুষ্টিবিদের দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায়—ওষুধ, সুষম খাদ্য, নিয়মিত হাঁটা এবং জীবনধারার পরিবর্তন—এই চারটি একসাথে অনুসরণ করলে ডায়াবেটিসকে কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

লেখক: নিউট্রিশন অফিসার, ন্যাশনাল হেলথকেয়ার নেটওয়ার্ক, বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি